স্ত্রীকে পাশবিক নির্যাতন ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যার আড়াই মাস পর গৃহবধূর স্বামী ঘাতক পুলিশের এএসআই ফিরোজ আল মামুন গ্রেপ্তার হয়েছে। গতকাল বুধবার টাঙ্গাইলের পিবিআই পুলিশের ইনচার্জ ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. বেলাল হোসেন, ইন্সপেক্টর মো. মনিরুল ইসলাম ভুইয়াসহ একদল পুলিশ ঘাতক ফিরোজ আল মামুনকে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল পুলিশ ফাঁড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে টাঙ্গাইলের ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে। স্ত্রীকে নির্মমভাবে খুনের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিয়েছে ঘাতক ফিরোজ আল মামুন। পুলিশ আজ বৃহস্পতিবার তাকে মির্জাপুরে নিজ বাড়িতে নিয়ে এসে হত্যার আলামত হিসেবে রক্তমাখা টিস্যু ও বটি দা উদ্ধার করেছে বলে ইন্সপেক্টর মো. মনিরুল ইসলাম ভুইয়া জানিয়েছেন।
স্ত্রীকে নির্মমভাবে খুনের পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে নিজেই আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল পুলিশের এএসআই মামুন (৪০)। কিন্ত শেষ রক্ষা হলো না। পরপর দুই স্ত্রী হত্যার ঘটনায় ঘাতক এএসআই মামুনকে ফাঁসিসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছে নিহত শিল্পীর অসহায় পরিবার ও এলাকাবাসী। আজ বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে গেলে ক্ষুব্ধ এলাকবাসী নানা অভিযোগ তুলে ধরেন এএসআই মামুনের বিরুদ্ধে।
গত ১৩ আগস্ট টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলা সদরের বাওয়ার কুমারজানি পূর্বপাড়া গ্রামে অমানবিক ও চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা ঘটে। ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে ও ধামাচাপা দিতে পুলিশ ঘাতক মামুনের পিতা আবুল কাশেম (৬৬) ও তার মাতা অযুফা বেগমকে (৫৫) আটক করেছে। বর্তমানে তারা জেল হাজতে রয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার লতিফপুর ইউনিয়নের যুগিরকোপা গ্রামের শামসুদ্দিন সিকদারের মেয়ে শিল্পী আক্তারের (২৭) সঙ্গে একই উপজেলার বাওয়ার কুমারজানি পুর্বপাড়া গ্রামের কাশের মিয়ার ছেলে মামুন মিয়ার (৪০) দুই বছর পুর্বে বিয়ে হয়। শিল্পীর ভাই খায়রুল, দুলাল, সুরুজ, ও শহিদ অভিযোগ করেন, শিল্পীকে বিয়ের পুর্বেও এএসআই মামুন আরও দুইটি বিয়ে করেছিল। প্রথম স্ত্রীর নাম লাইলী আক্তার, বাড়ি মির্জাপুর উপজেলার ভাদগ্রাম ইউনিয়নের গোড়াইল গ্রামে। মামুনের বনিবনা না হওয়ায় ও তার অপকর্ম জানতে পেরে লাইলীর সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়। প্রথম স্ত্রীর কথা গোপন রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করে দেলদুয়ার উপজেলার লাউহাটি গ্রামের মনোয়ারা আক্তার মোনা ওরফে আমেনার সঙ্গে। ঐ ঘরে মোয়াজ (৮) ও মমিন (৪) নামে দুটি পুত্র সন্তান রয়েছে।
দুই পুত্র জন্মের পর নানাভাবে অত্যাচার নির্যাতন করে দ্বিতীয় স্ত্রী আমেনাকে হত্যা করে মামুন।স্ত্রী হত্যার ঘটনায় একটি মামলাও রয়েছে মামুনের বিরুদ্ধে।
প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীর কথা গোপন রেখে তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করে শিল্পী আক্তারকে। বিয়ের পর শিল্পী জানতে পারেন, তাকে বিয়ের করার পুর্বেও মামুন পর পর দুইটি বিয়ে করেছে এবং তার সংসারে দুইটি পুত্র সন্তানও রয়েছে। বাবা মায়ের অভাবের সংসারের কথা মাথায় রেখে শিল্পী আক্তার স্বামী মামুনের বাড়িতে পুর্বের ঘরের দুইটি সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবেই লালন পালন করতে থাকে।
এদিকে বিয়ের পর থেকেই মামুনের রূপ পরিবর্তন হতে থাকে বলে অভিযোগ উঠে। কারণে অকারণে স্ত্রী শিল্পীকে নানাভাবে অত্যাচার করে আসছিল বলে শিল্পীর পরিবার এবং স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেছে। শিল্পীর পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র হওয়ায় এএসআই মামুনের অত্যাচার নির্যাতনের প্রতিবাদ করার সাহস পেত না। মামুন প্রথম অবস্থায় পুলিশের কনস্টবল থাকলেও পরে পদন্মতি পেয়ে এএসআই (উপ সহকারী পুলিশ পরিদর্শক) হয়েছেন। মামুন বর্তমানে গাজীপুর জেলায় শিল্পাঞ্চল (ইন্ডাস্ট্রিয়াল) পুলিশে এএসআই হিসেবে কর্মরত।
শিল্পী ও মামুনের পরিবার জানায়, শিল্পীকে খুনের কয়েক দিন পুর্বে মামুন ছুটি নিয়ে বাড়ি আসে। বাড়িতে এসে নানা অজুহাতে স্ত্রী শিল্পীর ওপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক কলহের এক পর্যায়ে ঘাতক মামুন বাড়িতে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে স্ত্রী শিল্পীকে এলোপাথারি ভাবে মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন অংশে কুপিয়ে হত্যা করে। খুনের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ও ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য মামুন নিজের শরীরে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। আশপাশের লোকজন ঘটনা জানতে পেরে প্রথমে শিল্পীকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে নিয়ে আসে।হাসপাতালে নিয়ে আসার পর চিকিৎসকগণ শিল্পীকে মৃত ঘোষণা করে।
অপরদিকে ঘাতক মামুনকেও প্রথমে কুমুদিনী হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।পুলিশ যাতে মামুনকে গ্রেপ্তার করতে না পারে সে জন্য কুমুদিনী হাসপাতালে মামুনকে চিকিৎসা না করে একটি বিশেষ মহলের সহযোগিতায় মামুনকে সরিয়ে নিয়ে অন্যত্র চিকিৎসা করানো হচ্ছে বলে নিহত শিল্পীর পরিবার অভিযোগ করেছে।
ঘটনার পর পুলিশ এএসআই মামুনের পিতা আবুল কাশেম ও মাতা অযুফা বেগমকে আটক করেছে। শিল্পীর অসহায় পরিবার এবং স্থানীয় লোকজনের চাপে অবশেষে ঘটনার সত্য প্রকাশ পায়। পরে পুলিশ ঘাতক মামুনকে গ্রেপ্তার করে।
এ ব্যাপারে পিবিআইয়ের ইন্সফেক্টর মো. মনিরুল ইসলাম ভুইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, শিল্পী হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন হয়েছে। ঘাতক ফিরোজ আল মামুনই তার স্ত্রীকে হত্যার কথা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকার করেছে।
মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কে এম মিজানুল হক মিজান বলেন, শিল্পীর ভাই মোস্তফা বাদী হয়ে মামলা করার পর থানা পুলিশ ও টাঙ্গাইলের পুলিশের পিবিআই টিম যৌথভাবে মামলার তদন্ত করে আসছিল। সবার সহযোগিতায় অবশেষে হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন হলো।
মামলার বাদী নিহত শিল্পীর ভাই মো. মোস্তফা বলেন, একটি চক্রের কারণে ন্যায় বিচার নিয়ে আমরা সংশয়ে ছিলাম।কিন্ত আমার বোনের হত্যাকারীকে পিবিআই গ্রেপ্তার করেছে এ জন্য তাদের কাছে চির কৃতজ্ঞ। আমরা চাই খুনি ফিরোজ আল মামুনের দ্রুত ফাঁসি হোক।
ইত্তেফাক/নূহু