স্মরণ

রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই

প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক, শিশুসংগঠক ও সাংবাদিক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই-এর মৃত্যুবার্ষিকী আজ ৩ ডিসেম্বর। ১৯৯৯ সালের এই দিনে তিনি আমাদেরকে শোকের সমুদ্রে ভাসিয়ে চিরবিদায় নিয়েছিলেন। আমরা বলেছিলাম তিনি চিরদিন বেঁচে থাকবেন। যারা খুব উচ্চকণ্ঠে বলেছিলাম তারাই আজ তাঁকে বেশি ভুলতে বসেছি। মানুষ গড়ার কারিগর শুধু গড়তেই শিখেছিলেন, গড়তেই জেনেছিলেন, গড়তেই ভালোবাসতেন। অন্য কোন লোভ-লালসা, পদমর্যাদা, অর্থ-বিত্ত তাঁকে কখনও স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর ধ্যান-জ্ঞান ছিল একটি শিশুকে কিভাবে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলা যায়। তিনি বলতেন, এই শিশুরাই একদিন এই দেশের দায়িত্বভার কাঁধে নেবে। কেউ রাষ্ট্রপতি, কেউ মন্ত্রী, কেউ সচিব, প্রকৌশলী, ডাক্তার, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী হবে এবং সততা ও আদর্শকে বুকে ধারণ করে রাষ্ট্রকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত করবে। সুতরাং এই শিশুদেরকে যদি সুন্দর ও সঠিকভাবে গড়ে তোলা না যায় আমরা ভবিষ্যতে একটি সুন্দর রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে পারব না। এই ভবিষ্যত্ স্বপ্নদ্রষ্টা তাঁর পরিধি অনুসারে সম্পূর্ণ সফল রূপকার বলা যায়। দৈনিক ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরের তিনি পরিচালক ছিলেন। ভাবতে ভালো লাগে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দৈনিক ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরের সদস্য ছিলেন। এ রকম হাজারো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সত্ ও নিষ্ঠার সাথে এখনও অনেক সামাজিক ও রাষ্ট্রিক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। কচি-কাঁচার অনেক সদস্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। আজ দাদাভাই নেই কিন্তু তাঁর মেধা ও বিবেক যে-কজন মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন, পরবর্তীকালে সেই গুণী মানুষগুলো আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছেন। ১৯২৫ সালের ৯ এপ্রিল রাজবাড়ীর পাংশায় জন্ম নেয়া এই উজ্জ্বল নক্ষত্র রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইকে কথা প্রসঙ্গে একবার বলেছিলাম, দাদাভাই আপনি লিখলে তো আমাদের শিশুসাহিত্য ভাণ্ডার আরো সমৃদ্ধ হতো। তিনি মৃদু হেসে বলেছিলেন, তা হয়ত হতো কিন্তু এক হাতে কতটুকু লেখা যেতো, তার চেয়ে এই যে তোমাদের লেখা সৃষ্টি হতে সহযোগিতা করছি যেখানে অসংখ্য হাত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য লেখার জন্ম হচ্ছে, এটাই কী উত্তম নয়? এ রকম সকল প্রশ্নের উত্তরে যে যুক্তি দাঁড় করাতেন আমাদের হেরে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তিনি যা কিছু করতেন ভেবে-চিন্তে শ্রমসাধ্য ও মননশীলভাবে করতেন। কোন প্রভাবশালী লেখকের লেখা ছাপার অনুপযুক্ত হলে তা কখনোই ছাপতেন না। আবার কোন অখ্যাত অচেনা-অজানা লেখকের লেখা নির্দ্বিধায় ছেপে দিতেন লেখা মানসম্পন্ন হলে। প্রত্যেকের লেখা পড়তেন, প্রতিটি শব্দ পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন। কাছ থেকে তাঁর এমন পরিশ্রম দেখে মুগ্ধ হয়েছি। তিনি নিজের প্রতি সব সময় উদাসীন ছিলেন। এ কারণে তাঁকে অনেক পিছনে পড়তে হয়েছে। কখনো নিজের প্রচারে ব্যস্ত হতে দেখিনি বরং নিজেকে গুটিয়ে রাখতেই বেশি পছন্দ করতেন। শুধুমাত্র দেশের প্রতি প্রবল ভালোবাসাটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন আমৃত্যু। তিনি ১৯৬৮ সালে শিশুসাহিত্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়েছেন অথচ ১৯৯৮ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে একুশে পদক পেতে। স্বাধীনতা পদক খুব জরুরি ছিল বলে মনে করি, কারণ তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে থাকায় তত্কালীন সরকারের রোষানলে পড়ে কচি-কাঁচার মেলার পাঠাগার পুড়ে ভস্মীভূত হয়। প্রখ্যাত সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে এই পাঠাগার এবং কচি-কাঁচার মেলাও উঠে দাঁড়াতে পারতো কিনা সন্দেহ। সুতরাং স্বাধীনতা পুরস্কার দাদভাই-এর প্রাপ্য ছিল, এখনো এই পুরস্কারটি মরণোত্তর হিসেবে প্রদানের ব্যবস্থা করলে তাঁকে উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করা হবে বলে বিশ্বাস। তাই মনে করি যারা তাঁকে অবহেলা করছেন তাঁরাই একদিন নিশ্চিহ্ন হবেন। আর দাদাভাই আমাদের মাঝে থাকবেন চিরকাল, চিরদিন, চিরঞ্জীব হয়ে। আমাদের সকল শিশু যেন বেড়ে ওঠে আমার মতোই সেই ছড়াটি পড়তে পড়তে: ‘বাক বাক কুম পায়রা/ মাথায় দিয়ে টায়রা বউ সাজবে কাল কি /চড়বে সোনার পালকি’ লেখক :শিশু সাহিত্যিক