সংকট হইতে কেহই শঙ্কামুক্ত নহে

গত দুই বৎসর কিংবা তাহারও অধিক সময় ধরিয়া করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত সমগ্র বিশ্ব। করোনার ধাক্কা সামলাইয়া বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন ঘুরিয়া দাঁড়াইতে আরম্ভ করিতেছিল, ঠিক সেই সময়ই করোনার ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের তাণ্ডবে আবারও অর্থনীতিতে স্হবিরতা নামিয়া আসার আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের এক জরিপে উঠিয়া আসিয়াছে, ব্যবসায়-বাণিজ্যে করোনার ক্ষতি হইতে ৬১ শতাংশ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হইলেও ওমিক্রনের আক্রমণে আগামী দিনের অর্থনীতিতে সংকট সৃষ্টি হইবার আশঙ্কা রহিয়াছে। বিশেষত বিশ্ব জুড়িয়া জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে উৎপাদনমুখী খাতের পরিবহন ব্যয়, পণ্যমূল্য ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশসমূহের উৎপাদনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করিয়াছে। ইহার পাশাপাশি গ্যাস ও বিদু্যতের সমস্যায় সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন ব্যাহত হইতেছে। বাধ্য হইয়া উদ্যোক্তাদের কর্মী ছাঁটাই করিতে হইতেছে, কর্মহীন হইতেছেন হাজার হাজার কর্মী। এই পরিস্হিতি অব্যাহত থাকিলে উহা যে একসময় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি করিবে তাহা বলাই বাহুল্য।

নিঃসন্দেহে বলা যায়, বিশ্ববাজারে জ্বালানিসহ ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমিকের সংকট ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বাড়িয়া যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় যেই চাপ সৃষ্টি হইয়াছে তাহা উন্নত বিশ্বের দেশসমূহের তুলনায় উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহের জন্য অধিক উদ্বেগের কারণ হইয়াছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশই রহিয়াছে, যাহারা কলকারখানার জন্য শিল্পের কাঁচামাল, মেশিনারিজ হইতে শুরু করিয়া প্রতিটি জিনিসই বিদেশ হইতে আমদানি করিয়া থাকে। যেইহেতু সেই সকল দেশে উৎপাদনব্যবস্থার সকল কিছুই আমদানিনির্ভর এবং তাহারা উহার কোনো কিছুই সাধারণত উৎপাদন করে না, সেইহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানিসহ অন্যান্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাইলে অবধারিতভাবেই তাহাদের সামগ্রিক ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনীতির সিংহভাগই রাষ্ট্রের নিজের, অর্থাত্ সরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে; প্রাইভেট সেক্টর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিলেও তাহাদের আকার রাষ্ট্রের তুলনায় যত্সামান্যই। অথচ সরকারি বিভিন্ন খাত এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যের দিকে দৃষ্টি রাখিলে দেখা যাইবে, ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে বারবার অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হইলেও সেই সকল খাত হইতে কখনোই লাভের মুখ দেখা যায় না। সরকারি খাতের অর্থ আসিয়া থাকে করদাতাদের পকেট হইতে; যেইখানে সরকারি বিভিন্ন খাত হইতেই লাভের মুখ দেখিতে পাওয়া যায় না, সেইখানে বৈশ্বিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকে বেসরকারি খাত লাভ করিবে কীভাবে?

আমরা দেখিতে পাই, করোনার অভিঘাতে সমগ্র পৃথিবীতেই এক নিদারুণ সংকট সৃষ্টি হইয়াছে। আমেরিকার মতো বৃহত্ অর্থনীতির দেশও স্বীকার করিতেছে যে, করোনার কারণে তাহাদের অর্থনীতি স্হবির হইয়া পড়িয়াছে। তাহাদের আয়ের চাইতে ব্যয় বরাবরই অধিক হইয়া থাকে; কিন্তু করোনার কারণে সৃষ্ট সংকটে আয়ব্যয়ের এই ফারাক এখন আরো বৃদ্ধি পাইয়াছে। করোনাকালীন এবং করোনা-উৎতর অর্থনৈতিক এই সংকট-সমস্যা ও প্রতিকূলতাকে উন্নত বিশ্বের দেশসমূহ স্বীকার করিয়া লইতেছে এবং উহা মোকাবিলা করিবার লক্ষ্যে তাহারা প্রতিনিয়ত আলোচনা অব্যাহত রাখিয়াছে এবং নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করিতেছে। অথচ উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহে উহা লইয়া তৎপরতা লক্ষ করা যাইতেছে না। উন্নয়নশীল বিশ্বের নীতি-নির্ধারকদের মনে রাখিতে হইবে, বৈশ্বিক এই সংকট হইতে কেহই আশঙ্কামুক্ত নহে। দেশের শিল্প-কলকারখানাগুলি মুখ থুবড়াইয়া পড়িলে তথা সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় স্হবিরতা নামিয়া আসিলে রাষ্ট্রই অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হইবে। এমতাবস্থায় দেশের কলকারখানাগুলি ঠিকমতো চলিতেছে কি না, উৎপাদন কার্যক্রম সচল রহিয়াছে কি না—সেই দিকে নীতি-নির্ধারকদের গভীরভাবে নজর দিতে হইবে। উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহের নীতিনির্ধারক হইতে শুরু করিয়া উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যাহারা জড়িত, সকলকেই দূরদর্শিতার সহিত সংকট মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি লইতে হইবে।