নাগরিক ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ

আধুনিককালের সঙ্গে তাল মিলাইতে হইলে সকল ক্ষেত্রে আধুনিক হওয়া জরুরি। ইহা উন্নয়নের একটি শর্ত বলিতে হইবে। সেই অর্থে বিবিএস-এর নাগরিক ডাটা তৈরির উদ্যোগটি কেবল প্রশংসনীয়ই নহে, ইহা নাগরিক তথ্যের ব্যাপারে একটি নূতন দ্বার উন্মোচন করিবে। আধুনিককালে দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চলাচলে ইহা এতই অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ যে ডাটার আওতাবিহীন জীবন যেন আর চলিতেছে না। বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর মিলনায়তনে জাতীয় জনসংখ্যাবিষয়ক কর্মশালায় একাধিক মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ জানাইয়াছেন, ভারতের আধার কার্ডের (আধার কার্ড বা আধারপত্র হইল ভারত সরকারের প্রদত্ত প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের জন্য একটি বিশেষ নম্বরযুক্ত পরিচয়পত্র।) চাইতেও শক্তিশালী নাগরিক ডাটাবেজ তৈরি করিতে যাইতেছে বিবিএস।

বলা হইয়াছে, জাতীয় জনসংখ্যা রেজিস্টারে শূন্য হইতে শুরু করিয়া সব বয়সের জনতাত্ত্বিক ও বায়োমেট্রিক তথ্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হইবে। পাশাপাশি প্রত্যেকের জন্য একটি স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ নম্বর দেওয়া হইবে। এই তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে সকল প্রকারের জনমিতিক পরিসংখ্যান, আগমন-বহির্গমন, জন্ম-মৃতু্য, বিবাহ-তালাক প্রভৃতি তথ্য সংরক্ষিত হইবে। ইহাতে সর্বমোট ৩৩ ধরনের তথ্য থাকিবে। যেমন ব্যক্তির নাম, পিতা-মাতার নাম, স্বামী বা স্ত্রীর নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল ফোন নম্বর, জন্মতারিখ, ইমেইল আইডি, রেসিডেন্স স্ট্যাটাস, ব্লাড গ্রুপ, পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ইত্যাদি। ইহাতে একজন ব্যক্তিকে সহজভাবে মুহূর্তেই চিহ্নিত বা শনাক্ত করা সম্ভব হইবে।

নিঃসন্দেহে এই কাজ সুচারুরূপে করিতে পারিলে একদিকে নাগরিকের নিজস্ব একটি প্রামাণিক কাজ সহজতর হইবে, অন্যদিকে প্রতারণাসহ বিভিন্ন অপরাধও অবিশ্বাস্য হারে কমিয়া যাইবে। বর্তমান বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে প্রতিটি মানুষের বৃত্তান্ত সংরক্ষিত থাকে। এই সংক্রান্ত অ্যাপসও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বিভিন্ন দপ্তরে থাকে। ঐ সকল দেশে পুলিশ যখন কোনো মানুষের বৈধতার প্রশ্নে বা অন্য কোনো কারণে জানিতে চাহে, তখন রাস্তায় দাঁড়াইয়া হাতের ডিভাইসে নাম ও জন্মতারিখ দিয়া চাপ দিলে মুহূর্তেই একজন মানুষের সারা জীবনের বৃত্তান্ত বাহির হইয়া যায়। আমরা আশা করিব, অদূর ভবিষ্যতে সরকার দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য সেই ব্যবস্থার দিকেই আগাইবে।

তবে বর্তমান উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়সাধ্য। কিন্তু অসম্ভব তো নহে। আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করিলে ইহা দ্রুতই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। দেশে আমরা কী দেখিয়া থাকি? মৃত ব্যক্তির নাম ব্যবহার করিয়া জমি বিক্রয়, ভুয়া দলিল তৈরির সংবাদ নেহাত কম নহে। একটি জাল দলিলের ঘটনা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নিকট ধরা পড়ে, জনসম্মুখে চলিয়া আসে তো আরো ১০টি ঘটনা গোপনই থাকিয়া যায়। এই সকল ঘটনাসহ বহু প্রকারের প্রতারণা বন্ধ হইবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অনেকটাই নিশ্চিত হইবে। সেই সঙ্গে বিদেশেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নত হইবে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের অনেক নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যে ঘাপলার কারণে বিদেশবাড়িতে জাতি হিসাবেই আমাদের প্রতি নির্ভরশীলতা কম। ইহাও তো সত্যি যে বাংলাদেশে বর্তমানে লক্ষ লক্ষ নাগরিক রহিয়াছে, যাহাদের জন্মতারিখ নিজেরাই সঠিকভাবে জানে না, প্রয়োজনের ক্ষেত্রে অনুমানে একটি তারিখ বসাইয়া দেয়। যাহার ফলে কোনো কোনো নাগরিককে চিহ্নিত করাও কঠিন হইয়া পড়ে। এমন ঘটনা আমরা কম দেখি নাই যে, একজন ব্যক্তির পরিবর্তে অন্যজন কারাবরণ করিয়াছে। এই মর্মান্িতক ঘটনারও অবসান হইবে বিবিএস-এর কাজটি সম্পন্ন হইলে। সুতরাং ইহা যত দ্রুত বাস্তবায়ন করা যাইবে ততই ইহার সুফল দেশবাসী ভোগ করিতে পারিবে।