তাহাদের শক্ত হাতে প্রতিরোধ করিতে হইবে

স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী দেশের একটি অঙ্গরাজ্যের পথেই হাঁটিল। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া নির্বাচনি সংঘাত ও হানাহানিতে গত পাঁচ মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ছয় ধাপের এই নির্বাচনে সহিংসতায় সমগ্র দেশে নিহত হইয়াছেন ৯৫ জন। এখনো বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে নির্বাচনোত্তর সহিংসতা চলমান। গতকাল ইত্তেফাকের খবরে বলা হইয়াছে, খোদ গোপালগঞ্জে নির্বাচিত ও পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ১৫ জন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ২৫ জন আহত হইয়াছেন। এই জেলার সদর উপজেলার শুকতাইল ইউনিয়নের পার চন্দ্রদিঘলিয়া গ্রামে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই সময় বেশ কয়েকটি বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়।

স্থানীয় সরকারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া এই যে হানাহানির খবর পাওয়া যাইতেছে, তাহার শেষ পরিণতি কোথায়? রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তত্পরতা বলিতে যাহা বুঝায়, আসলে তাহার বিপরীত চিত্র পরিলক্ষিত হইতেছে। আজ মানুষের বদ্ধমূল ধারণা হইল—রাজনীতি মানেই মারামারি করা। এই ধারণা পোষণ করা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক। দুই দিনের এই দুনিয়ায় মাস্তানি করিয়া কী লাভ? সকল ইউনিয়ন পরিষদেই যে নির্বাচনোত্তর অস্থিরতা তৈরি হইয়াছে তাহা আমরা বলি না। দলীয় প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার পর গতবারের ইউপি নির্বাচনও ছিল সহিংসতাপূর্ণ, যদিও উন্নত দেশগুলিতে দলীয় প্রতীকেই স্থানীয় সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। আসলে আমাদের মন-মানসিকতা ও নির্বাচনি সংস্কৃতিই ইহার জন্য দায়ী। এবারের পরিস্থিতিতে নূতন মাত্রা যোগ হইয়াছে। দেখা যাইতেছে, সরকারদলীয় কোন্দলে মারামারি হইতেছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত দোষ চাপানো হইতেছে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের উপর। এবারের ইউপি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বহু হুংকার ছুড়িয়াও বিদ্রোহী প্রার্থিতা ঠেকাইতে পারে নাই। গতবারের চাইতে এইবার বরং বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা অধিকই ছিল। ইহাতে নৌকা অনেক এলাকায় হারিয়া গিয়াছে; কিন্তু এই ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের জের এখনো চলিতেছে। গোপালগঞ্জের ঘটনা তাহারই প্রমাণবহ। এই ধরনের পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন অসহায় ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়ে। ইহার কারণেও কোথাও কোথাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়।

আমাদের দেশে যাহারা যখন ক্ষমতায় থাকেন, তখন প্রশাসনকে তাহাদের স্বার্থে ব্যবহার করিতে দেখা যায়। এই প্রবণতা কখন বন্ধ হইবে তাহা আমরা কেহ জানি না। তাহার পরও আমরা বলিতে চাই, যদি এই ধরনের অপরাধীকে শক্ত হাতে প্রতিরোধ করা না যায়, তাহা হইলে ভবিষ্যতে কেহ রাজনীতি করিতে পারিবেন বলিয়া মনে হয় না। যাহারা এখন ক্ষমতায় আছেন বা অতীতে ক্ষমতায় ছিলেন এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসিতে চাহেন, তাহাদের জন্য রাজনীতি করাটাই ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া দাঁড়াইবে। রাজনীতি মানে অন্যকে ঠেকানো ও মারামারি নহে। রাজধানী ঢাকাকেও এই রাজনৈতিক দূষণ হইতে মুক্ত করিতে হইবে। গোপালগঞ্জের মতো সর্বত্র যদি শৃঙ্খলার অভাব ও আইন প্রয়োগে শিথিলতা দেখা যায়, তাহা হইলে দেশ শেষ পর্যন্ত বসবাসের অযোগ্য হইয়া পড়িবে। এই জন্য সমগ্র দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং আইন ও নিয়মের প্রয়োগে আপস করা যাইবে না। আর উপমহাদেশ জুড়িয়া সহিংসতার যে নির্বাচনি সংস্কৃতি বিরাজমান, তাহা হইতে আমাদের অবশ্যই বাহির হইয়া আসিতে হইবে। কেন্দ্রের সহিত স্থানীয় রাজনীতির দ্বন্দ্ব বাড়িতে দেওয়া যাইবে না। গণতান্ত্রিক নীতি অনুযায়ী জনগণই ক্ষমতার উত্স। সেই উত্সমুখের বিমুখতা লইয়া আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকিতে হইবে।