বিশৃঙ্খলাগুলি অপেক্ষায় থাকে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার

মানুষ কি স্বভাবগতভাবেই বিশৃঙ্খল প্রাণী? শৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রবণতা কি মানুষের স্বভাবগত অংশ, নাকি তৃতীয় বিশ্বের মানুষ আলাদা প্রজাতির? তাহাদের স্বভাবেই বিশৃঙ্খলা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা? এই সকল প্রশ্ন আমাদের মনে চিন্তার উদ্রেক করে। কারণ, আমাদের চারিদিকে এত বিশৃঙ্খলা যে, মনে হইতে পারে—এইখানে বিশৃঙ্খলা ও পরিকল্পনা পরস্পরবিরোধী নহে, বরং পরস্পরের পরিপূরক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার সামনে হইতে ধারণ করা একটি আলোকচিত্র গতকাল ইত্তেফাকের শেষ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হইয়াছে। আলোকচিত্রটির ক্যাপশনে লিখা হইয়াছে যে, রেলক্রসিংয়ে রেলবার নাই, আছে বাঁশ। উহা দিয়াই সম্মুখে আগত ট্রেনের পথ পরিষ্কার করিবার চেষ্টা করা হইয়াছে। ট্রেন আসিতেছে। গেটম্যান সবুজ সংকেত দিয়া বন্ধ করিয়া দিয়াছেন ক্রসিং। অথচ সেই বাধা উপেক্ষা করিয়াই দ্রুত রেললাইন পার হইতেছেন দুই নারী!

বলিবার অপেক্ষা রাখে না, যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটিতে পারে এবং আলোকচিত্রটির ছোট্ট শিরোনাম হইতে পারিত : ‘দুর্ঘটনার অপেক্ষায়...’। কতৃ‌র্পক্ষ সম্ভবত অপেক্ষায় রহিয়াছেন বাঁশের রেলক্রসিংয়ে একটি দুর্ঘটনা ঘটিবে, আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠিবে, তাহার পর তাহাদের টনক নড়িবে। এমনটি আমরা সকল সময় দেখিয়া আসিতেছি। ইতিপূর্বে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বলিয়াছেন যে, পৃথিবীতে আইন অমান্যকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে। অথচ আমাদের দেশের মানুষ বিদেশে গিয়া ঠিকই আইন মানিয়া চলিতেছেন। আমরাও অনেক বার বলিয়াছি যে, আমাদের দেশে আইন রহিয়াছে; কিন্তু আইন মানিবার প্রবণতা নাই। এইখানে যাহারা আইন প্রয়োগ করিবেন তাহাদের মধ্যেও আইন অমান্য করিবার প্রবণতা দেখা যায়। নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগিতে পারে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির নাগরিকরা কেন পৃথিবীতে আইন অমান্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয়? এই প্রশ্নের উত্তরে জড়াইয়া রহিয়াছে এই উপমহাদেশের মূলগত কিছু বৈশিষ্ট্য। আমাদের নৃতাত্ত্বিক, মনস্তাত্ত্বিক রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে ইহার উত্তর পাওয়া যাইতে পারে। রাস্তা দখল করিয়া হাটবাজার, খালবিল দখল করিয়া পট বিক্রয়, ফুটপাত দখল করিয়া সারি সারি দোকান, নিয়ম না মানিয়া রাস্তা ও রেললাইন পারাপার; অতঃপর দুর্ঘটনা—পত্রিকার পাতায় নিত্যদিন আমরা এমন অসংখ্য খবর দেখি। যিনি মোবাইল ফোনে কথা বলিতে বলিতে রাস্তা বা রেললাইন পার হইতেছেন, তিনি অবশ্যই জানেন যে, এই অনিয়মের জন্য যে কোনো মুহূর্তে তাহার মৃতু্য হইতে পারে; কিন্তু এই কাজ ঐ লোকটি আরো অসংখ্য মানুষকে করিতে দেখিয়াছেন। অনিয়ম করিয়া কয়েক হাজারে এক জন হয়তো দুর্ঘটনার শিকার হন; কিন্তু যাহারা ভাগ্যক্রমে বাঁচিয়া গিয়াছেন, তাহাদের দেখিয়া অন্যরাও উত্সাহিত হন একইভাবে পথ চলিতে। ইহাই মানুষের সাধারণ মনস্তত্ত্ব।

যদি আইন ভাঙিবার কারণে প্রতিটি ক্ষেত্রেই অর্থদণ্ড বা যে কোনো ধরনের দণ্ড ভোগ করিতে হইত—তাহা হইলে সেই দণ্ডের ভয়ে আইন না মানিয়া কাহারো কোনো উপায় থাকিত না। সুতরাং বাঙালিরা যখন উন্নত দেশে যান, তখন ঐ দেশটির আইনকানুন-নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটান না। কারণ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাইলেই তাহাকে বেশ ভালো অঙ্কের অর্থ জরিমানা দিতে হইবে। বিদেশের মতো একই চিত্র ঢাকায় জাহাঙ্গীর গেট পার হইলেই দেখা যায়। হয়তো শুনিতে অন্যরকম মনে হইতে পারে; কিন্তু ইহাই বাস্তবতা যে, আমাদের সেনানিয়ন্ত্রিত অংশে বা অঞ্চলে সকলেই নিয়মকানুন মানিয়াই চলাচল করেন। সেই সকল অঞ্চল দেখিলে মনে হয় না যে আমরা বাংলাদেশেই আছি! একই দেশের মধ্যে এই যে শৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলার ভিন্ন দুইটি চিত্র—ইহা আমাদের এই বার্তা দেয় যে, শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য নিশ্চিত দণ্ডের ভয় থাকিলে মানুষ সেইখানে নিয়মকানুন মানিবেই।

মনে রাখিতে হইবে, আইন ও নিয়মকানুন না মানিয়া পৃথিবীর কোনো দেশ উন্নতি করিতে পারে নাই। প্রকৃতি তথা বিশ্বজগতের ভিতরেও রহিয়াছে সুশৃঙ্খলতার অপূর্ব বিন্যাস। সেই অপূর্ব বিন্যাস দেখিয়া বোঝা যায়, সুশৃঙ্খলাই এই জগতের সবচাইতে বড় সৌন্দর্য। আমাদেরও সেই সৌন্দর্যকে ধারণ করিতে হইবে। জাতি হিসাবে উন্নতিসাধন করিতে হইলে ইহার কোনো বিকল্প নাই।