মহাকালের নিয়মে বিশ্বের পরাক্রমশীল সম্রাট থেকে শুরু করে অপূর্ব সৃজনশীল বিস্ময়কর প্রতিভাদের চিরবিদায় নিতে হয়েছে। সেই নিয়মে ‘নাইটিঙ্গেল অব ইন্ডিয়া’ লতা মঙ্গেশকরেরও রবিবারে (৬ ফেব্রয়ারি) জীবনাবসান হলো। কিন্তু লতার মতো বিস্ময়কর সুরসম্রাজ্ঞী ও অনন্য প্রতিভাময়ী সর্বজনশ্রদ্ধেয় যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকেন তাঁর সৃষ্টির ভেতরে।
দীর্ঘ আট দশক ধরে কণ্ঠের জাদুতে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রেখেছিলেন তিনি। হিন্দি, মারাঠি, বাংলাসহ ছত্রিশটিরও বেশি ভারতীয় ও বিদেশি ভাষায় তাঁর গাওয়া অগণিত ক্লাসিকাল,গজল, ভজন, আধুনিক ও সিনেমার গান আজো সমান জনপ্রিয়। ভারতে সৃজনে এমন কোনো বড় পুরস্কার নেই, যা তিনি অর্জন করেননি। ভারতরত্ন, পদ্মবিভূষণ, পদ্মভূষণ, দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, লিজিয়ন অফ অনার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ডসহ অজস্র পুরস্কার ও সম্মানে তিনি ভূষিত হয়েছেন।
এই মহান সংগীত শিল্পী ১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর এক মারাঠি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। মঞ্চাভিনেতা এবং গায়ক দীননাথের মেয়েকে প্রথমে ‘হেমা’ বলে ডাকা হতো। দীননাথের ‘ভাব বন্ধন’ নাটকের ‘লতিকা’ নামের চরিত্রে প্রাণিত হয়ে সে নাম বদলে রাখা হয় ‘লতা’। সেই ছোট্ট হেমাই সুরের জগতের নক্ষত্র হয়ে উঠছিলেন। ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত। জীবিত থাকাকালীন তাঁর নামে পুরস্কার দেওয়া হতো। কম বয়সে বাবাকে হারানোর পর পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন লতা। আশা, ঊষা, মীনা এবং হূদয়নাথ—ভাইবোনকে প্রতিপালনের জন্য কম বয়সেই উপার্জনের রাস্তা খুঁজতে হয়েছে তাঁকে। উপার্জনের তাগিদেই ছবিতে অভিনয় করেছেন। তখন বয়স মাত্র ১৩। তবে সে জগতে মন বসেনি। তাই অভিনয় করার কথা ভাবেননি। বিভিন্ন সাক্ষাত্কারে নিজের অভিনয় জীবন প্রসঙ্গে প্রায়শই বলতেন লতা। বলিউডি ছবিতে নেপথ্য-গায়িকা হিসাবে লতার প্রথম ছবি ‘মহল’। সেটা ছিল ১৯৪৯ সাল। তবে তারও আগে ১৯৪২ সালে মারাঠি ছবি ‘কিতী হসাল’-এ প্রথম গান রেকর্ড করেন লতা। প্রথম বার মঞ্চে উঠে গান শোনানোর জন্য লতার উপার্জন ছিল ২৫ টাকা। তবে অশোককুমার-মধুবালা অভিনীত ‘মহল’-ই তাঁর কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ঐ ছবির ‘আয়েগা আনেওয়ালা’ গানটি তুমুল জনপ্রিয় হওয়ার পর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি লতাকে।
কী বিস্ময়কর ব্যাপার! নেপথ্য-গায়িকা হিসাবে প্রায় সাত দশকে ৩৬টিরও বেশি ভারতীয় ভাষায় গান রেকর্ড করেছেন। তিনি ১৯৯৯ সাল থেকে ছয় বছর ভারতের রাজ্যসভার সদস্য থাকলেও সেসময় তিনি রাজ্যসভায় একটি কথাও বলেননি। রাজনীতির সঙ্গে সংগীতের দূরত্ব ঠিক ততটাই, যতটা আকাশের সঙ্গে ভূমির। সংগীত আসে একটি কোমল হূদয় থেকে। আর রাজনীতির জন্য একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিকতার প্রয়োজন হয়।
লতা মঙ্গেশকরের ছোটবোন আরেক বিখ্যাত গায়িকা আশা ভোঁসলে। এই দুই নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই উঠে আসে উভয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রসঙ্গ। লতা মঙ্গেশকর নিজেই একবার মুম্বই সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, আশা ভোঁসলের প্রথম স্বামী গণপতরাও ভোঁসলের কারণে আশার সঙ্গে তাঁর প্রথম ভুল বোঝাবুঝি। শোনা যায়, গণপতরাও মনে করতেন, লতার কারণে কাজ পান না আশা। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে দুই বোন একসঙ্গে গানের জগতে এসেছিলেন। কিন্তু পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে লতা তুলনায় অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। অন্যদিকে, আশা তখনও লড়াই করে চলেছেন। মুম্বই সংবাদমাধ্যমকে লতা জানান, গণপতরাও আশাকে তাঁদের বাড়িতে যেতে নিষেধ করতে আরম্ভ করেন। লতার সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ করে দেন। কিন্তু সত্যিই কি গানের জগতে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আশা ও লতা? দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুঞ্জনে একবার এক সাক্ষাত্কারে মুখ খুলেছিলেন আশা ভোঁসলে। তিনি বলেন ‘ও আমার দিদি এবং আমার প্রিয় শিল্পী। মানুষ গল্প বানাতে ভালোবাসে, সমস্যা তৈরি করে। কিন্তু রক্ত জলের চেয়ে ঘন।’ আশা ঐ সাক্ষাত্কারে আরো বলেন, ‘আমার মনে আছে, মাঝে মধ্যে আমরা দুজনেই যখন এক অনুষ্ঠানে গান গাইতে যেতাম, তখন ইন্ডাস্ট্রির কিছু লোক আমাকে উপেক্ষা করে ওঁর (লতা) সঙ্গেই শুধু কথা বলতেন। যেন ওঁরা দিদির প্রতিই অনুগত, তা প্রমাণ করতে চাইতেন। পরে এই বিষয়টা নিয়ে আমি আর দিদি কত হেসেছি।’
একসঙ্গে অনুষ্ঠান নয়, দুজনে দ্বৈত সংগীতও গেয়েছেন। যেমন, ‘কেয়া হুয়া ইয়ে মুঝে কেয়া হুয়া’, ‘মন কিউ বেহকা রে বেহকা আধি রাত কো’, ‘যব যব তুমহে ভুলায়া তুমি অউর ইয়াদ আয়ে’, ‘কোই আয়েগা আয়েগা’সহ আরো বেশ কিছু গানে কণ্ঠ ছিল লতা-আশা দুজনেরই।
আরেক সাক্ষাত্কারে লতা মঙ্গেশকরকেও বোন আশা ভোঁসলের সঙ্গে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুঞ্জন প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয়েছিল। লতা বলেছিলেন, ‘আমাদের মধ্যে কখনো কোনো পেশাদারি প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না। ও (আশা) গান করার ক্ষেত্রে আমার থেকে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কায়দা তৈরি করেছে। ও যা করতে পারত, আমি তা করতে পারতাম না।’
গানের জগতে না থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে কি কোনো দূরত্ব ছিল? এ প্রসঙ্গে লতা মঙ্গেশকর বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, অতীতে আমাদের দুই বোনের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে কিছু দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তেমনটা প্রায় সব ভাইবোনের সম্পর্কেই হয়ে থাকে। ও অল্পবয়সে কিছু কাজ করেছিল, যা আমি সমর্থন করিনি।’ শোনা যায়, মাত্র ১৬ বছর বয়সে ৩১ বছরের গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন আশা। যা লতা এবং তাঁর পরিবার সমর্থন করেননি।
লতা ছিলেন অবিবাহিতা। কিন্তু কেন? শোনা যায়, লতা মঙ্গেশকর এক সময়ে প্রেমে পড়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই ভালোবাসা পূর্ণতা পায়নি। প্রেমের ব্যর্থতাই কি তবে আরো বেশি করে সংগীতকে আঁকড়ে ধরতে সাহাঘ্য করেছে? কে ছিলেন সেই প্রেমিক? শোনা যায়, দুঙ্গারপুরের রাজ ঘরানার মহারাজ রাজ সিংহের প্রেমে পড়েছিলেন লতা। লতার দাদার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবেই ভারতের ক্রিকেট প্রতিষ্ঠান বিসিসিআই-এর সাবেক সভাপতি রাজ সিংহ দুঙ্গারপুরের সঙ্গে লতার পরিচয়। তাঁর টানেই ভালোবাসতে শেখা ক্রিকেটকেও। রাজ ঘরানার ছেলে রাজ সিংহ নাকি বাবা-মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, কোনো সাধারণ পরিবারের মেয়েকে তিনি রাজবংশের বউ করে আনবেন না। সেই প্রতিজ্ঞা বজায় রেখেছিলেন রাজ সিংহ। তিনিও আর বিয়ে করেননি।
লতার চেয়ে ৬ বছরের বড় রাজ সিংহ আদর করে লতাকে ‘মিট্টু’ বলে ডাকতেন। তাঁর পকেটে সব সময়ে থাকত একটি রেকর্ডার। তাতে রেকর্ড করা থাকত লতা মঙ্গেশকরের জনপ্রিয় কিছু গান।
বাংলার প্রতি লতার ছিল আত্মিক টান। কয়েক শ বাংলা গান গেয়েছেন তিনি। সেসময় বাংলা গানের প্রায় প্রতিটি এক একটি ক্লাসিক। আমাদের এক টানে নিয়ে যায় এক জাদুকরি জগতে। প্রায় আড়াই বছর আগে টুইটারে এক টুইটে লতা মঙ্গেশকর নিজেই জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই বাংলাদেশে এসে গেয়েছিলেন তিনি। টুইটটি করেছিলেন ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। ১৯৭১ সালে অজন্তা শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশ সফরের সদস্য হয়েছিলেন তিনি। এই দলের প্রধান ছিলেন অভিনেতা সুনীল দত্ত।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিনি তার মতো করে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ভারতের বিভিন্ন স্হানে গান পরিবেশন করে বাঙালি রিফিউজিদের জন্য তহবিলও সংগ্রহ করেছিলেন এই কিংবদন্িত শিল্পী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তার জন্য ভারতীয় অনেক শিল্পীই এগিয়ে আসেন। গান গেয়ে তহবিল সংগ্রহের পাশাপাশি গড়ে তুলেছিলেন বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাপী সচেতনতা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্হাপনেও অর্থ সাহাঘ্য করেছিলেন তারা। সে সময় লতা মঙ্গেশকর ছাড়াও আশা ভোঁসলে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মোহাম্মদ রফি, মান্না দে, সলিল চৌধুরী প্রমুখ শিল্পী বাংলাদেশের জন্য সংগীত পরিবেশন করেছিলেন। বাংলাদেশের স্হপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান যখন ভারতে গিয়েছিলেন, তার সঙ্গে দেখা করতে ছুটে যান লতা মঙ্গেশকর।
এমন বিস্ময়কর সংগীতশিল্পী হাজার বছরে একজনই আসেন। বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই লতাজিকে।
লেখক : সাংবাদিক, শিক্ষক

