ভালো চিন্তা, উৎসাহব্যঞ্জক কিন্তু...

চট্টগ্রাম ট্রাফিক পুলিশ কতৃ‌র্পক্ষ বড়ই ইতিবাচক চিন্তা করিয়াছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি তাহারা রাস্তায় নামিয়া যেই সকল যানবাহনের কাগজপত্র সঠিক আছে এবং চালকের লাইসেন্স ঠিকঠাক আছে তাহাদের লাল গোলাপ দিয়া শুভেচ্ছা জানাইয়াছে। পত্রিকান্তরে ছবি ছাপা হইয়াছে, খোদ চট্টগ্রাম ট্রাফিক পুলিশের উপ-কমিশনার হাসিমুখে, আন্তরিকতার সহিত গাড়ির চালককে ফুল উপহার দিয়াছেন। ইহাতে পুলিশের সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়াছে। ইহার সহিত বৈধ যানবাহনের মালিক এবং লাইসেন্সধারী চালকরাও এই উদ্যোগে নিশ্চয়ই খুশি হইয়াছেন। ইহা অবশ্যই উত্সাহব্যঞ্জক একটি উদ্যোগ কোনো সন্দেহ নাই। উল্লেখ্য, ঢাকার পরই দেশের ব্যস্ততম শহর চট্টগ্রাম। যানবাহন ও সড়কের সংখ্যাতেও চট্টগ্রাম ঢাকার পরেই। যানবাহন দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় চট্টগ্রামে শুরু হইয়াছে যানজট।

চট্টগ্রাম ট্রাফিক পুলিশ এমন একটি দেশে এই ফুল উপহার দেওয়ার মহতি চিন্তা করিয়াছে, যেই দেশে সড়কে চলাচলকারী প্রায় অর্ধেক যানবাহনের কোনো না কোনো ত্রুটি রহিয়াছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কতৃ‌র্পক্ষের হিসাব অনুযায়ী দেশে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ৪৫ লক্ষ ৬৮ হাজার (বেসরকারি একাধিক সংস্থার মতে অনিবন্ধিত, ফিটনেসবিহীন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন রহিয়াছে আরো কয়েক লক্ষ); কিন্তু নিরাপদ সড়ক চাই জানাইয়াছে, দেশে ২৪ লক্ষ অদক্ষ এবং লাইসেন্সবিহীন চালক সড়কে দাপাইয়া বেড়াইতেছে। সত্যি কথা হইল, সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়কের বিশৃঙ্খলা সকল রেকর্ড ভঙ্গ করিয়াছে। প্রতিদিন যে ভয়াবহ দুর্ঘটনার সংবাদ প্রকাশিত হয় তাহা ইহজগতের অন্য কোথাও দেখা যায় না। কেবল প্রাণহানিই নহে, এক রিপোর্ট হইতে জানা গিয়াছে, ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মানবসম্পদের ক্ষতির আর্থিক মূল্য ৯ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা। আর এই সকলের পিছনে সড়কে বিশৃঙ্খলাই যে দায়ী তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অদক্ষ চালক, যাহারা প্রকৃত অর্থে লাইসেন্সবিহীন। সম্প্রতি ফটিকছড়িতে সড়ক দুর্ঘটনায় যেই দুই ছাত্রীর মর্মান্িতক মৃতু্যর ঘটনার সহিত জড়িত গাড়িটি যেই ব্যক্তি চালাইতেছিল তাহার কোনো লাইসেন্স ছিল না।

এখন প্রশ্ন হইল, ইহা কী করিয়া সম্ভব? দেশে ১০ সহস্রাধিক ট্রাফিক পুলিশ রহিয়াছে। শুধু ঢাকার রাস্তাতেই ৪ হাজার ট্রাফিক পুলিশ রহিয়াছে। নিশ্চয়ই মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন বনজঙ্গল দিয়া চলাচল করে না! দুই-একটি যানবাহন হইলে বা কয়েক শত যানবাহন লাইসেন্সবিহীন চলাফিরা করিলে তাহা লইয়া বারবার বলিবার কিছু ছিল না; কিন্তু লক্ষ লক্ষ চালক লাইসেন্সবিহীন, গাড়ি ফিটনেসবিহীন তাহা হয় কী করিয়া? আমরা জানি, ট্রাফিক পুলিশের অনেক সীমাবদ্ধতা রহিয়াছে। তাহাদের গাড়ির পাশাপাশি সড়কে চলাচলকারী মানুষকেও নিয়ন্ত্রণ করিতে হয়। ইহাও ঠিক যে, প্রয়োজনের তুলনায় হয়তো লোকবলও কম রহিয়াছে। তাই বলিয়া সড়ক পুরাপুরি ‘ভোলাটাইল’ হইলে চলিবে কী করিয়া? সরকার সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সড়ক আইনে পরিবর্তন আনিয়াছে। কতৃ‌র্পক্ষ বেশ কিছু সুপারিশ দিয়াছে; কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সড়কে যাহাদের শৃঙ্খলা আনিবার কথা তাহারা শক্ত না হইলে কোনো কিছুতেই কাজ হইবে না। একদিকে মানুষের মধ্যে আইন মানিবার প্রবণতা নাই, অন্যদিকে সড়কে ‘লেনদেন’ চলে প্রায় প্রকাশ্যেই। কতৃ‌র্পক্ষের উচিত হইবে সেই সকল চিরাচরিত অনিয়মগুলি দূর করা। ফুল মানুষ মানুষকে উপহার দিলে হূদ্যতা বাড়ে। কোনো দেশ বা কোনো প্রতিষ্ঠান কাহাকে ফুল উপহার দিলে তাহা শুভেচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। ইহাকে আমরা আন্তরিকতার সহিত সাধুবাদ জানাই; কিন্তু ফুল উপহারের চাইতে অনেক অধিক কার্যকর হইবে আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় না দিলে। ট্রাফিক কতৃ‌র্পক্ষ সেই দিকে নজর দিবেন বলিয়াই আমাদের আশা।