প্রাঙ্গণ জুড়ে শিশুদের কলতান

শুক্রবার সকালে শিশুদের হুটোপুটি আর দুপুর না গড়াতেই মেলা উপচে উঠেছিল মানুষের আনাগোনায়। করোনার কারণে বন্ধ থাকার পর গতকাল প্রথম বারের মতো শিশুপ্রহর ঘোষণা করে বাংলা একাডেমি। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিশু-কিশোরদের জন্যই নির্ধারিত ছিল মেলার সময়। আজ শনিবারও শিশুপ্রহর। মেলার দুয়ার খুলবে বেলা ১১টায়।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের চত্বর জুড়ে শিশুদের ছোটাছুটি, মা-বাবার হাত ধরে স্টলে স্টলে বই দেখে, বই কিনে, নতুন বই বুকে জড়িয়ে বাড়ি ফিরেছে তারা। গতকাল মেলায় প্রথম এসেছিল সিসিমপুর বাঘিনি। বই কেনার পাশাপাশি শিশুদের মন কেড়েছে সিসিমপুরের হালুম-ইকরি-টুকটুকি-শিকু। সেখান তাদের জন্য বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তারা। তাদের সঙ্গে মেতে উঠেছিল খুদে বিচ্ছুর দল। শিশুদের জন্য তৈরি মঞ্চে নানা ধরনের শিক্ষণীয় খেলায় অংশ নিয়ে অন্যরকম এক দিন পার করেছে শিশুরা। সন্তানের সঙ্গে অভিভাবকরাও শিশু হয়ে গিয়েছিলেন, বাচ্চাদের সঙ্গে মেতে উঠেছিলেন খেলায়।

ছবি: সংগৃহীত

স্কুলপড়~য়া ছেলে মো. মুহতাসিম বিল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে মিরপুর থেকে এসেছিলেন সরকারি কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান সবুজ। সঙ্গে ব্যাংকার স্ত্রী ফারহানা রহমান। মেলায় ঘুরে ঘুরে বই কিনলেন। তারা জানালেন, ছেলের বই কেনার টানেই আসা। নিজেদের পরে কিনবেন, আজ শুধু ছেলের বই।

ধানমন্ডি থেকে মা শারমিন রহমানের সঙ্গে এসেছিল আশফি। কী বই কিনলে—এ প্রশ্নের জবাবে ফোকলা দাঁতের হাসি হেসে বলল, ‘আমি টম অ্যান্ড জেরি, মীনা, ভূতের গল্প, পরীর গল্প, রাক্ষস-খোকসের গল্প...।’ এভাবে একের পর এক বইয়ের নাম বলতেই থাকল। পাশে থাকা তার মা ইয়াসমিন নাহারের হাসিমুখ বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে, নিজের বাচ্চাকে এ বইয়ের মেলায় নিতে আসতে পেরে বেশ আনন্দিত।

কানাডা থেকে কদিন আগেই দেশে ফিরেছেন রুবায়েত রহমান। শুক্রবারই তিনি এলেন মেলায়। চার বছরের মেয়ে মেহেরিন রুবায়েতও এসেছে সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রবাসে আমার মেয়েটা বাংলা বলতে পারলেও বাংলা বর্ণমালা একেবারেই শিখতে চায় না। ওকে বইমেলায় নিয়ে এসেছি, ও দেখুক বাংলা বর্ণমালার জন্য কত শিশু এসেছে। নানা রঙের ফুল-পাখি আঁকা ছবি দেখে সে বায়না করছে নতুন বইয়ের। ওর জন্য প্রবাদ-প্রবচনের বই কিনছি। এসব দেখে মেয়েটা যদি বাংলা শেখে।’

প্রকাশকরা জানালেন, অন্য সময়ের তুলনায় এবার মেলাতে বইয়ের প্রতি শিশুদের আগ্রহ বেড়েছে। তারা মোবাইল গেমস খেলার পাশাপাশি বইমুখীও হচ্ছে। এ বিষয়ে শিশুচত্বরের মেলা প্রকাশের প্রকাশক এম এস দোহা বলেন, ‘গতবার তো আমরা করোনার জন্য আশানুরূপ বিক্রি করতে পারিনি। সে তুলনায় এবার মেলা ভালো হচ্ছে এবং লোক সমাগম অনেক বেশি।’ তিনি জানান, দীর্ঘদিন করোনার জন্য একটা বড় সময় শিশু-কিশোররা বই থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। এই জায়গাটা মোবাইল-ইন্টারনেট দখল করে নিয়েছে। তবে এখন সেগুলো থেকে বেরিয়ে তারা বইমুখী হচ্ছে। এটা ভালো দিক।

ছবি: আব্দুল গণি

চিলড্রেন বুকস সেন্টারের স্বত্বাধিকারী জগলুল সরকার বলেন, ‘মেলার প্রথম প্রহরে শিশুরা না এলে আমাদেরও ভালো লাগে না। বই বিক্রি বড় বিষয় নয়, কিন্তু আমরা শিশুদের বই প্রকাশ করি, তাদের জন্য কাজ করি, এমন অবস্হায় শিশুরা এলে আমাদের ভালো লাগে। শিশুরা আসছে বাবা-মায়ের হাত ধরে, তারা বই দেখছে, কিনছে। এটা ভালো দিক, আমাদেরও ভালো লাগছে।’

এদিকে, শুক্রবার মেলার শুরু থেকেই বইপ্রেমীরা আসতে থাকেন দল বেঁধে। সন্তানদের বই কিনে দেওয়ার পাশাপাশি অভিভাবকরাও নিজেদের পছন্দের বইটি সংগ্রহ করেছেন স্টলে ঘুরে ঘুরে। আগের রাতের ঝড়-বৃষ্টি খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি বইমেলায়। সকালে সোহরাওয়ার্দীর মাঠে কয়েকটি স্টলের বই রোদে শুকাতে দেখা গেলেও ঝড়বৃষ্টিতে খুব বেশি ক্ষতি হয়নি বলেই জানিয়েছেন তারা। প্রকাশকরা আশা রাখছেন ছুটির দিনে মেলা হবে আরো জমজমাট, বাড়বে বিক্রিও।

মেলামঞ্চে অনুষ্ঠান

গ্রম্হমেলার মূলমঞ্চে গতকাল অনুষ্ঠিত হয় বিদ্রোহী কবিতার শতবর্ষ এবং বিদ্রোহী কবিতা ও ৭ই মার্চের ভাষণ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্হাপন করার কথা ছিল অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর (তার অনুপস্হিতিতে তার লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) সাহেদ মন্তাজ) এবং অধ্যাপক রাশিদ আসকারী। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অনিরুদ্ধ কাহালী, শিহাব শাহরিয়ার ও তপন বাগচী। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

এদিকে, লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি হারিসুল হক ও রাশিদ আসকারী। অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি শাহজাদী আঞ্জুমান আরা, হাসানাত লোকমান ও আসাদুল্লাহ। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী মাসুম আজিজুল বাশার, সুকান্ত গুপ্ত ও সায়েরা হাবীব। সাংস্কৃতিক পর্বে ছিল মো. জাহিদুর রহমানের পরিচালনায় নাটক ‘অভিশপ্ত আগস্ট’।

ভাষাশহিদ মুক্তমঞ্চের অনুষ্ঠান :বিকালে মঞ্চে শুরু হয় কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ। স্বরচিত কবিতাপাঠে অংশ নেন ২৫ জন কবি। এই মঞ্চে তিনটি নতুন গ্রম্হ উন্মোচিত হয়। বিকালে প্রদর্শিত হয় হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’।

নতুন বই: গতকাল শুক্রবার মেলায় নতুন বই এসেছে ২৪৯টি। এর মধ্যে আগামী প্রকাশনী থেকে মোনায়েম সরকারের বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই ‘মোনায়েম সরকারের রচনাবলি (প্রথম খণ্ড)’, অক্ষর প্রকাশনী থেকে হাসানের হাফিজের সম্পাদক গল্প ‘সেরা কিশোর সঞ্চয়ন’, য়ারোয়া বুক কর্নার থেকে বিমল গুহের গল্প ‘একাত্তরের দুঃসহ দিন’, অসীম সাহার কাব্যগ্রম্হ ‘১০০ মুজিব’, শ্যামসুন্দর শিকদারের কাব্যগ্রম্হ ‘সুখে থেকো ভালো থেকো’, বিদ্যাপ্রকাশ থেকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রবন্ধ ‘শিক্ষা নিয়ে চিন্তা ও দুশ্চিন্তা’, ধ্র‚ব এষের ডন মুস্তফা এবং অন্যান্য গল্প’, উত্স প্রকাশন থেকে মোস্তফা সেলিমের লোকসাহিত্য ‘গোলাম হুসনের গান’, আবিষ্কার থেকে সমরেশ মজুমদারের উপন্যাস ‘একাকিনী’, পুথিনিলয় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’, সেলিনা হোসেনের উপন্যাস ‘যাপিত জীবন’, চন্দ্রছাপ থেকে আনোয়ারা সৈয়দ হকের গল্পসমগ্র ‘একজন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে’ উল্লেখযোগ্য।