বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা

ঔষুধ লইয়া কোনো কিছু লিখিতে গেলেই আমরা এখন সতর্কতা অবলম্বন করি। কেননা বাংলাদেশে ঔষুধ শিল্প এখন বিস্ময়করভাবে বিকশিত হইয়া চলিয়াছে। আমরা জানি, এক সময় দেশের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ ঔষধই আমদানি করা হইত। এখন প্রয়োজনীয় ঔষধের ৯৮ শতাংশেরওঅধিক উৎপাদিত হইতেছে এই দেশেই। শুধু তাহাই নহে, দেশের চাহিদা মিটাইয়া ১৫৭টি দেশে আমাদের তৈরি ঔষধ রপ্তানি হইতেছে। বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবজনক। এমনও বলা হইতেছে, বর্তমানের প্রধান রপ্তানিখাতে গার্মেন্টসের পর বিকল্প শিল্প হিসাবে ঔষধ শিল্প গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করিয়া লইবে। এই প্রেক্ষিতে ভেজাল ও নিম্নমানের ঔষধ লইয়া পত্র-পত্রিকায় মাঝেমধ্যে যেসব সংবাদ প্রকাশিত হয়, তাহাতে ঢালাও মন্তব্য করিবার কোনো অবকাশ নাই। অধিকাংশই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। একশ্রেণির ছোট ও মাঝারি কোম্পানির ব্যাপারেই অভিযোগ অধিক, যাহাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিলে তাহা বড় বড় কোম্পানির জন্য কল্যাণকরই হইবে।

এদিকে শুধু অ্যালাপেথিকই নহে, আয়ুর্বেদীয় ঔষধেও ভেজালের ছড়াছাড়ি পরিলক্ষিত হইতেছে। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি রিপোর্টের শিরোনাম : যশোরে ভেজাল ও নিম্নমানের আয়ুর্বেদ ওষধের ছড়াছড়ি। সেইখানে বলা হইয়াছে, চিরায়ত ইউনানী, আয়ুর্বেদ ও হার্বাল কোম্পানির ঔষধেও ভেজাল ধরা পড়িয়াছে। সাধারণ মানুষ আর যাইবে কোথায়? গত এক বত্সরে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর স্থানীয় বাজার হইতে ৮৫টি ঔষধের নমুনা সংগ্রহ করিয়া ঢাকায় পাঠাইবার পর ল্যাব পরীক্ষায় দেখা গিয়াছে সাতটি প্রতিষ্ঠানের আট প্রকার ঔষধ নিম্নমানের। এই সাতটি অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছয়টিই আবার ইউনানী, আয়ুর্বেদ ও হার্বাল কোম্পানির। ফলে তাহাদের উৎপাদন বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ড্রাগ আইনে মামলা দায়ের করা হইয়াছে। জোরদার করা হইয়াছে সার্ভিল্যান্স। অথচ এইসব ঔষধও যে ভেজাল হইতে পারে এই ব্যাপারে আমাদের মধ্যে সচেতনতা কম। এইসব ঔষধ অর্গানিক এবং ইহাতে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নাই বলিয়া প্রচার চালানো হয়। কিন্তু তাহা যদি ভেজাল হয়, তাহা হইলে তাহাতে যে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নাই এমন কথা বলা যাইবে না।

ঔষধ মানুষের জীবন রক্ষার কাজে ব্যবহূত হয়। ইহা লইয়া যাহারা ভেজাল কারবার করিয়া থাকে, তাহাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। শহর-নগরসহ প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে হইতেও বিভিন্ন সময় স্যাম্পল সংগ্রহ করিয়া ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক ত্বড়িত্ ব্যবস্থা লওয়া আবশ্যক। প্রসঙ্গত এখানে বিকল্প মেডিসিনের কথা আসিয়া যায়। হোমিওপ্যাথিক, আয়ুর্বেদিক, ইউনানী প্রভৃতি চিকিৎসা ব্যবস্থা যে ফলোদায়ক নহে, তাহা আমরা বলি না। যদি কোনো উপকারই না পাওয়া যাইবে, তাহা হইলে বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া এই চিকিৎসাব্যবস্থা বহাল রহিয়াছে কীভাবে? এইসব বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থার যেসব ঔষধ অ্যালোপেথিকের চাইতে অধিকতর কার্যকর ও চিকিৎসাব্যয় সাশ্রয়ী, জাতীয়ভাবে তাহার প্রচার-প্রসার জরুরি। এই বহুবিধ চিকিৎসা পদ্ধতির একটি সমন্বিত জাতীয় ব্যবস্থাপনা থাকা আবশ্যক বলিয়া আমরা মনে করি যাহাতে জনগণ উপকৃত হন। যেই যেই পদ্ধতি যেই যেই ক্ষেত্রে অধিকতর কার্যকর শুধু তাহারই ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিয়া বিভিন্ন হাসপাতালে তাহার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা উচিত। ভারতে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে পৃথক একটি মন্ত্রণালয় আছে। চীনেও নিজস্ব চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আজ গুরুত্ব দেওয়া হইতেছে। আমরাও ইহা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিতে পারি। এইজন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত ও বিকল্প চিকিৎসাব্যবস্থাপনা গড়িয়া তুলিতে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক। অ্যালোপেথিক চিকিৎসা ব্যবস্থা যেইভাবে অধিকতর টেস্ট নির্ভর, ব্যয়বহুল ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসম্পন্ন হইয়া পড়িয়াছে, তাহাতে এই ব্যাপারে আমাদের নূতন চিন্তাভাবনার প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে, ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই।