কৃষিই বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির প্রাণ। অনাদিকাল থেকে এদেশের মানুষ খাদ্য-বস্ত্র ও বাসস্থানসহ মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য কৃষির ওপর নির্ভর করে আসছে। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে স্বাধীনতাউত্তরকালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কৃষিশিক্ষা, গবেষণা, সম্প্রসারণ ও কৃষির উপকরণ বিতরণ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
তিনি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে কৃষিখাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। জাতির পিতার প্রদর্শিত পথেই কৃষির সার্বিক উন্নয়নে নানামুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে (মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার)। ফলে আমরা এখন দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। পাশাপাশি শাক-সবজি ও দেশীয় ফলমূলের ব্যাপক উৎপাদন জাতীয় পর্যায়ে দৈনন্দিন পুষ্টিচাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অব্যাহত রাখতে আওয়ামী লীগ সরকার সব সময়ই কৃষিখাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত নার্সভুক্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ফসলের ৬৩১টি উচ্চফলনশীল নতুন জাত এবং ৯৪০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে অদ্যাবধি ব্রি কর্তৃক ধানের ৫৬টি জাত, বিএআরআই কর্তৃক বিভিন্ন ফসলের ২৬০টি জাত, বিজেআরআই কর্তৃক পাটের ১৫টি জাত, বিএসআরআই কর্তৃক ইক্ষুর ৯টি জাত ও সুগারবিট, তাল ও স্টেভিয়ার চারটি জাত, সিডিবি কর্তৃক তুলার ১০টি জাত এবং বিআইএনএ কর্তৃক বিভিন্ন ফসলের ৬৮টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।
জিএমও প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিটি বেগুনের চারটি জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং বিটি তুলার জাত উদ্ভাবনের কাজ চলমান রয়েছে। দেশি ও তোষা পাটের জীবনরহস্য আবিষ্কারসহ পাঁচ শতাধিক ফসলের ক্ষতিকর ছত্রাকের জীবন রহস্যোন্মোচন করা হয়েছে। পাট ও পাট জাতীয় আঁশ ফসলের ৫৪টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন ও উন্মুক্ত করা হয়েছে, এর ফলে কৃষি উৎপাদন পৌঁছেছে এক অভাবনীয় উচ্চতায়।
৩০ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে সোনালি ফসলে ভরপুর দেখতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে’। তাই তিনি কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন, সংস্কার-পুনঃসংস্কার, উন্নয়ন এবং ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, ঈক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনসহ কৃষির অনেক নতুন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেন এবং পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন আঙ্গিকে সাজিয়ে কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তি চর্চায় শিক্ষিত যুবকদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
১৩ ফেব্রুয়ারি কৃষি, কৃষক ও কৃষিবিদদের জন্য একটি স্মরণীয় দিন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোনার বাংলা গড়ার জন্য কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা দিয়েছিলেন।
সে সময়ে কৃষিবিদ নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলে বঙ্গবন্ধু বললেন. ‘তোরা ইঞ্জিনিয়ারদের সমান চাস কেন? তোরা বেশি চাবি। আমার কাছে তোফাইল সইয়ের জন্য আসবেই। কেউ না দিলে আমি তো তোদের দিবো।’ সে সময়ের বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট (বর্তমানে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়)-এর এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, নেতৃবৃন্দ ও সিনিয়র কৃষিবিদ জাতির পিতার কাছে এই দাবি জানালে তিনি সে মর্যাদা দিয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান সরকার নতুন পে-কমিশন বানালেন এবং সে পে-কমিশনে কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে অবনমন করে। পুনরায় কৃষিবিদরা বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। সিনিয়র কৃষিবিদ ও ছাত্র নেতৃবৃন্দের দাবির মুখে জিয়াউর রহমান বাধ্য হয়ে ১৯৭৮ এর মে মাসে সে দাবি মেনে নেন এবং ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন বঙ্গবন্ধুর দেয়া কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা।
কৃষিবিদদের এই মর্যাদাপ্রাপ্তির দীর্ঘকাল পরে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের ২৭ নভেম্বর ২০১০ তারিখের সভায় ১৩ ফেব্রুয়ারি দিনটি ‘কৃষিবিদ দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমান আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।
এই সিদ্ধান্তের আলোকে ২০১২ সাল থেকে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ ১৩ ফেব্রুয়ারি দিনটি কৃষিবিদ দিবস হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদায় ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করে আসছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন এই যে, দিনটিকে কৃষি, কৃষক ও কৃষিবিদদের জন্য জাতীয় দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য। আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক ঐক্য ও সংহতির মাধ্যমে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় নিজেদের উত্সর্গ করা।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন
বাংলাদেশ, ঢাকা মেট্রোপলিটন