খাগড়াছড়িতে বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ নিয়ে মুখোমুখি দুই গ্রুপ

তিন পার্বত্য জেলায় সরকারি খাস জমি দখলের মহোত্সব চলছে। পরিত্যক্ত সেনা ক্যাম্প ও বাঙালিদের পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দকৃত জমি রাতারাতি দখল করে সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মীয় উপাসনালয়; যা স্থানীয়ভাবে কিয়াং নামে পরিচিত। গত এক বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের কয়েক হাজার কিয়াং নির্মাণ করা হয়েছে; যা নিয়ে উপজাতি ও বাঙালিদের মধ্যে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। বাঙালি সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, সরকারি জমি দখলের পেছনে কাজ করছে আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ। জমি দখল নিয়ে যাতে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি না হয় সেজন্য সেখানে রাতারাতি বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করা হচ্ছে।
 
খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা কুকিছড়াপাড়ায় এমন একটি বিরোধপূর্ণ জমিতে বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ নিয়ে স্থানীয় বাঙালি ও উপজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। গত সোমবার গভীর রাতে কতিপয় দুর্বৃত্ত স্থানীয় জেতবন বৌদ্ধ বিহারে হামলা করে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। তারা বিহারে স্থাপিত একটি বুদ্ধ মূর্তি ভেঙে ফেলে। এ ঘটনায় উপজাতীয় লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে প্রশাসন বিহারটি পুনঃনির্মাণের আশ্বাস দেয়। তবে প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তে বিরূপ প্রভাব পড়েছে বাঙালিদের মধ্যে। বিহারের জমিটিকে নিজেদের দাবি করে তারা অবিলম্বে বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ কাজ বন্ধ করে বিহারের জমি বাঙালি মালিককে ফেরত দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। বিহার নির্মাণ বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল, সভা সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। দাবি না মানলে পার্বত্য চট্টগ্রামে লাগাতার হরতালের মতো কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে বলে তারা জানান।   
 
এক বিবৃতিতে পার্বত্য অধিকার ফোরাম সভাপতি মোঃ মাঈন উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক মাসুম রানা বলেন,  সম্প্রতি ৮২ হাজার ভিনদেশি নাগরিককে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনবার্সন করার যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তা বন্ধের দাবিতে বাঙালি সংগঠনের পরিচালিত আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই গুইমারার মূর্তিভাঙ্গার ইস্যুটি সৃষ্টি করা হয়েছে। সরকার ও প্রশাসন পাহাড়ের সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফের সাম্প্রদায়িক অপরাজনীতির কাছে ‘আত্মসমর্পণ’ করেছে বলে নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন। 
 
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গত মে মাসে খাগড়াছড়ির রামগড়ে একটি সংখ্যালঘু পরিবারের জমি জোরপূর্বক দখল করে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ। জগদীশ চন্দ্র নাথ নামে এক ব্যক্তিকে তার ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে নিজেদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বানানোর চেষ্টা চলছে। অভিযোগ পেয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর টহল দল ঘটনাস্থলে গেলে স্কুল ঘর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ স্কুল ঘরের ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন করে ফেলে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর তথাকথিত এ স্কুলের অনুমোদন আনতে গেলে রামগড় উপজেলা প্রশাসন আবেদনটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।
 
খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়িতে গত ২৩ মে মোঃ জামাল উদ্দিন ও আনোয়ারুল ইসলামের মালিকানাধীন জায়গায় উপজাতী রিপ্রুচাই মারমা জোর করে জঙ্গল পরিষ্কার করে ঘর নির্মাণ করলে উভয়পক্ষে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। সিন্দুকছড়ির তিন্দুকছড়িতে পরিত্যক্ত আর্মি ক্যাম্প সংলগ্ন পার্শ্ববর্তী টিলায় গত ৪ জুলাই  টিন দিয়ে একটি নতুন ঘর তৈরি করে সন্ত্রাসী দল। ইউপিডিএফ সমর্থিত সিন্দুকছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান রেদাক মারমা বলেন, ভুলবশত ঘরটি নির্মাণ করা হয়েছে। তবে ঘরটি পরদিন সরিয়ে নেয়া হবে বলে তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর টহল সদস্যদের জানান। কিন্তু গত ৫ জুলাই রাতের আঁধারে উক্ত ঘরে ১০ ইঞ্চি উচ্চতার একটি বুদ্ধ মূর্তি স্থাপন করে জায়গাটি দখলে নেয় তারা। দিঘীনালার সোনা মিয়া টিলায় বাঙালিদের জমি দখল করে বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কথা বলতে ইউপিডিএফ প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের মুখপাত্র নিরন চাকমার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইলে সংযোগ পাওয়া যায়নি।
 
ইত্তেফাক/নূহু