রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা নূতন নহে। এখন ইহা যেন অনেকটা স্বাভাবিক ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছে। মানুষ অনেক ক্ষেত্রে ইহার কোনো প্রতিকার পায় না বলিয়া থানা-পুলিশের দ্বারস্থ হইতে চাহে না। মাঝেমধ্যে ছিনতাইকারীদের হাতে মানুষের মৃতু্যর ঘটনাও ঘটে। তখন ইহা লইয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুটা নড়িয়াচড়িয়া উঠে। ইহার পর পরিস্থিতি আবার পূর্বের মতোই বেগতিক হইয়া পড়ে। রাজধানীতে মূলত ভোরে, সন্ধ্যায় ও গভীর রাত্রে ছিনতাইয়ের ঘটনা অধিক ঘটিয়া থাকে। এই ঢাকা শহরে ছিনতাইয়ের দেড় শতাধিক স্পট আছে বলিয়া জানা যায়। এই সকল স্পটে উল্লিখিত সময়ে পুলিশের টহল বৃদ্ধি করা উচিত। কোনো ভিআইপি ব্যক্তির মোবাইল ফোনসেটসহ টাকাপয়সা ছিনতাই হইলে পুলিশ অনেক সময় তাহা দ্রুত উদ্ধার করিয়া ফেলে। ইহাতে বুঝা যায়, ছিনতাইকারীদের নাড়িনক্ষত্র, বংশপরিচয় ইত্যাদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অজানা নহে। কোন এলাকায় কাহারা ছিনতাইয়ের সহিত জড়িত, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাহাদের নেটওয়ার্ক পুলিশের জানা রহিয়াছে। সেই অনুযায়ী মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করিলেই তাহাদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হইয়া যাইতে বাধ্য।
বর্তমানে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হইয়াছে। ইহা অস্বীকার করিবার কোনো উপায় নাই। খুনখারাবির ঘটনা তুলনামূলকভাবে কমিয়া গিয়াছে। রাজনৈতিক অস্থিরতাও তেমন একটা নাই; কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে চুরি-ছিনতাইয়ের যেই সকল ঘটনা ঘটিতেছে তাহা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ লওয়া হইতেছে না। করোনাকালে মানুষের আয়রোজগার ও কর্মসংস্থানে ভাটা পড়িয়াছে। ইহার কারণেও এই সকল ঘটনা বাড়িতে পারে। পুলিশের ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণে ইহারও অবসান ঘটিতে পারে। গতকাল ইত্তেফাকের রিপোর্টে বলা হইয়াছে, রাতের আতঙ্ক হইয়া পড়িয়াছে ‘উড়ন্ত’ ছিনতাইকারীরা। তাহারা মোটরসাইকেল বা প্রাইভেট কারে আসিয়া পথরোধপূর্বক মুহূর্তের মধ্যে ছিনতাই করিয়া ফাঁকা রাস্তা দিয়া দ্রুত পালাইয়া যায়। পথচারী ও রিকশার যাত্রীরা তাহাদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হইয়াছে। ছিনতাইয়ে বাধা দিলেই তাহারা ছুরিকাঘাত করিতেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অপরাধ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সালে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয় ১৪৫টি। আর ২০২০ সালে মামলা হয় ১৭৬টি। অর্থাত্ এখানে স্পষ্টত উন্নতির প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে; কিন্তু যাহারা মামলা করিতেছেন না, তাহাদের খবর কি আমরা রাখি? ২০১৪ ও ২০১৫ সালে এই সংক্রান্ত মামলা হইয়াছিল যথাক্রমে ২৬৫ ও ২০৫টি। ইহাতে বুঝা যায়, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময় সাধারণত এই ধরনের ঘটনা অধিক ঘটিয়া থাকে। রাজধানীর মোড়ে মোড়ে ছিনতাইকারীদের বিভিন্ন গ্রুপ সক্রিয়। এই ব্যাপারে সাধারণ মানুষকেও সচেতন হইতে হইবে।
ছিনতাই ও রাহাজানির মতো ঘটনা উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন মেগাসিটি ও ছোট্ট শহরগুলিতেও ঘটিয়া থাকে; কিন্তু সেইখানে ঘটনার পর প্রতিকার পাওয়া যায়। আমাদের দেশে প্রতিকার মিলে খুবই কম। প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে রাজধানীতে আসা-যাওয়া মানুষ প্রায়শ ছিনতাইকারীদের কবলে পড়িতেছেন। ইহা রাজধানী হিসাবে ঢাকার ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করিতেছে। পকেটমারের দৌরাত্ম্য আমরা বন্ধ করিতে পারিয়াছি। এখন ছিনতাইকারীদের প্রতি নজর দিতে হইবে। সড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসিটিভি ক্যামেরা অচল থাকিলে এখনই তাহা চালু করিতে হইবে। বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্টগুলিতেও সিসি ক্যামেরা সচল বা নূতন করিয়া স্থাপন করিতে হইবে। ভোররাত্রে ট্রেনযাত্রীরা অনেক সময় ছিনতাইয়ের কবলে পড়েন। এই জন্য ট্রেন ও বাসের সময়সূচিতে সামঞ্জস্য বিধান করা প্রয়োজন। ভোররাত্রে কেন ট্রেন ধরিতে হইবে? সময়সূচি পরিবর্তন করিয়া সকাল ৭-৮টা হইতে শুরু করা প্রয়োজন। ছিনতাইকারীদের ধরিতে পুলিশের আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশলের ব্যবহার বাড়াইতে হইবে। ছিনতাইকারী চক্রকে যেই সকল গডফাদার নিয়ন্ত্রণ করিয়া থাকে, তাহাদের আইনের আওতায় আনিতে হইবে। রাতের ঢাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই থাকুক, ইহাই আমরা কামনা করি একান্তভাবে।