পরিবহন ধর্মঘটের নামে নারায়ণগঞ্জে চলেছে নৈরাজ্য। পরিবহন শ্রমিকদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ির চালক, আরোহী, মোটরবাইক ও ইজিবাইকের চালকরা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড থেকে মেঘনা ঘাট পর্যন্ত অন্তত ২০টি পয়েন্টে পরিবহন শ্রমিকরা তাণ্ডব চালায়। তাদের হাত থেকে কলেজছাত্রী এমনকি অফিসগামী মহিলারাও রক্ষা পায়নি। মুখে কালি মেখে দিয়েছে অনেকের।
প্রধানমন্ত্রীর এপিএসের গাড়িও আটকে দেয়। ‘কালি সন্ত্রাস’ থেকে রক্ষা পায়নি নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রীরা। কলেজের বাসে হামলা চালিয়ে পরিবহন শ্রমিকরা ছাত্রীদের গায়ে কালি (পোড়া মবিল) লেপন করেছে। ভাঙচুর করে বাসের গ্লাসও। এসময় ছাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনাটি ঘটেছে রবিবার দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের সাইনবোর্ড এলাকায় একটি পেট্রোল পাম্পের কাছে। পরে বাসটি সেখানে থামিয়ে দিয়ে আর যেতে দেয়নি।
শিক্ষার্থীরা জানায়, দুপুর ১২টার দিকে সাইনবোর্ড এলাকা পার হওয়ার সময় হঠাৎ শ্রমিকরা বাসটি থামিয়ে চালককে মারধর করে ও তার মুখে শরীরে কালি লেপে দেয়। পরে এ ঘটনার প্রতিবাদ করলে কয়েকজন ছাত্রীকেও কালি লেপে দেন শ্রমিকরা এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজও করে। পরে বাসের কয়েকটি গ্লাস ভাংচুর করে বাস থেকে সবাইকে নামিয়ে দেয়।
বাসের চালক মজিবর রহমান জানান, বাসটিতে ৩৮ জন ছাত্রী ছিল। তারা সবাই সরকারি মহিলা কলেজে অধ্যয়নরত। ছাত্রী বহনকারী বাসটি সাইনবোর্ড এলাকায় এলেই হামলা করে বাসের গ্লাস ভাঙচুর করে শ্রমিকরা। পরে ছাত্রীদের গায়েও কালি মাখিয়ে দেয় তারা।
নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ বেদৌরা বিনতে হাবিবা জানান, আমাদের বাস চালক মজিবর আমাকে ঘটনাটি জানিয়েছে। পরিবহন শ্রমিকরা বাসের কয়েকটি গ্লাস ভাংচুর করেছে। এবং ছাত্রীদের গায়েও কালি দিয়েছে বলে জানিয়েছে।
এদিকে মহিলা কলেজের হামলা ও ছাত্রীদের গায়ে কালি লেপনের ঘটনায় সর্বত্র নিন্দার ঝড় বইছে। এক ছাত্রীর কলেজ ড্রেসে কালির ছাবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে। অপরদিকে সকাল থেকেই শ্রমিকরা রাস্তায় অবস্থান করে যেকোনো ধরনের পরিবহন চলাচলে বাধা প্রদান করছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকে রবিবার সকাল ছয়টা থেকে এই ধর্মঘট শুরু হয়। চলবে মঙ্গলবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত। দাবি আদায় না হলে ৩০ অক্টোবর থেকে লাগাতার ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।
IMG0
পরিবহন ধর্মঘটে বাস না পেয়ে ভ্যানে করে গন্তব্যে যান শিক্ষার্থীরা। ছবি: ইত্তেফাক
ধর্মঘট শুরুর দিনে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে, শহরে, ফতুল্লা, সোনারগাঁ, আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জে বিভিন্ন এলাকায় অফিসগামী যাত্রীদের গাড়ির অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। দিনভর চরম দুর্ভোগের মধ্যে অফিসগামী লোকজন ঢাকা যাওয়ার চেষ্টা করলেও ধর্মঘটটি পরিবহন শ্রমিকরা সাধারণ মানুষকে নানাভাবে নাজেহাল করে।
এদিকে কেন্দ্রীয় শ্রমিক লীগের শ্রমিক কল্যাণ ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহাম্মেদ পলাশ গত শনিবার পরিবহন ধর্মঘটের প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানিয়ে সমাবেশে বক্তব্য দেন।
সিদ্ধিরগঞ্জে কর্মরত একটি পত্রিকার সাংবাদিক আরিফ জানায়, সকালে ধর্মঘটের খবর পেয়ে শিমরাইল মোড়ে আসি। এসে কর্তব্য পালনের সময় ছবি তুলতে গেলে কয়েকজন পরিবহন শ্রমিক আমার ক্যামেরায় পোড়া মবিল লাগিয়ে দিতে চায় এমনকি ক্যামেরাও ছিনিয়ে নিতে চায়। পরে আমি কোন রকমে ওই স্থান থেকে চলে আসি।
সকাল সাড়ে নয়টার দিকে শিমরাইল মোড়ে প্রধানমন্ত্রীর পিএস সাজ্জাদুল হাসানের গাড়ি আটকে দেয় পরিবহন শ্রমিকরা। প্রায় আধা ঘণ্টা পর নারায়ণগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশের টিআই (প্রশাসন) মোল্লা তাসলিম হোসেন শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে গাড়িটি উদ্ধারে সক্ষম হয়।
সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী সকল বাস ও গণপরিবহন বন্ধ রয়েছে। যার ফলে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে কয়েক লাখ মানুষ। বেশি সমস্যায় পড়েছে শিক্ষার্থী ও অফিসগামী লোকজন।
ইত্তেফাক/জেডএইচ