রানির প্রতি জানাই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা

ব্রিটেনের রানি হিসাবে ৭০ বৎসরের রাজত্বকাল পূর্ণ করিলেন দ্বিতীয় এলিজাবেথ। রবিবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ছিল এই মাহেন্দ্রক্ষণ। প্লাটিনাম জুবিলি উপলক্ষ্যে রানি প্রাসাদে কেবল একটি কেক কাটেন ও একদল অতিথিকে আপ্যায়ন করেন। আগামী জুনে অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে তাহার এই রাজত্বের ৭০ বৎসর উদ্যাপন করা হইবে। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ বিশ্বের প্রথম কোনো রাজপরিবারের সদস্য, যিনি এত দীর্ঘ সময় ধরিয়া রাজত্ব করিতেছেন। বর্তমানে তাহার বয়স ৯৫ বৎসর।

কিন্তু এই বয়সেও তিনি বিভিন্ন রাজকীয় অনুষ্ঠানে সপ্রতিভ ও হাস্যোজ্জ্বল। তিনি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ঐতিহ্য ও মর্যাদার প্রতীক, অনন্য এক প্রতিচ্ছবি ও জীবন্ত কিংবদন্তি। ১৯৫২ সালে তিনি ব্রিটিশ সিংহাসনে আরোহণ করেন। ইহার আগে দীর্ঘসময় সিংহাসনে থাকিবার রেকর্ড রহিয়াছে রানি ভিক্টোরিয়ার। তিনি ১৮৩৭ হইতে ১৯০১ সাল পর্যন্ত ৬৪ বৎসর রাজত্ব করেন। সেই হিসাবে তিনি এক বিরল রেকর্ডের অধিকারীও বটে।

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্ম ১৯২৬ সালের ২১ এপ্রিল। পিতা ষষ্ঠ জর্জ এবং মাতা এলিজাবেথ বউয়েস। তাহার দীর্ঘ শাসনামলে ব্রিটেনে ১৪ জন প্রধানমন্ত্রী, যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ জন প্রেসিডেন্ট ও ছয় জন পোপ নির্বাচিত হইয়াছেন। তিনি বিশ্বের ১১৬টি দেশ সফর করেন। তিনি দুই বার ঢাকা সফর করেন। প্রথম বার পূর্ব পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তাহার বিমান নামিয়াছিল পুরাতন বিমানবন্দরে। সেই সময় রমনা পার্কের সম্মুখে একটি পুরাতন বাড়ি সাজানো হইয়াছিল তাহার জন্য। সেই বাড়িটিই এখন বঙ্গভবন। ১৩ ফেব্রুয়ারি রানি বাহির হইয়াছিলেন স্টিমারে বুড়িগঙ্গা ভ্রমণে। ইহার পর তিনি যান আদমজি জুট মিলে। ইহা ছাড়া আশির দশকে দ্বিতীয় বার ঢাকা আসেন তিনি। এই সময় তিনি ঢাকা হইতে গিয়াছিলের গাজীপুরের বৈরাগীচালা গ্রামে। সেখানে তিনি ঢেঁকিতে ধান ভানা, মুড়ি ভাজা ও মুরগি পালনসহ সাধারণ মানুষের জীবনধারা দেখিয়া মুগ্ধ হন।

ভারতীয় উপমহাদেশসহ বিশ্বের অনেক প্রান্েতই প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। তাহাদের শাসনের পরিব্যাপ্তি এতই বিস্তৃত ছিল যে, বলা হইত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে কখনো সূর্য অস্ত যায় না। উপমহাদেশে ব্রিটিশ রাজা-রানির আমল শেষ হইয়াছে ১৯৪৭ সালে। কিন্তু ‘রানি’ শব্দটি শুনিলে আজও ব্রিটেনের রানির কথাই আমাদের সম্মুখে চলিয়া আসে সশ্রদ্ধচিত্তে। রাজতন্ত্রের অনেক ক্ষমতাই এখন খর্ব করা হইলেও এখনো ব্রিটেনের রাজা বা রানি পার্লামেন্টের তৈরি আইনে সই করা, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা ও পার্লামেন্টের অধিবেশন ডাকাসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালের এক জরিপ অনুযায়ী ব্রিটেনের ৬৩ শতাংশ মানুষ চান, ভবিষ্যতেও যেন রাজতন্ত্র বহাল থাকে। যাহারা তাহা চান না তাহারা সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে ব্রিটেনে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান দেখিতে চান। সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধ ছাড়া অবশ্য ব্রিটেনে সকল সময়ই ছিল রাজতন্ত্র। রানি এলিজাবেথের মৃতু্যর পর রাজপরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়া অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করিলেও ব্রিটেনে শ্রীঘ্র রাজতন্ত্রের অবসান হইবে বলিয়া প্রতীয়মান হয় না।

রানি এলিজাবেথ ১৬টি সার্বভৌম রাষ্ট্রের রানি ও কমনওয়েলথভুক্ত ৫৪টি সদস্যবিশিষ্ট কমনওয়েলথ অব নেশনসের প্রধান। তিনি যুক্তরাজ্যের শাসনকর্তা ও চার্চ অব ইংল্যান্ডেরও প্রধান। ফলে বিশ্বে তিনি এক ঐতিহাসিক সম্মানের অধিকারী। প্রিন্সেস ডায়ানার বিবাহবিচ্ছেদ, মৃতু্য ইত্যাদি কারণে ব্রিটিশ রাজপরিবারের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমিতে থাকিলেও ডায়ানাপুত্র উইলিয়ামের বিবাহের পর তাহার জনপ্রিয়তা আবার তুঙ্গে। রবিবার তিনি জানাইয়াছেন, প্রিন্স অব ওয়েলস প্রিন্স চার্লস ব্রিটেনের রাজা হইলে তাহার স্ত্রী ডাচেস অব কর্নওয়াল ক্যামিলাকে তিনি ‘কুইন কনসর্ট’ হিসাবে দেখিতে চান। এইভাবে তিনি তাহার পরবর্তী উত্তরাধিকারী ঠিক করিয়া দিলেন। মানুষের নিকট পরম শ্রদ্ধেয় ও ভালোবাসার রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ শতায়ু লাভ করুন। তাহার শাসনামলের ৭০ বৎসর পূর্তিতে আমরা তাহার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই।