প্রতারণা করে রাসিকের ৮০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, মেয়রের অভিযোগ

আন্তর্জাতিক জালিয়াতিচক্র প্রতারণার মাধ্যমে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে ৮০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মেয়র এ.এইচ.এম. খায়রুজ্জামান লিটন। বুধবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টায় নগর ভবনের সিটি হল সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এই অভিযোগ করেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এ.এইচ.এম. খায়রুজ্জামান লিটন।

সংবাদ সম্মেলনে মেয়র বলেন, ‘রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন দেশের অন্যতম সিটি কর্পোরেশন। মহানগরবাসীর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সবুজায়ন, বায়ু দূষণ কমানো, ইপিআই কার্যক্রমে জাতীয়ভাবে পরপর ১০ বার দেশসেরা হওয়া সহ নানাবিধ ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের অদম্য অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতায় ব্যাপক উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের প্রাণের মহানগরী রাজশাহীও উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, আন্তর্জাতিক একটি চক্র জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। চক্রটি কৌশলে আমার (মেয়র লিটন) পাসপোর্ট জালিয়াতি, ভূয়া ইমেইল আইডি ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার ও সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তার ভূয়া নাম, পদবি ও স্বাক্ষর ব্যবহারের মাধ্যমে একটি কোরিয়ান কোম্পানির নিকট থেকে ৮টি ফায়ার ফাইটিং ট্রাক ক্রয়ের জন্য ৯টি ভূয়া ডকুমেন্টের মাধ্যমে কথিত চুক্তিপত্র সম্পাদন করেছে বলে জানতে পেরেছি।’


মেয়র উল্লেখ করেন, ‘ওই কোরিয়ান কোম্পানি কোনও তৃতীয় পক্ষের দ্বারা প্রতারিত হয়েছে, নাকি কোম্পানির মালিক ও তার সহযোগিরা নিজেরাই বিভিন্ন ভূয়া ডকুমেন্ট তৈরি করে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনকে ফাঁসানোর জন্য অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তা যথাযথ তদন্ত ও তথ্য-প্রমাণ প্রাপ্তি সাপেক্ষে জানা যাবে। তবে আমার (মেয়র লিটন) সাথে ফোনালাপ কিংবা আমার ই-মেইলে যোগাযোগ না করে ভূয়া ইমেইলে যোগাযোগের মাধ্যমে চুক্তিপত্র সম্পাদনের বিষয়টি অবহিত করার পরও দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে ওই কোম্পানির মালিক কর্তৃক একাধিকবার যোগাযোগ ও মিথ্যা অভিযোগ দাখিল করায় আমার (মেয়র) ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। যা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্টের গভীর অপচেষ্টা।’

সংবাদ সম্মেলনে মেয়র আরও বলেন, ‘রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন বাংলাদেশের একটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের কার্যাবলীর মধ্যে ফায়ার ফাইটিং সেবা অন্তর্ভুক্ত নয়। বাংলাদেশে ফায়ার ফাইটিং এর জন্য ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স নামক একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি সংস্থা রয়েছে। স্বভাবতই, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক ফায়ার ফাইটিং ট্রাক ক্রয়ের কোনও প্রশ্নই আসে না। বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক ও অযৌক্তিকও। বাংলাদেশে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া পিপিআর আইন-২০০৬ ও পিপিআর বিধিমালা-২০০৮ অনুযায়ী সিটি কর্পোরেশনের সকল ক্রয় কার্যক্রম সম্পাদিত হয়। যে কোনও পণ্য (যানবাহন) ক্রয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম মেনে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সরবরাহকারীর নিকট থেকে ক্রয় করা হয়ে থাকে। সরাসরি বিজ্ঞপ্তি ব্যতিরেকে সরকারি অর্থের মাধ্যমে এরূপ বৃহৎ অংকের পণ্য (যানবাহন) কোন সরবরাহকারীর নিকট থেকে ক্রয়ের সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে কোরিয়ান কোম্পানির সাথে ১০.১২ মিলিয়ন ইউএস ডলারের সরাসরি ক্রয়চুক্তি সরকারি ক্রয় নীতিমালা পরিপন্থী ও বাস্তবসম্মত নয়।’

রাসিক মেয়র বলেন, ‘গত ১৩-০১-২০১৮ তারিখে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি রাজশাহীতে ১০০ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণের আগ্রহ দেখিয়ে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বরাবর পত্র দিয়েছিল। পত্রের প্রেক্ষিতে সেই সময়ে ওই কোম্পানির প্রেসিডেন্ট বি.সি শিন্ (একই ব্যক্তি) রাজশাহীতে আসেন। একাধিক আলোচনার পর রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে সোলার পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণে অনাগ্রহ দেখানোয় সে সময়েই পত্রযোগাযোগসহ এ বিষয়টির সমাপ্তি ঘটে। এর প্রায় তিন বছর পর ০১.১২.২০২১ তারিখে বি.সি শিন্ তার টেলিফোন নম্বর থেকে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ইঞ্জিনিয়ারিং এ্যাডভাইজার মো. আশরাফুল হককে ফোন করে ৮টি ফায়ার ফাইটিং ট্রাক রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে ক্রয়ের বিষয়ে জানতে চান। তখন সিটি কর্পোরেশনের সাথে কোম্পানিটির কখনোই যোগাযোগ না হওয়ার বিষয়টি বি.সি শিন্-কে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর বি.সি শিন্ কয়েকটি ই-মেইল পাঠিয়ে তার কোম্পানি থেকে ৮টি ফায়ার ফাইটিং ট্রাক ক্রয় বিষয়ক ভূয়া ডকুমেন্ট প্রেরণ করেন। সিটি কর্পোরেশনের ইঞ্জিনিয়ারিং এ্যাডভাইজার মো. আশরাফুল হকের নিকট প্রেরিত ডকুমেন্ট ও পূর্বের কথিত ইমেইলসমূহ যাচাই করে দেখা যায় যে,  বি.সি শিন্ ৮টি ফায়ার ফাইটিং ট্রাক ক্রয় সংক্রান্ত যাবতীয় যোগাযোগ একটি ভূয়া ইমেইল এড্রেস (khzzaman_liton@yahoo.com) এর সাথে করেছেন। যা আমার ইমেইল এড্রেস নয়। প্রকৃতপক্ষে, আমার ইমেইল এড্রেস khzaman_liton@yahoo.com। লক্ষণীয় যে, আমার ইমেইল এড্রেস থেকে বি.সি শিন্-এর যোগাযোগকৃত ইমেইল এড্রেসে একটি জেড (z) বেশি। বি.সি শিন্ তার কথিত অর্থ লেনদেনের কোনও পর্যায়ে তিনি আমার সাথে ফোনালাপ বা আমার প্রকৃত ইমেইল এড্রেসে কোন ইমেইল প্রেরণ করেননি।’

সংবাদ সম্মেলনে মেয়র জানান, ‘এরপরও গত ৪ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে তিনি আমার বরাবর কথিত যে ডিমান্ড নোটিশ প্রেরণ করেছেন, তার সংযুক্তি হিসেবে প্রাপ্ত ৯টি ডকুমেন্ট যাচাই-বাছাই করে আমার পাসপোর্ট জালিয়াতি ও ভূয়া ইমেইল আইডি ব্যবহার, সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তার ভূয়া নাম, পদবি ও স্বাক্ষর ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। যার কিছু বর্ণনা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।’ 

মেয়র জানান, বি.সি শিন্-এর ডকুমেন্টে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের যে প্যাড ব্যবহার করা হয়েছে, তা কর্পোরেশনের নয়। এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এর যে নাম দেখানো হয়েছে, সে নামে কোন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সিটি কর্পোরেশনে কখন কর্মরত ছিলেন না। চুক্তিতে মো. ইসলাম খান উদ্দিন নামে সিটি কর্পোরেশনের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার নাম, পদবি ও সিল উল্লেখ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সিটি কর্পোরেশনে মো. ইসলাম খান উদ্দিন নামে কোনও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বর্তমানে কর্মরত নেই বা কখনও ছিলেন না। 

রাসিক মেয়র বলেন, ‘এতে প্রমাণিত হয়- কোরিয়ান কোম্পানির প্রদানকৃত চুক্তিপত্রটি বানোয়াট ও ভূয়া। এ ছাড়া ইমেইলে যে টাইম জোন দেখা যায়, সেটি বাংলাদেশ বা দক্ষিণ কোরিয়ার নয়। বরং সেটি নাইজেরিয়াসহ কয়েকটি দেশের টাইম জোন বলে প্রতীয়মান হয়। ডকুমেন্টে প্রদত্ত ইমেইল এড্রেস ও মোবাইল নাম্বার আমার নয়। ডকুমেন্ট হিসেবে সংযুক্ত আছে পাসপোর্টের দু’টি জাল পাতা। সেখানে প্রদত্ত আমার নাম, পাসপোর্ট নম্বর, ইর্মাজেন্সি কন্টাক্ট ও অন্যান্য তথ্যাদি সঠিক নয়। পাসপোর্টে থাকা ছবিটি পাসপোর্ট সাইজের না। আমার ছবিটি পোস্টার বা ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করে পাসপোর্টে লাগানো হয়েছে। সুতরাং বি.সি শিন্-এর কথিত লেনদেনের দায় আমার বা রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এর উপর বর্তায় না। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজার হতে বাংলাদেশে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তফসিলি ব্যাংকে এল.সি খোলার মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করা হয়ে থাকে। কোরিয়ান কোম্পানি তাদের নিজস্ব আবেদনপত্রে দাবি করেছে, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মহোদয় কোরিয়ান কোম্পানিকে ফিলিপাইন ও যুক্তরাজ্যের জনৈক ব্যক্তিবর্গকে ৭৮,৮৯৩ ইউএস ডলার প্রদান করার নির্দেশনা দিয়েছেন। সংযুক্তিতে ক্রয়চুক্তিটি পর্যালোচনা করে দেখা যায় কোরিয়ান কোম্পানি কর্তৃক দক্ষিণ কারিয়ায় উৎপাদিত ফায়ার ফাইটিং ট্রাক রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনকে সরবরাহ করবেন। সেক্ষেত্রে, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মহোদয় কর্তৃক কোরিয়ান কোম্পানিকে ফিলিপাইন ও যুক্তরাজ্যে অর্থ প্রেরণের নির্দেশনার দাবীটি হাস্যকর ও অযৌক্তিক।’

লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন শেষে মেয়র উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এ সময় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে প্যানেল মেয়র-১ সরিফুল ইসলাম বাবু, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এবিএম শরীফ উদ্দিন, সচিব মো. মশিউর রহমান, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাডভাইজার মো. আশরাফুল হক, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইমরানুল হক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।