প্রজন্মের পর্যটন উদ্যোক্তা

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুগে যুগে বহু পরিব্রাজক ও ভ্রমণকারী মুগ্ধ হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই এ সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে পর্যটন শিল্পে উন্নয়নের সম্ভাবনা অপরিসীম। নতুন করে কৌশল ঠিক করে সম্ভাবনার সবটুকুকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পর্যটনে মডেল হতে পারে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এমন পর্যটকবান্ধব দেশ তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের সব মানুষের কাছে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ স্বল্প আয়তনের দেশ হলেও পর্যটক আকর্ষণে যে বৈচিত্র্য দরকার তা আয়োজনে সহজেই পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। এই প্রজন্মের কাছে পেশা হিসেবে পর্যটন শিল্প অনেক বেশি আর্কষণীয়। তাই এই প্রজন্মের তেমনই কয়েকজন পর্যটন উদ্যোক্তাদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন, পুরো আয়োজনটি গ্রন্থনা এবং সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র জ হি রু ল ই স লা ম ডা ল্ট ন বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার, ওশ্যান প্যারাডাইজ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লি. জহিরুল ইসলাম ডাকনাম :ডাল্টন মায়ের নাম :জাহানারা বেগম বাবার নাম :মো. তবদিল হোসেন প্রিয় উক্তি :চেষ্টা করলে প্রতিভাকে অগ্রাহ্য করা যায় প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট প্রিয় মানুষ :হযরত মুহম্মদ স. অবসর কাটে যেভাবে :ছবি তুলে আর লেখালেখি করে সাফল্যের সংজ্ঞা :আত্মতৃপ্তিই সফলতা। পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য পড়ে মনে হয়, ওখানকার মানুষজন ছুটি পেলেই কোথাও না কোথাও বেরিয়ে পড়ে। সুনীল-শীর্ষেন্দু-বুদ্ধদেবের প্রচুর পাঠক আছেন এ দেশে। সেই সাহিত্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বা ফি বছর বাড়ি যাওয়ার বিড়ম্বনা এড়াতে কিংবা মানসিকতার পরিবর্তন—যে কারণেই হোক, মানুষের এই বেড়ানোর অভ্যাসটি ইতিবাচকভাবে দেখা দরকার। আমরা নানা সময় নিজের দেশকে অপরূপ হিসেবে উপস্থাপন করি, বিশেষত আবেগের জায়গা থেকে প্রায়ই বলে থাকি—এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি! কিন্তু দেশটিকে দেখার ক্ষেত্রে আমাদের একটা জন্মগত অবহেলা ছিল সবসময়। যদিও এ অবহেলার পেছনে খোদ পর্যটনের প্রতি মানুষের অনীহা নাকি নানা অসুবিধার কারণে মানুষ বেড়াতে অনাগ্রহী—সেটি অন্য বিতর্কের বিষয়। বলছিলেন জহিরুল ইসলাম, তিনি কর্মরত রয়েছেন ওশ্যান প্যারাডাইজ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার, একইসাথে ট্যুর ডেস্কের ইনচার্জ হিসেবে। জহিরুল ইসলাম তার কাজের বাইরেও পর্যটন সাংবাদিকতার সাথে জড়িত, করছেন ফটোগ্রাফিও। ফ্রান্স আর আমেরিকাতেও তার ফটোগ্রাফি এক্সিবিশন হয়েছে, আর সেটাও ট্যুরিজম এ কাজ করার সুবাদেই। অনেক মানুষ এখানে বাইরে থেকে আসে আর তার ছবি তোলার আগ্রহ আর ধরনে মুগ্ধ হয়ে এমন সুযোগটা করে দিয়েছেন। জহির তার নিজের যোগ্যতায় ফটোগ্রাফি সোসাইটি অব আমেরিকার সদস্যপদ লাভ করেছেন। জহিরের এত অর্জনের গল্পটা মূলত গত শতাব্দীর শেষ সময়ে শুরু। গুলশানে একটা হোটেলের সাথে যুক্ত ছিলেন শুরু থেকে, তখনই বিদেশিদের নিয়ে ঘুরতে শুরু করেন, আর এক পর্যায়ে এখন এসে অনেক দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নির্দেশনা দিচ্ছেন। welcome-bangladesh.com নামে একটি ওয়েবসাইট খুলেছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে পর্যটনের সর্বশেষ তথ্য মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে চাচ্ছেন, বাইরে অবস্থিত আমাদের দূতাবাসগুলোতে তিনি একটা তথ্যকণিকা আর নির্দেশনা দেওয়ার ব্যাপারে কাজ শুরু করেছেন। জহির বললেন, ‘দেশের নানা জায়গায় ছোট-বড় অনেক পর্যটন স্পট থাকলেও অনেকেই সেগুলোর খবর জানত না। মিডিয়ার কল্যাণে এখন সেগুলো উঠে আসছে। পর্যটন স্পট নির্বাচন করার ক্ষেত্রেও প্রচলিত চিন্তাচেতনা থেকে মানুষ একটু একটু করে বেরিয়ে আসছে। আগে কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ইত্যাদি নামকরা জায়গার প্রতি মানুষের আগ্রহ ছিল। কিন্তু অনেকেই এখন স্বল্পপরিচিত বা অপরিচিত সুন্দর কোনো জায়গা, নদীর ধারে কাশফুলের মাঠ কিংবা শুধু গ্রাম দেখতেও বেরিয়ে পড়ে। এ ধরনের পর্যটক কম হলেও দিন দিন এদের সংখ্যা বাড়ছে। ঢাকা শহরের মানুষ আজকাল এমনকি মাওয়া ফেরিঘাটও দেখতে যায়, একদিনের ছুটি পেলে চলে যায় মানিকগঞ্জের পুরোনো মসজিদ বা মন্দির দেখতে কিংবা ঘুরে আসে বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে। আগেকার সময়ের পর্যটনের সাথে এখনকার পর্যটনের ধারণার অনেক পার্থক্য রয়েছে। পরিবর্তিত সময় ও গতিশীল জীবনই হয়তো এর কারণ। আগে পর্যটকেরা একটা জায়গায় শুধু মুগ্ধ হওয়ার জন্য ভ্রমণ করতেন না, সেই এলাকার মানুষের জীবন, সংস্কৃতি কিংবা পরিবেশ অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণ ছিল তাদের পর্যটনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। এ সময়ের পর্যটকেরা কি সেদিকে নজর দেন? আজকাল বেড়াতে বের হওয়া মানে মুগ্ধ হতে যাওয়া। যে সুন্দরবনে বেড়াতে গিয়ে এর সৌন্দর্য দেখে আমরা মুগ্ধ হই, লঞ্চের পাশ দিয়ে বয়ে চলা সুন্দরবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ জেলে-নৌকা দেখে তাদের অবস্থার কথা আমরা কয়জন ভাবি? বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে এ ধরনের নানা চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে। প্রচলিত চিন্তাচেতনার বাইরে গিয়ে পর্যটনকে একটু দেশীয় ছোঁয়া দিতে পারলে অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা বিপুলভাবে বেড়ে যাবে সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিবেশ এমনই যে, একটু চেষ্টা করলে সারা দেশটাকেই পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা অনেকেই যেখানে জন্মেছি, তার পাশের উপজেলা বা জেলাতে যাইনি; কিন্তু একটা পর্যটন স্পট থাকলে সহজেই মানুষ আশপাশের জেলাগুলোতে বেড়াতে যেতে পারত। পর্যাপ্ত উদ্যোগ থাকলে জেলা পর্যটনও হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অন্যতম শক্তিশালী ক্ষেত্র।’ ই ক বা ল হো সা ই ন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্যুরিস্ট চ্যানেল বাংলাদেশ ইকবাল হোসাইন ডাকনাম :বাবু জন্মতারিখ ও স্থান :১ মার্চ, চাঁদপুর মায়ের নাম :মনোয়ারা আক্তার বাবার নাম :মো. আবুল হোসাইন প্রথম স্কুল :মতলবগঞ্জ জিবি পাইলট হাই স্কুল প্রিয় উক্তি :সততাই সর্বোত্কৃষ্ট পন্থা। প্রিয় পোশাক :সাদা-কালো যেকোনো পোশাক প্রিয় মানুষ :আমার মা অবসর কাটে যেভাবে :গিটার বাজিয়ে সাফল্যের সংজ্ঞা :আকাঙ্ক্ষিত জায়গাতে পৌঁছানো। পর্যটন শিল্পের বিকাশের ওপর বাংলাদেশের অনেকখানি উন্নয়ন নির্ভর করছে। দেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটলে কর্মসংস্থান ঘটবে ও বেকারত্ব দূরীকরণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হবে। আমাদের পর্যটনের সম্ভাবনাকে এভাবেই তুলে ধরলেন ট্যুরিস্ট চ্যানেল বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল হোসাইন। ছেলেবেলা থেকেই ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন ইকবাল। সঙ্গত কারণেই আগ্রহ ছিল যে পর্যটন শিল্পে কাজ করবেন। সেই ভাবনা থেকেই শুরু, প্রথম প্রথম গাইড ট্যুরসের গাইড হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি মূলত ওই প্রতিষ্ঠানের ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেল ডেস্কের ইনচার্জ ছিলেন, তারপর কিছুদিন ওরিয়ন গ্রুপের প্রটোকল বিভাগে কাজ করেন। এর মাঝেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও সম্পন্ন করেন তিনি। মাস্টার্স সম্পন্ন করে এমবিএ করেছেন, করেছেন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা। ইংল্যান্ড থেকেও ব্যবসায় প্রশাসনে উচ্চশিক্ষা নেন, আর নিজের কাজটা আরও ভালোমতো বুঝে নিতে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন থেকে ট্যুরিজম ডিপ্লোমাও করেন। ইকবাল মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটা কর্মক্ষেত্রে অনেক সহায়তা করে। ইকবাল তার যোগ্যতায় অনেক বহুজাতিক কোম্পানিতে দিব্যি আরামে চাকরি করে যেতে পারতেন। তিনি সেটা করেননি, দাঁড় করিয়েছেন নিজের প্রতিষ্ঠান আর সেটা অবশ্যই অভিজ্ঞতা অর্জনের পরে। এ দেশের ট্যুরিজম ব্যবসায়ী ও ব্যবস্থাপকদের কাছে তিনি হতে পারেন পথপ্রদর্শক। তিনি বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট গাইড অ্যাসোসিয়েশনের আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি বিষয়ক সম্পাদক। সব দায়িত্বই তিনি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যের সাথেই পালন করছেন, কাজ করছেন শতভাগ আত্মতৃপ্তি নিয়ে, দেশকে জানার ও জানানোর এ রকম সরাসরি সৌভাগ্য কতজনের ভাগ্যে হয়! তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, পেশা হিসেবে এটা আমাদের জন্য কতটা উপযোগী? ইকবাল বললেন, ‘দেশে পর্যটন খাতে প্রচুর লোকের অভাব। অনেকেই হয়তো কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছেন অথচ বৈচিত্র্যময় এই দিকটা সম্পর্কে কোনোই অভিজ্ঞতা নেই, তারা খুব সহজেই এই বিষয়ে পড়াশোনা করে ক্যারিয়ার গড়ার কথা ভাবতে পারেন, সময়ের সাথে সাথে আমাদের সম্ভাবনার দ্বারও উন্মুক্ত হচ্ছে। সে জন্যই অনেক অভিজ্ঞ আর চটপটে লোক দরকার হবে অনেক, যারা নিজেদের এগিয়ে রাখতে পারবেন, তারাই এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেবেন, সেটা বলাই বাহুল্য।’ বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান ইকবালের ছেলেবেলা কেটেছে বেশ আনন্দে। বন্ধুদের সাথে দিনভর আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরতেন, তবে পড়াশোনার ক্ষেত্রে চাইতেন অবস্থানটা ধরে রাখতে। এখন স্ত্রী ইভাই তার পথচলায় সঙ্গী ও অনুপ্রেরণা। কথার শেষ পর্যায়ে ইকবাল বলেন, নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস, বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি আমাদের দেশকে গড়ে তুলেছে একটি বহুমাত্রিক আকর্ষণীয় অনন্য পর্যটন গন্তব্য হিসেবে, যা বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছে পর্যটকদের জন্য তীর্থস্থান হিসেবে; কিন্তু অবহেলা ও অযত্নে পড়ে থাকা এ অঞ্চলের পর্যটন শিল্প তার ইতিহাস হারাতে বসেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পর্যটন বাংলাদেশের এক সম্ভাবনাময় শিল্প, শুধু দরকার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। এ শিল্পের বহুমাত্রিকতার কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা তৈরি হয়। ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যটন শিল্পের উপাদান ও ক্ষেত্রগুলো দেশে ও বিদেশে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের অধিকতর বিকাশ ঘটানো সম্ভব। আর ইকবাল হোসাইন তার অবস্থান থেকে সহযোগিতা করে যেতে চান এই খাতকে, পর্যটন শিল্পে নিজেকে যোগ্য একটা আসনে দেখতে চান নিকট ভবিষ্যতে। তা ন ভী র আ হ মে দ পরিচালক, সিলভার ওয়েভ ট্যুরস লি. তানভীর আহমেদ ডাকনাম :তানভীর জন্মতারিখ ও স্থান :২২ মার্চ, গাজীপুর মায়ের নাম :আকলিমা খাতুন বাবার নাম :আব্দুল বাতেন প্রথম স্কুল :ফুলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :হযরত মুহম্মদ (স.) প্রিয় উক্তি :ভালো-মন্দ যাহাই আসুক, সত্যরে লও সহজে। প্রিয় পোশাক :জিন্স ও টি-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :মুভি দেখে, ভ্রমণে। সাফল্যের সংজ্ঞা :কঠোর পরিশ্রম, সেই সাথে সততা। ‘পৃথিবীর আদিকাল থেকে মানুষ খাদ্য অন্বেষণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচার জন্য সব সময়ই সে যাযাবর হিসেবে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে আস্তানা গেড়েছে। এ যুগের মতো পাসপোর্ট, ভিসা ইত্যাদি কিছুই ছিল না। কোনো অপরিচিত আগন্তুক অন্য কোনো এলাকায় বা দেশে বেড়াতে গেলে তাকে সম্মানের সাথে মেহমান হিসেবে গণ্য করা হতো। আর রাজদূত হলে তো কথাই ছিল না। উপহার আর উপঢৌকনে সমৃদ্ধ করা হতো সেই দলকে। কিন্তু এখন আর সেই যুগ নেই। শিক্ষা, ভাষা, পরিবহন, যোগাযোগ ও আধুনিক প্রযুক্তির বদৌলতে মানুষ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বেড়াতে যেতে পারে। আজকের যুগে মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্য, লেখাপড়া, প্রযুক্তি বিনিময়, অভিবাসন, চিকিত্সা, খেলাধুলা, প্রাকৃতিক রূপদৃশ্য এবং পৃথিবীর নানাবিধ সংস্কৃতিকে অবলোকন করার জন্য একদেশ থেকে আরেক দেশে ভ্রমণ করতে যায়। আজকের যুগে ভ্রমণ বা পর্যটন হচ্ছে মানুষের জীবনের এক বিশেষ অঙ্গ। পৃথিবীর বহু দেশ পর্যটন খাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে থাকে। এমন কিছু রাষ্ট্র আছে যাদের রাষ্ট্রীয় বাজেটের সিংহভাগ আয় হয় এই পর্যটন শিল্পের খাত থেকে। আমাদের দেশেরও তেমন সম্ভাবনা রয়েছে, আর আমরা চাইলেই সেভাবে নিজেদের পর্যটন খাতটাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে পারি,’ বললেন তানভীর আহমেদ, যিনি সিলভার ওয়েভ ট্যুরসের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এই মুহূর্তে। প্রজন্মের মেধাবী এই ট্যুরিজম ব্যবস্থাপক তার নিজের প্রতিষ্ঠানের বাইরেও ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তানভীর পড়াশোনা শেষ করেই বন্ধুর কথায় যোগ দিলেন রিভার অ্যান্ড গ্রিন ট্যুরে, কাজ শুরু করেন, সেটাকে আরও পোক্ত করার জন্য বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন থেকে ডিপ্লোমা করেন আর এর পর কিছু প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে শুরু করেন আজকের এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে পথচলা। আর সে যাত্রায় তিনি অনেকটাই সফল। তানভীর মনে করেন, পেশা হিসেবে এখন ট্যুরিজম খুবই আশাব্যঞ্জক। তারা যখন শুরু করেছেন অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে, তবে যতই দিন যাচ্ছে আস্তে আস্তে অনেক পথনির্দেশনা তৈরি হচ্ছে। নতুনরা যতই তাদের দায়িত্ব, আর প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগিয়ে আসবে ততই ভালো হবে বর্ণিল এই পেশাটার জন্য। আরও একটা বিষয়ের উপর জোর দিলেন তানভীর। তিনি বললেন, ‘খুব অল্প সময়েই অনেকে নিজে প্রতিষ্ঠান খুলে বসতে চান, এটা ঠিক নয়, কিছু বুঝে জেনে শুনে তবেই যাত্রা শুরু করা উচিত।’ প্রজন্মের মেধাবী এই ট্যুরিস্ট ব্যবস্থাপক তানভীর মনে করেন, বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪ লাখ লোক জড়িত। বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণ স্থানসমূহের যেমন—কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কুয়াকাটাসহ প্রত্নতাত্ত্বিক সমৃদ্ধ জেলাসমূহে বহুলসংখ্যক লোক এ শিল্পের সাথে জড়িত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে। বিভিন্ন জেলায় পর্যটন কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির ফলে হস্তশিল্প, পোল্ট্রি ফার্ম, মত্স্য খামারসহ নানা ধরনের শ্রমঘন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রসারমূলক কাজের সাথেও অনেক লোক জড়িত। পর্যটনের সুবিধা সমাজের নিম্নস্তরে পৌঁছে দিয়ে দারিদ্র বিমোচন সম্ভব। সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বাংলাদেশে পর্যটন একটি অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। সুতরাং এ শিল্পের উন্নয়নে আমাদের মনোনিবেশ করা জরুরি। পর্যটন উন্নয়নে সরকার ও ব্যক্তিখাতসহ সকল সচেতন নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন—এমনটাই মনে করেন তানভীর। বাবা-মা আর চার ভাইবোনের পরিবারে তানভীর বরাবরই সবার ভালোবাসা পেয়ে এসেছেন। তাদের আত্মতৃপ্তিও তার কাজের অনেক বড় অনুপ্রেরণা। অদূর ভবিষ্যতে তিনি তার স্বপ্নের পথ ধরে দেশের পর্যটন শিল্পকে বড় একটা পর্যায়ে নিয়ে যাবেন, আশাবাদ আমাদের। এ ম র ফি কু ল ই স লা ম পরিচালক (অপারেশন), বেঙ্গল ট্যুরস লি. এম রফিকুল ইসলাম ডাকনাম :নাসিম জন্মস্থান :পিরোজপুর মায়ের নাম :জাহানারা বেগম বাবার নাম :নূরুল ইসলাম প্রথম স্কুল :পিরোজপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :আমার মা প্রিয় উক্তি :প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেই বিশ্বাস অর্জন কর। প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :কাজের অগ্রগতি বিশ্লেষণ করে। সাফল্যের সংজ্ঞা :কাজের পরিণতিটা ভালো হলেই সফলতা। ‘কেউ যদি প্রশ্ন করে, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বর্তমান অবস্থা কী তাহলে আমি বলব বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প দেরিতে হলেও বর্তমানে সঠিক পথেই ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। অতীতের অসামঞ্জস্যতা দূর করে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার নিরিখে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের সঠিক পথকে চিহ্নিত করা গেছে। আশা করা যায় দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বিখ্যাত পর্যটন গন্তব্যের মতোই একটি অনন্য গন্তব্যস্থলে পরিণত হবে। এর জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন আইনি পরিকাঠামো এবং পর্যটন অবকাঠামো। বর্তমানে পর্যটন উন্নয়নে বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পর্যটন শিল্পে উন্নয়নের জন্য একটি আধুনিক এবং যুগোপযোগী পর্যটন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।’ এভাবেই শুরু করলেন এম রফিকুল ইসলাম, যিনি বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল ট্যুরসের পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোকপ্রশাসনে মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর তিনি যোগ দিলেন একটা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে, সেখানে কিছুদিন কাজ করেন, তারপর নিজেই আরও কিছু উদ্যোগী মানুষকে নিয়ে শুরু করলেন বেঙ্গল ট্যুরস। রফিকের কাছে আমরা জানতে চেয়েছিলাম, কেন এই পেশা? তিনি বলেন, ‘আসলে খুব আয়োজন করেই যে আসা হয়েছে তা না, তবে কাজ করতে গিয়ে বুঝতে পেরেছি এখানে অনেক মানুষের সাথে ওঠাবসার সুযোগ হয়, অনেক দেশের সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়া যায়, আর সেই ভাবনা থেকেই এই পেশায় থেকে যাওয়া, আর এখন তো এর বাইরে কিছু কল্পনাও করতে পারি না।’ রফিক আরও বলেন, ‘বর্তমানে বেসরকারি পর্যায়ে অনেক পর্যটন দর্শনীয় স্থান এবং বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠছে। তবে এগুলো অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের জন্য তো বটেই, বিদেশি পর্যটকদের জন্যও যথেষ্ট নয়। আমরা চাই আরও গড়ে উঠুক। আমাদের দেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে কিছু সমস্যা এখনও বিরাজ করছে এবং সমস্যাগুলো উত্তরণের ব্যাপারে আমাদের আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের সমস্যা অতীতে যা ছিল তা সরকার বেশ কিছু চিহ্নিত করে সমাধান করার চেষ্টা করছে। আর্থ-সামাজিক কাঠামোর নিরিখেই যেকোনো শিল্পের উন্নয়নের পদক্ষেপ নিতে হয়। দক্ষ মানব সম্পদের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের শক্ত ভিত এখনও গড়ে ওঠেনি। আমাদের এ সকল বিরাজমান সমস্যাগুলো দূর করে পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। তা ছাড়া টেকসই পর্যটন উন্নয়নের জন্য যা কিছু প্রয়োজন তাই করা দরকার। পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য রক্ষাও আমাদের করতে হবে পর্যটন শিল্পের জন্য। এ জন্য সুপরিকল্পিত ও সুনিয়ন্ত্রিত পর্যটন শিল্পের উন্নয়নই সকলের কাম্য।’ নতুন যদি কেউ এই পেশায় আসতে চায়, তাহলে তাকে অনেক কিছু জেনে আসতে হবে বলে মত দিলেন প্রজন্মের এই মেধাবী ব্যবস্থাপক। তার মতে, এই পেশায় যোগ্য লোকের অনেক অভাব, সুতরাং যদি কেউ অভিজ্ঞতা আর কাজের আগ্রহ নিয়ে আসে অবশ্যই সফল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। রফিকুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন আর মা। আর তাদের নিয়েই তার সুখের সংসার, ভাইবোনেরা সবাই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তার স্ত্রী নাফিসা হোসেন এই পেশায় সফলতার পেছনে অনেকটা অংশীদার! তাদের ভালোবাসাবাসির প্রথম পুষ্প পুত্র নূমের রফিককে ঘিরেই সব স্বপ্ন তাদের। এতকিছুর বাইরে নিজের প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল ট্যুরিজমকে নিয়ে যেতে চান অনেক ভালো একটা অবস্থানে, পুরোমাত্রায় সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চান দেশের প্রথম সারির এই পর্যটন সংস্থাটিকে। এ স এ ম কা ম রু জ্জা মা ন ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলা ট্যুরস্ এস.এম কামরুজ্জামান ডাক নাম :ওবায়দুল জন্ম তারিখ :১ জুলাই জন্ম স্থান :কুমারখালী, কুষ্টিয়া। বাবার নাম :মো. তোয়াক্কেল আলী (মাস্টার) মাতার নাম :বেগম রোকেয়া প্রথম স্কুল :মোড়াগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :আমার বাবা প্রিয় উক্তি :আমার প্রিয় বাংলাদেশ। প্রিয় পোশাক :জিন্স, প্যান্ট, টিশার্ট অবসর কাটে যেভাবে :পরিবারের সাথে ঘুরে। সাফল্যের সংজ্ঞা :চেষ্টা ও শ্রম দিলে সাফল্য পাওয়া যায়। এসি পরিবহনের গাইড হিসেবে পার্ট টাইম চাকরি দিয়েই ১৯৯৭ সালে পর্যটন শিল্পে তার যাত্রা শুরু। এখানে দুই বছর পরিবহন গাইড হিসেবে সেবা প্রদান করেন। অতঃপর ২০০০ সালের প্রথম দিকে পর্যটন গাইড হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যটন স্থানগুলোতে সেবা প্রদান করে এসেছেন। কথা বলছিলাম বাংলা ট্যুরস্-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম কামরুজ্জামানের শুরু গল্পটি নিয়ে, পরিচিত জনদের কাছে যিনি ওবায়দুল হিসেবেই বেশি পরিচিত। এসএম কামরুজ্জামানের শৈশব কেটেছে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার মোহাম্মদপুর গ্রামে। দুই ভাই তিন বোনের মাঝে তিনিই সবার বড়। বাবা একজন আদর্শ স্কুল শিক্ষক, মা গৃহিণী। এ নিয়েই গ্রামের বাড়িতেই পারিবারিক আবহ তার। কেন এই পেশা বেছে নিলেন? উত্তরে এসএম কামরুজ্জামান বলেন, ‘আসলে এই পেশায় সবসময় নতুন কিছু চেনা এবং জানা যায়। প্রতিদিন নতুন মনে হয়। এক কথায় কাজ করে আনন্দ পাওয়া যায়। আর স্বাচ্ছন্দ্যবোধের ব্যাপারে বলতে গেলে এই পেশা যেহেতু সেবামূলক তাই এই পেশায় কাজ করে খুবই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’ পেশা হিসেবে এটা আমাদের দেশে কতটা উপযোগী? উত্তরে এসএম কামরুজ্জামান বলেন, ‘যেহেতু আমাদের এই বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা। যা কিছু আছে সবই প্রাকৃতিক। আর প্রকৃতির সাথে পরিচিত করার জন্য এই পেশা বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই উপযোগী মাধ্যম। আর বর্তমানে অনেক নতুনরা এই পেশায় আসছে এবং খুব ভালো করছে এবং আশা করি আরও ভালো করবে। নতুনদের জন্য আমার পরামর্শ থাকবে পর্যটন গাইড হিসেবে একজন পর্যটককে সঠিক এবং সত্য তথ্য উপস্থাপন করা। আমার অভিজ্ঞতার আলোকে আমি বলতে চাই, এখন পর্যন্ত যত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সেবা প্রদান করেছি তারা বেশিভাগ জানতে চাই আমাদের দেশের কালচার সম্পর্কে। এই প্রজন্ম সম্পর্কে তার মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই প্রজন্ম যথেষ্ট স্মার্ট এবং তারা বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ করছে। মানুষ যুগের সাথে সাথে তার চিন্তাভাবনাকেও পরিবর্তন করছে। এখন যারা কাজ করছে তারা অনেক বেশি টেকনোলজি সহায়তা গ্রহণ করছে। এটা খুবই ভালো। কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে সৃষ্টিশীলতা নিজ থেকে তৈরি করতে হবে এবং তথ্যপ্রযুক্তি তাকে সার্পোট দেবে। সে জন্য টেকনোলজির সুবিধা বেশি নিতে গিয়ে নিজের সৃষ্টিশীলতাকে নষ্ট করা যাবে না। তবে আমি যা দেখেছি নতুনরা খুবই বুদ্ধিমান। তারা ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদিকে ব্যবহার করে অনেক অ্যাডভান্স কাজ করে। যা একজন ব্যবস্থাপকের জন্য খুবই কল্যাণকর। তবে এর পাশাপাশি দেখা যায় অনেকের জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ কম। এ জন্য বেশি বেশি বই পড়তে হবে। ব্যবহারিক জ্ঞান আহরণ করে তা ব্যবসায় কাজে লাগাতে হবে। নতুন যারা সংক্ষিপ্ত রাস্তা ধরে এই পেশায় সাফল্য অর্জন করতে চায় তাদের উদ্দেশে একটা কথা বলব, জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই এবং অধিক অধ্যয়ন ছাড়া এ পেশায় সফলতার কোনো সংক্ষিপ্ত রাস্তা নেই। যেহেতু এই প্রজন্ম আগামীতে এ দেশের নেতৃত্ব দেবে এবং একুশ শতকের চ্যালেঞ্জটা তাদেরই মোকাবিলা করতে হবে তাই তাদের প্রতি আমার পরামর্শ রইল জ্ঞান অর্জন এবং টেকনোলজি গ্রহণ করে তাদের প্রকৃত সমন্বয় ঘটাতে পারলেই দেশ এগিয়ে যাবে।’ সবশেষে তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন হচ্ছে একজন আদর্শ গাইড হিসেবে আমাদের এই বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করা এবং বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে সেবার মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।