সারিন্দার সুরে বেঁচে আছেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সুনীল

২২ বছর ধরে পথে-ঘাটে, বিভিন্ন হাট-বাজারে সারিন্দার সুরের যাদু ও কোকিল কণ্ঠে গান পরিবেশন জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিল্পী সুনীল চন্দ্র রায় (৩৮)।

সুনীল কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কিষামত শিমুলবাড়ি গ্রামে মৃত শৈলান চন্দ্র রায়ের ছেলে। সংসারে অভাব থাকায় মাত্র ৮ বছর বয়স থেকে সুনীল উপজেলার খামারটারী এলাকায় মামা মনোরঞ্জন রায়ের বাড়িতে থাকেন। মনোরঞ্জন রায় ১৪ বছর আগে সুনীলকে বিয়ে দেন। বিয়ের কয়েক বছর পর বাড়ি করার জন্য সুনীলের নামে চার শতক জমি লিখে দেন তিনি। টাকার অভাবে সেই জমিতে বাড়ি তৈরি করতে পারেনি সুনীল। এখনও স্ত্রী ও ১২ বছরের ছেলে নিয়ে মামা বাড়িতেই আছেন তিনি। তার ছেলে তালতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। সুনীলের সম্বল বলতে প্রতিবন্ধী ভাতা ও তার সুরেলা কণ্ঠ।

বাবার সম্পদ বলতে মাত্র ৪ শতক জমিতে একটি টিনের চালা। সেখানে ছোট ভাই সুশীল ও মা শ্রীমতি রায় থাকেন।  সুশীল ও তার মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনো রকম জীবন-যাপন করছেন।

সুনীল চন্দ্র রায় জানান, ৫ বছর বয়সে তার টাইফয়েড জ্বর হয়। সেই জ্বরের তীব্রতায় তিনি দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলেন। পরে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুরে চিকিৎসার করালেও তার দৃষ্টি শক্তি ফিরে আসেনি। দৃষ্টি শক্তি না থাকায় তিনি সম্পূর্ণরূপে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তার পর ১৫ বছর বয়সে জীবন-জীবিকার তাগিদে হাতে তুলে নেন সারিন্দা।

ফুলবাড়ীর উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ও গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে সারিন্দা বাজিয়ে ভাওয়াইয়া, লালনগীতি, পল্লীগীতিসহ বিভিন্ন গান পরিবেশন জীবিকা নির্বাহ করেন সুনীল। শুধু ফুলবাড়ী উপজেলায় নয়, তিনি রংপুরের বিভিন্ন জেলায়ও গান পরিবেশন করেন। সুনীলের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে উপস্থিত মানুষজন সাধ্যমতো আর্থিক সহযোগিতা করেন। এতে তার দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হয়। সেই টাকা দিয়েই কোনো রকম তার সংসার চলে। এভাবে ২২ বছর ধরে সুখে দুঃখে সুনীলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার সারিন্দা।

গান পরিবেশন করছেন সুনীল চন্দ্র রায়।

বালারহাট এলাকার আমিন মিয়া ও গৌরাঙ্গ চন্দ্র রায় জানান, সুনীল কয়েকদিন পর ফুলবাড়ী থেকে বিভিন্ন হাট বাজারে সারিন্দা বাজিয়ে গান গায়। বাজারের মানুষ গান শুনে দুই-চার টাকা দেয়। তাই দিয়ে সুনীল স্ত্রী-সন্তান নিয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন।

নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শফিকুল ইসলাম সাবু জানান, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সুনীল খুবই অভাবী। তিনি বিভিন্ন হাট বাজারে গান পরিবেশন করে মানুষের মনকে জয় করে নিয়েছেন। একটু সহযোগিতা করলে তিনি একদিন বড় গায়ক হতে পারতেন।

উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান জানান, সুনীলের থাকার জায়গা নেই। তিনি এখনো মামার বাড়ি থাকেন। আমি যতটুকু জানি তার মামা তাকে ৪ শতক জমি দিয়েছে। সেই জমিতে তার ঘর নির্মাণ করার সামর্থ্য নেই। করোনা কালীন তাকে ছোট একটা অনুদানের ব্যবস্থা করেছি। উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদের কাছে সুনীলের থাকার জন্য একটা ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।