সন্ত্রাসমুক্ত পৃথিবী চাই

শক্তিধরেরা পৃথিবীটাকে দিনদিন বসবাসের অযোগ্য করিয়া তুলিতেছে। তাহারা ধরাকে সরা জ্ঞান করিতেছে। তাহাদের দ্বন্দ্ব-সংঘাত যদি নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকিত, তাহা হইলে আমাদের বলিবার কিছু ছিল না। কিন্তু তাহাদের কারণে সৃষ্ট যুদ্ধ-বিগ্রহের চাপ শেষ পর্যন্ত পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। কথায় বলে, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। যুদ্ধের কারণে আক্রান্ত দেশের ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ রুদ্ধশ্বাসে ছুটিয়া চলেন। প্রতিবেশী দেশগুলিতে আশ্রয় নেন শরণার্থী হিসাবে। সচ্ছল ও স্বাবলম্বী হইবার পরও কেবল যুদ্ধের কারণে অনেকে পথের ভিখারিতে পরিণত হন। ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পদ হারাইয়া রিক্ত-নিঃস্ব হইয়া পড়েন। অনেকে গোলাগুলির মুখে পড়িয়া বেঘোরে মারা যান। হাসপাতালে আহত হইয়া আর্তনাদ করেন। পরিবার-পরিজন নিয়া ঘোর অমানিশায় পড়েন। ইহা যুদ্ধাক্রান্ত দেশের অসহায় নাগরিকদের চিত্র। কিন্তু যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে দেখা দেয় নেতিবাচক প্রভাব। ইহাতে গরিব ও উন্নয়নশীল দেশগুলির নাগরিকদের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। মূল্যস্ফীতি বাড়িয়া তাহাদের জীবনে নাভিশ্বাস ওঠে। তাই প্রশ্ন জাগে, শক্তিধরদের এই বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন কি বন্ধ হইবে না? পৃথিবীতে ফিরিয়া আসিবে না শান্তি ও শৃঙ্খলা?

আমরা অনেক সময় গ্রামগঞ্জে দেখি, হাতেগোনা কয়েক জন অসাধু ও দুষ্ট লোকের কারণে হাজার হাজার লোক ভোগান্িততে পড়েন। তাহাদের মাস্তানিতে শান্তিকামী মানুষের ঘুম হারাম হইয়া যায়। তাহারা কথায় কথায় মানুষকে হুমকিধমকি দেয়। নিরাপরাধ লোকের বাড়িঘর, জায়গাজমি জোরপূর্বক দখল করিয়া নেয়। সাধারণ মানুষের ওপর চালায় জুলুম-অত্যাচার। খুনখারাবির কারণে সন্ত্রস্ত হইয়া ওঠে এসব জনপদ। গ্রামগঞ্জে যাহারা এভাবে ত্রাস সৃষ্টি করে, আমরা সাংবাদিকরা তাহাদের বিরুদ্ধে লিখি। কিন্তু তাহাদের বিরুদ্ধে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। যাহারা তাহাদের কারণে সন্ত্রস্ত, তাহারাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুখ বুজিয়া সহ্য করিয়া যান সবকিছু। বলা হয়, দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়া গেলে মানুষ ঘুরিয়া দাঁড়ায়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষকে ঘুরিয়া দাঁড়াইতে দেখা যায় না। সারা বিশ্বের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক নৃশংস যু্দ্ধ-বিগ্রহ দেখিলাম আমরা। কিন্তু শান্তিকামী বিশ্ববাসী তেমন কোনো প্রতিরোধ আন্দোলন গড়িয়া তোলে নাই। যুদ্ধবাজ দেশের মানুষ জাগে নাই। পৃথিবীতে যদি এই ধরনের অশান্তি লাগিয়া থাকে, তাহলে তাহাতে কে লাভবান হইবেন তাহা আমাদের বিবেচ্য বিষয় নহে। কিন্তু ইহার কারণে যখন অন্য দেশের মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হইবেন, তখন বিষয়টি আমাদের না ভাবাইয়া পারে না। বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম আবার বাড়িতে শুরু করিয়াছে। বাড়িয়া গিয়াছে ডলারের দাম। করোনার কারণে এমনতিই আমরা বহুবিধ সমস্যায় ছিলাম। তাহার ওপর এই যুদ্ধ মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসাবে দেখা দিয়াছে। বিশ্বমানচিত্রে যেসব দেশ শনাক্ত করা কঠিন, সেইসব ক্ষুদ্র দেশুগুলিও ইহার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে।

আমরা মাস্তান ও সন্ত্রাসমুক্ত পৃথিবী চাই। যদিও প্রাচীনকাল হইতেই চলিয়া আসিতেছে যুদ্ধ-বিগ্রহ। ইহাতে মাস্তানি মাস্তানির জায়গায় রহিয়াছে, সন্ত্রাস রহিয়াছে সন্ত্রাসের জায়গায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লিগ অব ন্যাশনস যেমন, তেমনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হইয়াছে জাতিসংঘ। এই ক্ষেত্রে জাতিসংঘকে আমরা আখ্যায়িত করি ঠুঁটো জগন্নাথ হিসাবে। গ্রামে-গঞ্জে যেভাবে মাস্তানরা অপরাধ করিয়াও সকলের চোখের সম্মুখে ঘোরাফেরা করে, তেমনি বিশ্বে শক্তিধররা সকলের নাকের ডগায় মানবতা লঙ্ঘন করিয়াও পার পাইয়া যাইতেছে। এই শক্তিধরদের উল্লম্ফনের শেষ কোথায়, ইহাই বড় প্রশ্ন।