ইউক্রেনের ওপর হামলার জের ধরে রাশিয়ার ওপর বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে পশ্চিমা দেশগুলো। এর পালটা ব্যবস্থা নেওয়ারও হুমকি দিচ্ছে রাশিয়া। ইউক্রেন-রাশিয়া সংকটের এই প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির ওপর পড়বে—এমন পূর্বাভাস দিচ্ছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা দীর্ঘমেয়াদি সংকটের আশঙ্কা করেছেন। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্যের বড় গন্তব্য হচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো। তাছাড়া রাশিয়া থেকে গমসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। তৈরি পোশাকশিল্পের নতুন গন্তব্যও হচ্ছে রাশিয়া।
রপ্তানি উন্নয়ন বু্যরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় রপ্তানি হয়েছে ৬৬ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য, টাকার অঙ্কে প্রায় ৫ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। এই রপ্তানির মধ্যে তৈরি পোশাক সবচেয়ে বেশি। এ সময়ে আমদানি হয়েছে ৪৬ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের পণ্য (প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা), যার বেশির ভাগটাই খাদ্যপণ্য। তাছাড়া তৈরি পোশাক রপ্তানির নতুন বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে রাশিয়াকে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া সংকটের প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে তাদের ব্যবসার ওপর। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে পণ্যবাহী জাহাজগুলো এখন কৃষ্ণসাগর এড়িয়ে চলতে চাইছে। ফলে রপ্তানিকারকরাও চিন্তার মধ্যে পড়েছেন। তাছাড়া চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। এর প্রভাবেও পণ্য পরিবহন খরচ আরো বেড়ে যাবার আশঙ্কা করছেন তারা। ফলে শিল্পের কাঁচামালসহ সব পণ্যের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ বিশ্বের যত জ্বালানি রপ্তানি হচ্ছে তার ১০ শতাংশ আসছে রাশিয়া থেকে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ইউক্রেন সংকট যদি দ্রুত সমাধান হয় সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব বড় হবে না। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হলে ভবিষ্যত্ নিয়ে এখনই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী কিছু প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। গমের দাম, নিকেলের দামসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। প্রত্যাশা করা হয়েছিল, এবছরের মাঝামাঝি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৬৫ থেকে ৭০ ডলারে নেমে আসবে। কিন্তু এই সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম আরো বেড়ে গেলে টাকার মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার ছেড়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করছে। কিন্তু এর ফলে রিজার্ভে চাপ বাড়বে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও মুদ্রামান ঠিক রাখতে হবে। অভ্যন্তরীণ বাজার যাতে অস্থিতিশীল না হয় সেদিকে মনোযোগী হতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এর নির্বাহী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম ইত্তেফাককে বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে, যা অর্থনীতির জন্য বড় আঘাত। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন।