৭ই মার্চ আমাদের যেই শিক্ষা দেয়

সাত সংখ্যাটির আলাদা মাহাত্ম্য রহিয়াছে। সুরের স্বরগ্রাম সাত সুরে বাঁধা, সপ্তাহ সাত দিনে, সাত নক্ষত্র মিলিয়া সপ্তর্ষি, রংধনুর সাতটি রং, সাত সাগর আর আমাদের গর্বের সাত বীরশ্রেষ্ঠ। তাহার পূর্বে রহিয়াছে ৭ই মার্চের ভাষণ। প্রায় ১৮ মিনিটের ১ হাজার ১০৫ শব্দের একটি ভাষণ কীভাবে গোটা জাতিকে জাগাইয়া তুলিতে পারে, সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে কী এক অপার জাদুবলে একত্রিত করিতে পারে—তাহার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। অনেক বিদগ্ধজন বলিয়া থাকেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ‘ছয় দফার’ মাধ্যমে বাঙালিকে স্বাধিকারের সাঁকো দিয়াছিলেন, আর ৭ই মার্চের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সেই সাঁকোকে স্বাধীনতার স্বপ্নসেতুতে রূপান্তরিত করিয়াছিলেন। একাত্তরের ৭ই মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করিয়াছিলেন—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ অতঃপর ২৫শে মার্চের কালরাত এবং ২৬শে মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণা। দীর্ঘ প্রায় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর উদিত হয় বিজয়ের লাল সূর্য। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা অর্জন করিয়াছি অমূল্য এই স্বাধীনতা। আর ইহার স্পষ্ট দিকরেখা তৈরি হইয়াছিল সাত মার্চের ভাষণে। অত্যন্ত কৌশলী বিস্ময়কর পরিমিতিবোধ ছিল বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণের প্রতিটি শব্দে-বাক্যে, কণ্ঠের উঠানামায়। ভাষণটি এতটাই কৌশলী ছিল যে, উহার কোনো একটি অংশে ব্যত্যয় ঘটিলে পুরা পরিস্হিতি অন্যরকম হইয়া যাইত।

৭ই মার্চের ভাষণের মহিমা বুঝাইতে অনেকে বলিয়া থাকেন—বঙ্গবন্ধু যেন এক বিস্ময়কর কবিতা পাঠ করিয়াছেন! তিনি রাজনীতির কবি। আব্রাহাম লিংকন, চার্চিল, মহাত্মা গান্ধী বা মার্টিন লুথার কিংয়ের মতো মহান নেতাদের ঐতিহাসিক ভাষণের মতোই গুরুত্ব বহন করে এই ভাষণ। যেই কারণে ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ইউনেসকোর মেমোরি অব ওয়ার্ল্ড রেজিস্ট্রারে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিত্রের ঐতিহ্যের তালিকায় স্হান দিয়াছে। এই ভাষণ লইয়া কবি নির্মলেন্দু গুণ তাহার ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতায় বলিয়াছেন—‘একদিন সব জানতে পারবে; আমি তোমাদের কথা ভেবে লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প।’ ৭ই মার্চের সেই শ্রেষ্ঠ বিকালে এক মহান নেতা হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের সকল বাঙালিকে একত্রিত করিতে পারিয়াছিলেন। আজ এই ঐতিহাসিক ঘটনার ৫২ বত্সর পর আমরা অনুধাবন করিতে পারি ৭ই মার্চের ভাষণের সবচাইতে তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনাটি ছিল—সকল বাঙালিকে এক কাতারে লইয়া আসা। সুতরাং ঐ ভাষণটি গদ্য হউক, পদ্য হউক—তিনি রাজনীতির কবি হউন কিংবা হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা হউন না কেন—ঐ একটি ভাষণের পর হইতে সকল বাঙালির নিকট তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম নেতা হইয়া উঠিলেন, সকলেই তাহার জাদুকরি নেতৃত্বের শামিয়ানার নিচে অবিসংবাদিতভাবে আসিয়া দাঁড়াইল। এই যে সকলকে তিনি একত্রিত করিলেন ইহার শক্তি এতটাই ছিল যে পাকিস্তান রাষ্ট্রই দুই টুকরা হইয়া গেল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যেই লক্ষ লক্ষ মানুষ আত্মত্যাগ করিয়াছেন, আমরা যদি একটি কল্যাণকর ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন করিতে পারি, তবে উহাই হইবে লক্ষ লক্ষ শহিদের প্রতি সত্যিকারের সম্মান জ্ঞাপন। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল এবং পরবর্তী কয়েক দশকে উন্নত রাষ্ট্র হইবার মহিসোপানে যাত্রা করিতেছে; কিন্তু ৭ই মার্চ আমাদের বুঝাইয়া দেয়—যতই আমরা দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধন করি না কেন—আমরা যদি দেশের প্রায় সকল নাগরিককে একত্রিত করিতে না পারি, আমাদের মধ্যে যদি বিভাজন-বিভক্তি বাড়িতেই থাকে, তাহা হইলে আমরা কখনোই সত্যিকারের উন্নত ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠন করিতে পারিব না। ৭ই মার্চ এখন আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, সকল কিছুর ঊর্ধ্বে উঠিয়া কীভাবে সকলকে একত্রিত করা যায়। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর মতো আমাদের আবার সেই নেতা দরকার, যিনি সকল বিভক্তি ভুলাইয়া দেশের সকলকে একত্রিত করিতে পারিবেন।