ভূমি অধিগ্রহণে আইনি জটিলতার কারণে বগুড়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ভূমি মালিকরা তাদের জমির দাম বেশি দাবি করে আদালতে মামলা দায়ের করার কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত বড় ধরনের এই প্রকল্পটিকে ঘিরে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
প্রায় ৩ বছর আগে ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর বগুড়ায় দলীয় এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী জেলার উন্নয়নে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠাসহ বড় ধরনের ৮টি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। এর পরপরই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং বগুড়া জেলা প্রশাসন যৌথভাবে কাজ শুরু করে। তারই ধারবাহিকতায় জেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে বগুড়া-নাটোর মহাসড়ক সংলগ্ন শাজাহানপুর উপজেলার আশেকপুর ইউনিয়নের পাঁচটি মৌজার ২৫১ একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে ভূমি মালিকদের নামে ২০১৭ সালের ১২ জুলাই ৩ ধারা নোটিস ইস্যু করা হয়। তবে সে সময় পাঁচজন মালিক তাদের জমি অধিগ্রহণে আপত্তির কথা লিখিতভাবে জেলা প্রশাসককে জানান। অবশ্য এ বিষয়ে একই বছরের ২৩ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে শুনানির সময় ভূমি মালিকরা তাদের আপত্তি প্রত্যাহারও করে নেন। এরপর ভূমি অধিগ্রহণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি হিসেবে চলতি বছরের ২৯ মার্চ ভূমি মালিকদেরকে ৬ ধারার নোটিস ইস্যু করা হয়। এরপর যখন প্রস্তাবিত জমির মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয় তখনই ভূমি মালিকদের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একে একে ৪টি মামলা দায়ের করা হয়। যাতে ভূমি মালিকরা ১৯৮২ সালের হুকুম দখল আইনের পরিবর্তে ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর প্রণীত আইনে ক্ষতিপূরণ অর্থাত্ জমির মূল্য দাবি করেন। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত জেলা প্রশাসনকে জবাব দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছে। এ সংক্রান্ত নথি চলতি বছরের ১১ জুন বগুড়া জেলা প্রশাসনের হস্তগত হয়েছে।
বগুড়ায় জেলা প্রশাসনের ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তার (এলএও) কার্যালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৮২ সালের আইন অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে মালিকদের জমির প্রকৃত মূল্যের দেড়গুণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। অন্যদিকে ২০১৭ সালের আইনে জমির প্রকৃত মূল্যের তিনগুণ অর্থ পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। মূলত বাড়তি মূল্য পাওয়ার আশাতেই ভূমি মালিকরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
আদালতে মামলাকারীদের একজন জোড়া হিন্দু পাড়ার বাসিন্দা মোহর চান মন্ডল জানান, তারা সরকারকে জমি দিতে প্রস্তুত; কিন্তু তা নতুন আইনে কিনতে হবে। তা না হলে তারা সরকারকে জমি দিবেন না। বর্তমানে প্রতি শতাংশ ধানি জমির দাম ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের জমিগুলো চার ফসলী। বোরো, আমন এবং বর্ষালী- এই ধরনের ধানের পাশাপাশি আলুরও আবাদ হয়। এসব ফসল দিয়েই আমরা কোনো রকমে টিকে আছি। সরকার যদি জমিগুলো কিনে নেয় তাহলে আমাদের আয়-রোজগারের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। জমি বেচার টাকা দিয়ে যাতে আমরা স্থায়ীভাবে আয়-রোজগারের পথ করে নিতে পারি সেজন্য আমরা নতুন আইনে তিনগুণ বেশি দামে জমি বিক্রির দাবি করেছি। আশা করি আদালতের কাছে আমরা ন্যায় বিচার পাব।’
জেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বর্তমান প্রশাসন আগামী কয়েক মাস নির্বাচন নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। এছাড়া বিষয়টি যেহেতু আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে, তাই এই সরকারের মেয়াদের বাকি সময়টুকুতে অচলাবস্থা নিরসনের কোনো সম্ভাবনা নেই।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আলীমুন রাজিব বলেন, ‘আদালতে দাখিলের জন্য আমরা জবাব রেডি করছি।’ তার দাবি, যেহেতু অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াটি নতুন আইন প্রণীত হওয়ার পূর্বেই শুরু হয়েছিল তাই জমির মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে পুরাতন অর্থাত্ ১৯৮২ সালের আইনটিকেই তারা অনুসরণ করেছেন।
ইত্তেফাক/আরকেজি