২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। মোট ব্যয় ৯ দশমিক ৩০ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয় বা এডিপি ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা উচ্চাকাক্সক্ষী উন্নয়ন পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। তবে এই ব্যয় বৃদ্ধির বিপরীতে রাজস্ব আয়ের বৃদ্ধি মাত্র ৭ দশমিক ৩ শতাংশে সীমিত থাকায় সামষ্টিক ভারসাম্য দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এই অসম বৃদ্ধির ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ২৫ লাখ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ বেশি। এই ঘাটতি পূরণে ঋণ ও বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়বে, যা ভবিষ্যতে সুদের চাপ ও সামষ্টিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও উচ্চ ব্যয় ও বড় ঘাটতি সেই লক্ষ্য অর্জনকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
বাংলাদেশের বাজেট কাঠামোতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যয় ও রাজস্ব বৃদ্ধির মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে, যা এবার আরো স্পষ্ট হয়েছে। ফলে অর্থনীতি এখন ব্যয় সম্প্রসারণ, রাজস্ব সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবায়ন ঘাটতির সম্মিলিত চাপে রয়েছে। এডিপি ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হলেও বাস্তবে এর পূর্ণ বাস্তবায়ন সাধারণত সম্ভব হয় না। বাস্তবায়ন ঘাটতির কারণে প্রকৃত উন্নয়ন ব্যয় অনেক সময় লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকে, যা উন্নয়নের প্রত্যাশিত প্রভাবকে সীমিত করে। এই অবস্থায় মুদ্রাস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনও চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। বিনিয়োগের ধীরগতি, উচ্চ সুদের হার এবং রাজস্ব দুর্বলতার কারণে ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য চাপের মুখে পড়তে পারে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি ভারসাম্যহীন চাপ তৈরি হয়েছে।
জাতীয় বাজেটের এই সম্প্রসারণের মধ্যেও কৃষি খাতের অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্থবির। গত এক দশকে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়লেও মোট বাজেটের তুলনায় এর অংশীদারত্ব প্রায় ৫-৬ শতাংশেই সীমিত রয়েছে। ফলে বাজেট বড় হলেও কৃষির আপেক্ষিক গুরুত্ব প্রায় অপরিবর্তিত। এই প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কৃষি এখনো খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখে। তবু এটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে কাঠামোগতভাবে উন্নীত হয়নি।
কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সমস্যা হলো ন্যায্য হিস্যার সংকট, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণে আরো স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। সামগ্রিক বাজেট দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও কৃষির অংশীদারত্ব দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৫-৬ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ
থাকায় নামমাত্র বরাদ্দ বৃদ্ধি সত্তে¡ও এর আপেক্ষিক গুরুত্ব কার্যত স্থবির রয়ে গেছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট বাজেট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ দশমিক ৩০ লাখ কোটি টাকা, যেখানে আগের অর্থবছর ২০২৫-২৬-এ বাজেট ছিল প্রায় ৭.৯০ লাখ কোটি টাকা। এই ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ বাজেট প্রবৃদ্ধির তুলনায় কৃষি খাতে বরাদ্দের বৃদ্ধি অনেক কম। যদি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি খাতে বরাদ্দ প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়, তাহলে টাকার অঙ্কে তা ছিল প্রায় ৪৩ হাজা ৪৫০ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এটি সামান্য বেড়ে প্রায় ৪৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় দাঁড়ালেও প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬-৭ শতাংশের মধ্যে সীমিত। এর বিপরীতে জাতীয় বাজেট বেড়েছে প্রায় ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ হারে, যা কৃষির আপেক্ষিক অবমূল্যায়নকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।
এই ব্যবধান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন কৃষির সম্ভাব্য ন্যায্য হিস্যা বিবেচনা করা হয়। সামষ্টিক অর্থনীতিতে কৃষির অবদান অনুযায়ী এর অংশীদারত্ব অন্তত ৭-৮ শতাংশ হওয়া যুক্তিযুক্ত ছিল। সেই হিসাবে ৯ দশমিক ৩০ লাখ কোটি টাকার বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত ছিল প্রায় ৬৫ হাজার থেকে ৭৪ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবে বরাদ্দ সেই সম্ভাব্য ন্যায্য স্তরের তুলনায় প্রায় ১৮ হাজার থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা কম। এই ঘাটতি শুধু সংখ্যাগত নয়, বরং নীতিগত অগ্রাধিকারের একটি স্পষ্ট সংকেত। এই অসমতা আরও গভীর হয় ভর্তুকি কাঠামোর পরিবর্তনের মাধ্যমে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভর্তুকি দীর্ঘদিন ধরে কৃষি উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেখা যায়, মোট ভর্তুকি ব্যয় প্রায় ১ দশমিক ১০ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছালেও এর বৃদ্ধি মূলত জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে কেন্দ্রীভ‚ত হয়েছে। যদি কৃষির অর্থনৈতিক অবদান অনুযায়ী ন্যায্য হিস্যা নির্ধারণ করা হতো, তবে মোট ভর্তুকির অন্তত ৩৫-৪০ শতাংশ কৃষি খাতে বরাদ্দ হওয়া যুক্তিযুক্ত ছিল। সেই হিসাবে কৃষি ভর্তুকি হওয়া উচিত ছিল প্রায় ৩৮ হাজার থেকে ৪৪ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ বাস্তব বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৩ হাজার থেকে ৯ হাজার কোটি টাকা কম।
এই ঘাটতির প্রভাব সরাসরি কৃষি উৎপাদন ব্যয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। সার, ফিড, জ্বালানি এবং আমদানিনির্ভর কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে কৃষকের ইনপুট খরচ ক্রমাগত বাড়লেও ভর্তুকি সহায়তা সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে একটি অসম নীতিগত কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে কিন্তু সহায়তা কাঠামো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের মুনাফা সক্ষমতা এবং কৃষি বিনিয়োগের প্রবণতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ কৃষি উৎপাদনের মূল ভিত্তি হলো ইনপুট খরচের স্থিতিশীলতা, যা ভর্তুকি নীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কথা।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, কৃষি খাতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও উৎপাদন আধুনিকায়নের কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও ন্যায্য হিস্যার সংকট এবং ভর্তুকি কাঠামোর পরিবর্তন মিলিয়ে একটি স্পষ্ট কাঠামোগত অসমতা তৈরি হয়েছে। বাজেট সম্প্রসারণের এই প্রেক্ষাপটে কৃষি খাতের আপেক্ষিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়া ভবিষ্যতের কৃষি উন্নয়ন ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে
যাচ্ছে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও বাজারে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব সীমিত। বিশেষ করে মাছ, মাংস এবং অন্যান্য কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধি সত্তে¡ও দাম স্থিতিশীল হয়নি। এই বৈপরীত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংকেত বহন করে সমস্যা উৎপাদনে নয়, বরং বণ্টন ব্যবস্থায়। সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা, কোল্ড চেইনের অভাব, আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীর আধিপত্য কৃষিপণ্যের বাজারকে অদক্ষ করে তুলেছে। ফলে কৃষক পর্যায়ে দাম কম থাকলেও ভোক্তা পর্যায়ে দাম বেশি থাকে, যা বাজার ব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতা নির্দেশ করে। এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে শুধুমাত্র উৎপাদন বাড়ানো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং বাজার সংস্কার, সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং কৃষক-ভোক্তা সরাসরি সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। কোল্ড স্টোরেজ, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল বাজার প্ল্যাটফর্মের অভাব এই ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোতে তিনটি মৌলিক সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, রাজস্ব ও ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কার। রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা এবং ভর্তুকি কাঠামোর অদক্ষতা একসাথে বাজেট ঘাটতিকে বাড়িয়ে তুলছে। এই কাঠামো পুনর্বিন্যাস না হলে অর্থনৈতিক চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকবে। দ্বিতীয়ত, আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করা। কৃষি ও খাদ্য খাতে আমদানিনির্ভরতা কমানো না গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে পারে। তৃতীয়ত, সরবরাহ শৃঙ্খল ও বাজার দক্ষতা বৃদ্ধি। কৃষি উৎপাদনের প্রকৃত সুফল পেতে হলে একটি কার্যকর ও স্বচ্ছ বাজার ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব সীমিত এবং কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত। এই তিনটি সংস্কার বাস্তবায়িত হলে কৃষি খাত কেবল উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে না, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

