কত ধরনের খুনের ঘটনা এখন চারিদিকে ঘটিতেছে, তাহার ইয়ত্তা নাই। গত কয়েক মাসে পত্রপত্রিকার পাতায় উঠিয়া আসিয়াছে বিচিত্র সকল খুনের ঘটনা। গত বুধবার লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে আমেনা বেগম নামে এক ষাটোর্ধ্ব নারীকে কুপিয়ে হত্যার পর লাশ আগুন দিয়া পুড়াইয়া ফেলিবার অভিযোগ উঠিয়াছে তাহার ছেলের বিরুদ্ধে। এই দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের দাঁড়িপাতা গ্রামের সাত বৎসরের শিশু হামিমকে হত্যা করা হইয়াছে অত্যন্ত তুচ্ছ একটি ঘটনায়। হত্যাকারী মুকলেস জানাইয়াছে যে, শিশুটি তাহার দোকানে টিভি দেখিবার সময় ঘন ঘন চ্যানেল পালটাইতে থাকিলে সে রিমোট চাহিলে তাহা শিশুটি ভাঙিয়া ফেলে। আর তাহাতে ক্ষিপ্ত হইয়া শিশুটিকে শ্বাসরোধ করিয়া হত্যা করে মুকলেস।
পত্রিকার পাতায় খুঁজিলে প্রতিদিনই নৃশংস ঘটনার কিছু না কিছু সংবাদ প্রকাশ হইতে দেখা যায়। যেই দিন একটিও খুন বা হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটিবে না, সেই দিন পত্রিকার পাতায় আট কলাম ইঞ্চি জুড়িয়া প্রধান শিরোনাম করা যাইতে পারে—‘আজ একটিও নৃশংস ঘটনা ঘটে নাই!’ কিন্তু না, এমন শিরোনাম আমরা আগামী ৫০ বৎসরেও দেখিতে পাইব কি না সন্দেহ। কয়েক দিন পূর্বে একটি সংস্হা ‘বাংলাদেশ শিশু পরিস্থিতি ২০২১’ শিরোনামে জাতীয় দৈনিকগুলিতে প্রকাশিত শিশুবিষয়ক সংবাদের আধেয়-বিশ্লেষণ করিয়া জানাইয়াছে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ও শিশুদের জনসমাগমে অনুপস্থিতি সত্ত্বেও ২০২১ সালের জানুয়ারি হইতে ডিসেম্বর অবধি সারা দেশে ৮১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হইয়াছে। আগের বৎসর ২০২০ সালে শিশু ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৬২৬। এই হিসাবে গত এক বৎসরে শিশু ধর্ষণের হার বাড়িয়াছে ২৩.৪৭ শতাংশ। ঐ রিপোর্টে আরো বলা হইয়াছে যে, গত বৎসর ধর্ষণের শিকার হইয়া নিহত হইয়াছে ১৪ জন মেয়েশিশু।
আমরা গত কয়েক দশক ধরিয়াই দেখিতেছি যে, খুন, হত্যা, নৃশংসতার ঘটনা কোনো কোনো সময় অনেক বেশি বাড়িয়া যায়। প্রশ্ন হইল—মানুষ কখন বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া পড়ে? কখন একজন মানুষ আরেক জনকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করিতে কুণ্ঠিত হয় না? কখন সমাজে এই ধরনের অপরাধ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতে থাকে? মনে রাখিতে হইবে, বাস্তবে এই ধরনের পশুবৎ ঘটনা যত ঘটে, সংবাদপত্রে তাহার বড় একটি অংশই অপ্রকাশিত থাকিয়া যায়। অর্থাৎ প্রকৃত চিত্র, সংবাদপত্রে যাহা উঠিয়া আসে, তাহা হইতে অধিক কুত্সিত। এই সকল ঘটনাকে ‘পশুবৎ’ বলাটাও সম্ভবত যথার্থ হইবে না। কেননা, অনুভূতিপ্রবণ পশুরাও নিশ্চয়ই এতটা হীন মানসিকতার হইতে পারে না। আরো প্রশ্ন তোলা যাইতে পারে—সমাজের তলে তলে বহিয়া চলা নৃশংসতার এই চোরাস্রোত বন্ধ হইবে কী করিয়া? যাহারা এমন নিষ্ঠুর মানসিকতার অন্ধকূপে আটকাইয়া গিয়াছে, তাহারা কী করিয়া এমন অস্বাভাবিক হইল? ‘সামাজিক মূল্যবোধ’ তৈরি করা এই ক্ষেত্রে অতি জরুরি একটি বিষয় বটে। একটি সুন্দর, বসবাস উপযুক্ত এবং কল্যাণকর দেশ গঠনের লক্ষ্যে আমরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়াছি। কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা। অর্থনৈতিকভাবে গত ৫০ বৎসরে আমাদের তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হইলেও সামাজিক অস্থিরতা প্রশমিত হয় নাই। ইহার জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার। জগতে কোনো কিছুই একা-একা নিপুণভাবে পরিচালিত করা যায় না। ইহার জন্য প্রয়োজন বিশ্বস্ত করিত্কর্মা ব্যক্তিবর্গ। কিন্তু করিৎকর্মা ব্যক্তিবর্গের জায়গায় যদি কিছু আগাছা চলিয়া আসে, তবে তাহা তলে তলে ভয়ংকর ক্ষতিসাধন করিতে থাকে।
সুতরাং ভাবিয়া দেখিতে হইবে কেন বৃদ্ধি পাইতেছে এই ধরনের অপরাধ? কোন কোন অসংগতির বহিঃপ্রকাশ হিসাবে সমাজে এই অস্থিরতা বৃদ্ধি পাইতেছে? সামাজিক অস্থিরতারোধে কেবল আইন কঠোর করিলেই হয় না—রাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত অস্থিরতাও দূর করিতে হয়। সেই অস্থিরতা দূর করিতে না পারিলে উহা নূতন নূতন বিপদ ডাকিয়া আনিতে পারে। সুতরাং গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিতে হইবে—যাহা ঘটিতেছে তাহা আসলে কীসের আলামত?