মানবিক সংকটে নিরপেক্ষ থাকিবার অবকাশ নাই

যুদ্ধ মানেই প্রাণহানি, যুদ্ধ মানেই শান্তিভঙ্গ। ইহা সকলের জানা থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধ হয়। কোনো দেশের স্বার্থে আঘাত লাগিলে, কূটনৈতিক সম্পর্কে অবনতি হইলে, কোনো দেশ অপর দেশকে নিজ দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করিলে তা যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়াইয়াছে, ইহার মধ্যেই বিশ্ব প্রত্যক্ষ করিয়াছে যুদ্ধের চরম মানবিক সংকট। যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হিসাবে লন্ডভন্ড হইয়াছে ইউক্রেনের শহর-নগর ও বিভিন্ন জনপদ। নিরীহ মানুষজন বাস্ত্তহারা হইয়াছে, জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে দিশেহারা সেইখানের সাধারণ জনগণ। ইহারই মধ্যে রাশিয়ার বেপরোয়া বোমাবর্ষণে রক্তাক্ত হইয়াছে ইউক্রেনের একটি মা ও শিশু হাসপাতাল। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া হাসপাতালটিতে অনেক শিশু হতাহত হইয়াছে এবং আশঙ্কা করা হইতেছে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়িয়া রহিয়াছে অনেক শিশু। ইউক্রেন আক্রমণের প্রারম্ভে রাশিয়া ঘোষণা করিয়াছিল—শুধু সামরিক স্হাপনায় আঘাত করা হইবে; কিন্তু হাসপাতাল, সাধারণ জনগণের ঘরবাড়িসহ যেই সমস্ত জায়গা যুদ্ধক্ষেত্রের বাহিরে অবস্হিত সেই সমস্ত জায়গাতে কেন আক্রমণ করা হইবে?

পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে দেখিতে পাওয়া যায়, যুগের পর যুগ এই ধরণিতে অনেক শক্তিধরের আবির্ভাব ঘটিয়াছিল। পরাক্রমশালী সেই সকল শক্তিধর চিরকাল টিকিয়া থাকিতে পারে নাই। ঔদ্ধত্য আর বাড়াবাড়ির কারণে তাহারা সকলেই ধ্বংস হইয়া গিয়াছিল; কিন্তু বর্তমানে বিশ্বের অনেক ক্ষমতাবান, শক্তিশালী রাষ্ট্র যাহারা অন্য রাষ্ট্রের উপর আক্রমণ, নিপীড়ন, ধ্বংসযজ্ঞ চালাইতেছেন তাহারা এই সত্য মানিয়া লইতে চাহেন না। যুদ্ধের লীলাখেলায় তাহারা ভুলিয়া যান মানবিক সংকটের কথা। সত্তরের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় আক্রমণকারীরা সেই দেশের যোদ্ধাদের নিশ্চিহ্ন করিতে যে ভয়াবহ রাসায়নিক হামলা চালাইয়াছিল তাহার জের আজও দেশটি বহিয়া বেড়াইতেছে। প্রজন্ম হইতে প্রজন্ম পর্যন্ত বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হইতেছে, ক্যানসারে আক্রান্ত হইয়া মৃত্যুবরণ করিয়াছেন অনেকেই। যুদ্ধের এই ভয়াবহতা আমরা প্রত্যক্ষ করিয়াছি ফিলিস্তিনের সাধারণ জনগণের উপর ইসরাইলিদের ব্যাপক বোমাবর্ষণ আর ধ্বংসযজ্ঞেও। ফিলিস্তিনের লক্ষ লক্ষ মানুষ হতাহত হইয়াছে, বাস্ত্তচ্যুত হইয়াছে শান্তিকামী সাধারণ নাগরিক। বাংলায় একটি প্রবাদ রহিয়াছে—রাজায় রাজায় যুদ্ধ, উলুখাগড়ার প্রাণান্ত। সত্যিকার অর্থেই পৃথিবীর পরাশক্তিদের মধ্যে রেষারেষি, ক্ষমতার লড়াই আর যুদ্ধের দামামায় বলি হইতেছে সাধারণ মানুষ। তাহারা হয় নিজেদের জীবন দিতে বাধ্য হইতেছেন, না হয় দখলদারিত্বের মুখে নিজ আবাসভূমি ছাড়িয়া দেশান্তরী হইতেছেন। যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের আহাজারি, ক্ষুধা-দারিদ্র্য আর অভিবাসী সমস্যায় সৃষ্ট মানবিক সংকটে আমরা ব্যথিত না হইয়া পারি না।

ভারতবর্ষে রক্তক্ষয়ী কলিঙ্গ যুদ্ধে অজস্র মানুষের মৃত্যু আর যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করিয়া সম্রাট অশোক যুদ্ধের নীতি পরিহার করিয়া তাহার রাজনৈতিক ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আনিয়াছিলেন, মনোনিবেশ করিয়াছিলেন ধর্মকর্মে—যাহাতে করিয়া মানুষ যুদ্ধের ভয়াবহতা হইতে রক্ষা পায়। আজকের দুনিয়ায় শক্তিধর ও ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলির নীতিনির্ধারক যাহারা রহিয়াছেন তাহাদের বোধোদয় আসিবে কি না—তাহা আমরা বলিতে পারি না; কিন্তু যুদ্ধের এই প্রলয়ংকরী, বিভীষিকাময় পরিস্হিতিতে সৃষ্ট মানবিক সংকটে নিরপেক্ষ থাকিবার অবকাশ নাই। কারণ কাল যে আপনার উপর বোমা হামলা হইবে না তাহার কোনো নিশ্চয়তা নাই। আমরা সকল প্রকার যুদ্ধবিগ্রহ, হামলা, আগ্রাসন, দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে। যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ে বিশ্বের সকল শান্তিকামী মানুষ ব্যথিত। তাই হামলা-আগ্রাসন পরিহার করিয়া বিশ্ব যাহাতে মানুষের জন্য বাসযোগ্য স্হানে পরিণত হয় বিশ্বনেতৃবৃন্দকে সেই পথেই অগ্রসর হইতে হইবে।