কাওসার আহমেদ চৌধুরীর মতো গীতিকার হতে চেয়েছিলাম। কেন তার মতোই হতে চেয়েছি তার প্রথম কারণ এখন মনে হয় আমার আরেক প্রিয়শিল্পী আইয়ূব বাচ্চুর ‘রুপালি গিটার’ গানটা তার লেখা।
কুমার কুমার বিশ্বজিতের কণ্ঠে ‘যেখানে সীমান্ত তোমার সেখানে বসন্ত আমার’ গানটাও দিনরাত্রী পছন্দের শীর্ষে। বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে প্রিয় গানগুলোর কথা, সুর, গায়কী সাংঘাতিক প্রভাব বিস্তার করে।
চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাচ্ছি কাওসার আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে কাটানো তার আজিমপুর কলোনীর বাসার দিনরাতগুলো। রাজশাহী থেকে গীতিকার হতে চাওয়া একজন কিশোরের কাঁচা অবুঝ গানের কথাগুলো ডায়েরির পাতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে পরম মমতায় কেটেকুটে ঠিক করে দিচ্ছেন তিনি। কত যে গানের কথা ঠিক করে দিয়েছেন! আমার গান লেখার শিক্ষক। যিনি না থাকলে এক জীবনে গান লেখা হয়ে উঠতো কি-না সন্দেহ। আমার গান লেখার সবটুকুই তার জন্যই। সেই এলোমেলো গানগুলো নিয়ে একদিন রিকশায় করে ঠিক সন্ধ্যার আগে হাতিরপুল সাউন্ড গার্ডেন স্টুডিওতে গিয়েছিলেন। যাওয়ার আগ মুহূর্তে জানতাম না আমরা কোথায় যাচ্ছি, কার কাছে যাচ্ছি। সেখানেই প্রথম আইয়ূব বাচ্চু, জেমস ভাইকে দেখেছিলাম। সেদিন সন্ধ্যাতেই আইয়ূব বাচ্চুকে ডেকে বলেছিলেন, ‘বাচ্চু আমার ছোট ভাই ভালো গান লেখে। ওর লেখা কিছু গান তোমাকে দিয়ে যাবে একটু দেখো।’
একজন নতুন গান লিখিয়ে কিশোরকে এভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতায় চোখ ভিজেছিল অঝরে। রকস্টার আইয়ূব বাচ্চু আমার লেখা সেই গানগুলো থেকে তার একক ‘একা’ অ্যালবামের শিরোনাম গান হিসেবে রেখেছিলেন। আমার প্রকাশিত প্রথম সেই গানের নামে অ্যালবামের নাম এটা যে একজন গীতিকারের জন্য কতখানি আনন্দের ঠিক বোঝানো সম্ভব নয়। তার সবটুকুই হয়েছিল কাওসার আহমেদ চৌধুরীর কারণেই। গান লেখা নিয়ে অনেক অবুঝ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। এখন কোনো খ্যাতিমান গীতিকার একজন গীতিকার হতে চাওয়া মফস্বল থেকে আসা কিশোরের সব প্রশ্নের উত্তর এমন করে দেবে কি-না জানা নেই। কাওসার আহমেদ চৌধুরীর বলা একটা কথা আজ ভীষণভাবে মনে পড়ছে।
তিনি আমাকে সেই সময়ে বলেছিলেন, ‘গান লেখা একটা ধ্বংসাত্মক শিল্প। এর চেয়ে কবিতা লেখো, যেটা সম্পূর্ণ তোমারই থাকবে। কেউ বলবে না অমুক কণ্ঠশিল্পীর গান।’ কেন বলেছিলেন, কোন অভিমান থেকে বলেছিলেন, কোনোদিন সেই প্রশ্ন করিনি। এখন এই সময়ের দিকে তাকিয়ে মনে হয় ঠিকই বলেছিলেন। গানগুলো কণ্ঠশিল্পীর নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে। হয়তো এমন কোনো অভিমান থেকে উচ্চারণ করেছিলেন অমোঘ সত্য।
‘ঘুম কিনে খাই’ শিরোনামে কাওসার আহমেদ চৌধুরীর একটা কবিতার বই আছে। সেখানে আছে ভারতের ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতাসহ অনেক অসামান্য কবিতা। এই বইয়ের উস্কানি বিগ্রেড তালিকায় অনেকের সঙ্গে আমার নাম দেখে অবাক হয়েছিলাম। আমাকে কিছুটা পছন্দ করতেন সেটা বুঝেছিলাম। কাওসার ভাইয়ের কবিবন্ধু নির্মলেন্দু গুণের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশের রক্ত চাই’-এর প্রচ্ছদের নকশা করেছিলেন, সেই গল্প শুনেছি।
ভারতের কিংবদন্তী পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে পরিচয় ঘনিষ্ঠতা। তার পরিচালিত ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ সিনেমায় একজন মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন। চাকরি ও ভিসা জটিলতার কারণে সেটি করতে পারেননি। এমন অনেক গল্প শুনেছি খণ্ড খণ্ডভাবে।
আমার সবচেয়ে প্রিয় গীতিকারের লেখা গানের তালিকায় রয়েছে আইয়ূব বাচ্চুর কণ্ঠে ‘রুপালি গিটার’, কুমার বিশ্বজিতের ‘যেখানে সীমান্ত তোমার সেখানে বসন্ত আমার’, নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে’, সামিনা চৌধুরীর কণ্ঠে ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে’, ফিডব্যাকের ‘মৌসুমি কারে ভালোবাসো তুমি’, ‘কেন খুলেছো তোমার ও জানালা’, ‘একঝাঁক প্রজাপতি ছিলাম আমরা’, সৈয়দ আব্দুল হাদীর ‘যদি চলো, জলসাঘরে এবার যাই’, লাকী আখান্দের ‘স্বাধীনতা, তোমাকে নিয়ে গান তো লিখেছি’। তার লেখা গানের কথাগুলো বারবার পাঠ্য হয়ে ওঠে। নতুন শব্দ-উপমায় আর তাকে আর কোনোদিন পাবো না ভেবে মনটা বিষণ² হয়ে আসছে। কয়েকমাস আগে ফেসবুক ইনবক্সে লিখেছিলেন, ‘আমাকে মনে রেখেছো এটাই অনেক!’
লেখক: জনপ্রিয় গীতিকবি।