মাঝেমধ্যে পত্রপত্রিকায় এমন সকল খবর প্রকাশিত হয়, যাহাতে আমরা বিস্মিত না হইয়া পারি না। এমনই একটি খবর হইল—‘পদ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার, চাকরি ঢাকার নামি স্কুলে’। ইহা কীভাবে সম্ভব? ইহা সহযোগী একটি জাতীয় দৈনিকের খবরের শিরোনাম। আরেকটি পত্রিকায় লেখা হইয়াছে ইহার চাইতেও বিস্ময় জাগানিয়া শিরোনাম—‘বেতনে আছেন, কর্মস্থলে নেই’। একজন শিক্ষা কর্মকর্তা কীভাবে আড়াই বৎসর ধরিয়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন, তাহা আমাদের মাথায় আসে না। তিনি কালেভদ্রে আসিয়া খাতায় স্বাক্ষর দিয়া বেতনভাতা উঠাইয়া লইয়া যাইতেছেন। ইহা কি কম বড় দুর্নীতি ও অনিয়ম? কাজ না করিয়া একজন শিক্ষা কর্মকর্তা কীভাবে সরকারি বেতনভাতাদি নেন? ইহা ভাবিতেও আমাদের লজ্জা হয়। অবশ্য যেই দেশে কাজ না করিয়াই ঠিকাদার বিল উঠাইয়া লইয়া যান, সেই দেশে ইহা যেন কোনো ব্যাপারই নহে। সকল সম্ভাবনার বাংলাদেশে যাহারা এইরূপ অপকর্মকে সম্ভব করিয়া তুলিয়াছেন, তাহাদের এখনই প্রতিরোধ ও প্রতিহত না করা হইলে বাংলাদেশের সকল সম্ভাবনাই বিনষ্ট হইয়া যাইবে।
একটি জেলা-উপজেলায় শিক্ষা কর্মকর্তার পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাহার উপরে নির্ভর করিতেছে সেই সকল এলাকার শিক্ষার মানোন্নয়নের বিষয়টি। আর কোনো জাতি শিক্ষায় উন্নতি করা ব্যতিরেকে উন্নত হইতে পারে না। স্বাধীনতা অর্জনের অন্যতম লক্ষ্য হইল অর্থনৈতিক মুক্তি। কিন্তু শিক্ষার মাধ্যমে জনসম্পদের উন্নয়ন না হইলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সুদূরপরাহত। এখন শিক্ষা কর্মকর্তারাও যদি নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সহিত জড়িত হইয়া পড়েন, তাহা হইলে এই জাতি যাইবে কোথায়? তাহাদের নিকট হইতে যেখানে অন্যরা শিক্ষা গ্রহণ করিবেন, সেখানে তাহারাই নানা অনিয়মের সহিত জড়িত। অবশ্য কথায় বলে, সকল অঙ্গে ব্যথা ঔষধ দিব কোথা? আমাদের শিক্ষা কর্মকর্তা হইতে শুরু করিয়া স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়—সর্বত্র শিক্ষকদের মধ্যেও নানা অনিয়ম ও অনৈতিকতার অনুপ্রবেশ ঘটিয়াছে। ইহার ফল মারাত্মক। জাতি হিসাবে ইহা আমাদের ধ্বংসের কিনারে লইয়া যাইতেছে। আগামীর প্রজন্ম ইহা হইতে ভালো কিছু শিক্ষা লাভ করিতেছে না, যাহা এক বা দুই দশক পর আমরা ইহার কুফল ভোগ করিতে থাকিব।
সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বা সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসাবে পদোন্নতি বা নিয়োগ পাইতে হইলে শিক্ষকতায় চার বত্সরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। এই অভিজ্ঞতার পর অনেকেই জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ বাছিয়া লইয়া থাকেন। কিন্তু তাহারা আবার তদবির করিয়া বিভিন্ন স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদে থাকিয়া যান। দেখা যাইতেছে যে, মূল পদ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা; কিন্তু তিনি ২০ হইতে ২৪ বত্সর ধরিয়া ঢাকায় একটি সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদে দায়িত্ব পালন করিতেছেন। এই সকল অনিয়ম দেখিবার দায়িত্ব যাহাদের, তাহারা জাগিয়া থাকিয়া ঘুমাইতেছেন। ইহার কারণে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৩টি জেলায় শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য রহিয়াছে। ইহাতে জেলাগুলিতে শিক্ষার কাজ ব্যাহত হইতেছে, অন্যদিকে প্রকৃত শিক্ষকরা পদবঞ্চিত হইতেছেন। এই মগের মুল্লুক তো চলিতে পারে না। একশ্রেণির চিকিত্সকের মতো শিক্ষকরাও আজ ঢাকায় থাকাকে প্রাধান্য দিতে গিয়া মফস্সল এলাকা ইহাতে যাহার পর নাই ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। এই মানসিকতার অবসান হইবে কখন? প্রধানমন্ত্রীর হুংকার সত্ত্বেও একশ্রেণির চিকিত্সককে উপজেলা পর্যায়ে ধরিয়া রাখা যাইতেছে না। এখন শিক্ষকরাও একই পথে হাঁটিতেছেন। আমাদের আশা-ভরসার জায়গাটা এইভাবেই নষ্ট হইয়া যাইতেছে।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও প্রধান শিক্ষক—দুইটাই সমপদ। এই জন্য নিজ নিজ পদে থাকিয়াই দায়িত্ব পালন করা উচিত। বেতনভাতার বাহিরে নানা সুযোগ-সুবিধা থাকাতে অনেকে প্রধান শিক্ষক হওয়ার জন্য ছুটিয়া চলিতেছেন। স্কুলের কেনাকাটায় স্বাধীনতা লাভ ও আশপাশের বেসরকারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে মাউশির মহাপরিচালকের প্রতিনিধি থাকিবার সুযোগ অনেকেই হাতছাড়া করিতে চাহেন না; কিন্তু সরকারি চাকুরির যে বিধিবিধান রহিয়াছে তাহা অবশ্যই মানিয়া চলিতে হইবে। একইভাবে নিয়ম মানিলে একজন শিক্ষা কর্মকর্তা কীভাবে দীর্ঘদিন ধরিয়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকিতে পারেন? সুনামগঞ্জের শান্না উপজেলায় এই ধরনের ঘটনার যে অভিযোগ উঠিয়াছে, তাহা তদন্ত সাপেক্ষে যথাবিহিত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। জেলা-উপজেলায় যেই সকল শিক্ষা কর্মকর্তার পদ খালি আছে, তাহা অবিলম্বে পূরণ করা দরকার। আমরা এই ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ত্বরিত ও কঠোর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করিতেছি।