স্বীকার করিতেই হইবে যে, কাঠামোগত দিক হইতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রান্তিক জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাইয়াছে। প্রতি ৬ হাজার জনগোষ্ঠীর জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, প্রতিটি ইউনিয়নে ইউনিয়ন সাবসেন্টার এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স লইয়া গড়িয়া উঠিয়াছে একটি শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক। স্পষ্টতই, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গুরুত্ব অপরিসীম। মনে রাখিতে হইবে, প্রাথমিক অবস্থায় রোগের চিকিত্সা দেওয়া সম্ভব হইলে রোগটি জটিল আকার ধারণ করিবার পূর্বেই উহার নিরাময় সম্ভব। তাহা ছাড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিনা মূল্যে বা কম খরচে স্বাস্থ্যসেবা পান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এই জন্য জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে সকলের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও জরুরি চিকিত্সাসেবা নিশ্চিতের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হইয়াছে, তাহা বাস্তবায়নে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলি দেশের স্বাস্থ্যের ভিত্তি হিসাবেই কাজ করে। ইতিপূর্বে সমগ্র দেশে ৩১ শয্যার ৪৯২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হইয়াছে। পরবর্তী সময় কোনো কোনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা হইতে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হইয়াছে; কিন্তু পাইলট ছাড়া কোটি কোটি টাকা মূল্যের বিমান যেমন আকাশে উড়িতে পারে না, তেমনি একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক না থাকিলে উহা বিরাটকায় শ্বেতহস্তীবৎ হইয়া থাকে।
দুঃখের ব্যাপার হইল, দেশের অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চিকিত্সক সংকটে ভুগিতেছে। যেইখানে একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজন ৯ হইতে ২১ জন চিকিত্সক, সেইখানে এক বা দুই জন ডাক্তার দিয়া চিকিত্সাসেবা কোনোভাবে চালু রাখা হইতেছে। দুঃখের ব্যাপার হইল, মাঝেমধ্যে সেই সবেধন নীলমণি চিকিত্সকও অনুপস্থিত থাকেন। দেশের সিংহভাগ মানুষ মফস্বলে বসবাস করেন, অথচ এই মহামারিকালেও তাহারা ন্যূনতম চিকিত্সাসেবা পাইতেছেন না। কয়েক মাস পূর্বে ইত্তেফাকে দেশের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দৈন্যচিত্র প্রকাশিত হয়। চট্টগ্রাম, মাগুরা, ফেনী, রাজশাহী, নেত্রকোনা, খুলনা, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও বাগেরহাটের ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্র প্রকাশ পায় সেই প্রতিবেদনে। সেইখানে বলা হয় যে, দেশের অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আস্থা নাই রোগীদের। ইহার নেপথ্যে রহিয়াছে জনবলসংকট, দুর্গন্ধময় পরিবেশ, অব্যবস্হাপনা, ডাক্তারদের অপেশাদার আচরণ ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার না থাকিবার কারণ। একশ্রেণির চিকিত্সকও সরকারি হাসপাতালের পরিবর্তে তাহাদের প্রাইভেট চেম্বারেই রোগী দেখিতে অধিক আগ্রহ বোধ করেন।
সুতরাং অর্থ, চিকিত্সা-সরঞ্জাম ও জনবলের সকল কিছু থাকিলেও যথাযথ ব্যবস্হাপনার অভাবে নামকাওয়াস্তে স্বাস্হ্যকাঠামো তৈরি হইতে পারে বটে; কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মানের স্বাস্হ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হইবে না। অথচ তৃণমূল স্তরে চিকিত্সাসেবা পৌঁছাইয়া দিতে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার অভাব নাই, যেই কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও স্বাস্হ্যকেন্দ্র গড়িয়া তোলা হইয়াছে। নিয়োগ দেওয়া হইতেছে নূতন নূতন চিকিত্সকও। এই তো মাত্রই গত মঙ্গলবার সরকারি স্বাস্হ্যসেবা খাতে ৪২তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে আরো ৩ হাজার ৯৫৭ জন চিকিত্সক নিয়োগ দিয়াছে সরকার। ইতিপূর্বে চিকিত্সকরা তৃণমূল স্তরে না থাকিলে তাহাদের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারিও একাধিক বার উচ্চারণ করিয়াছেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং; কিন্তু ইতিপূর্বে আমরা পত্রপত্রিকায় দেখিয়াছি, স্বাস্হ্য অধিদপ্তর হইতে গ্রামের হাসপাতালে বদলি ও পদায়ন করা হইলেও সরকারি দলের চিকিত্সক নেতাদের প্রভাব খাটাইয়া গ্রাম হইতে চলিয়া আসেন ঢাকায় বা অন্য বিভাগীয় শহরে। অনেক সময় গ্রামের হাসপাতালে না গিয়াই শহরে বসিয়া বেতন নেন মর্মে বিভিন্ন সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হইয়াছে নানান সময়। আর গ্রামের মানুষ তো আইসিইউ ও সিসিইউ চিকিত্সাসেবার কথা চিন্তাই করিতে পারেন না। এই জন্য সংকটাপন্ন রোগীরাও সেইখানে অহরহ মারা যান।
অন্যদিকে যথাযথ নজরদারির অভাবে দেশের অনেক স্বাস্হ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সা-সরঞ্জাম কোনো কাজেই লাগিতেছে না। বহু স্বাস্হ্য কমপ্লেক্সে এক্সরে মেশিন, অপারেশন থিয়েটার, সার্জারি মেশিনগুলি নষ্ট হইয়াছে অবহেলায় পড়িয়া থাকিয়া। সুতরাং উপজেলা স্বাস্হ্য ব্যবস্হার উন্নতির জন্য এই সকল বিষয়াদির কার্যকর ব্যবস্হা গ্রহণ করিতে হইবে। নচেৎ উপজেলা স্বাস্হ্য কমপ্লেক্সসমূহ তাহাদের সক্ষমতা অনুযায়ী ন্যূনতম সেবা প্রদান করিতে পারিবে না।