হামের ভয়াবহতার কি নিউ নর্মাল হইয়া গেল?

আপডেট : ২০ জুন ২০২৬, ০৭:১০

বাংলাদেশে হাম আর কেবল একটি সংক্রামক রোগের নাম নহে, ইহা যেন বর্তমানে আমাদের জনস্বাস্থ্যসংকটের প্রতীকে পরিণত হইয়াছে। সরকারি হিসাব বলিতেছে, গত ১৫ মার্চ হইতে ১৮ জুন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ লইয়া হাসপাতালে আসিয়াছে ১ লক্ষ ৬৭৭ জন মানুষ, এবং মৃত্যু হইয়াছে ৬৬৬ জনের। ইহাদের অধিকাংশই শিশু। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে হামের এমন ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যুর ঘটনা প্রায় নজিরবিহীন। প্রশ্ন হইল, যেই দেশে বহু দশক ধরিয়া সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বিশ্বের অন্যতম সফল জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ বলিয়া বিবেচিত হইয়া আসিতেছে, সেই দেশে হামে মৃত্যুর সংখ্যা এত অধিক কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজিতে গেলে প্রথমেই একটি অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি হইতে হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ এখনো স্পষ্ট করিয়া জানাইতে পারে নাই, যেই সকল শিশু মারা গিয়াছে, তাহারা হামের টিকা পাইয়াছিল কি না, কোন বয়সি শিশুরা অধিক আক্রান্ত, কিংবা টিকাপ্রাপ্তদের মধ্যে সংক্রমণের হার কত। অর্থাৎ সংকটের কেন্দ্রে দাঁড়াইয়া আমরা এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানি না। জনস্বাস্থ্যের ভাষায় ইহাকে বলা হয় 'ডেটা ব্লাইন্ডনেস'- তথ্যগত অন্ধত্ব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুদিন ধরিয়াই সতর্ক করিয়া আসিতেছে যে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি হইতে প্রতি বছর কিছু শিশু বাদ পড়িয়া যায়। এই 'বাদ পড়া' শিশুদের সংখ্যা যখন কয়েক বৎসর ধরিয়া জমিতে থাকে, তখন সমাজে এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী তৈরি হয়, যাহারা হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগের জন্য উন্মুক্ত থাকে। বাংলাদেশ সেই অবস্থায় উপনীত হইয়াছিল বলিয়াই বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

কিন্তু টিকার ঘাটতিই একমাত্র কারণ নহে। আরো গভীরে রহিয়াছে অপুষ্টির নির্মম বাস্তবতা। শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা জিয়াউল ইসলাম এবং ভাইরোলজিস্ট খন্দকার মাহবুবা জামিল উভয়েই ইতিপূর্বে বলিয়াছেন যে, অপুষ্ট শিশুর শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে। ফলে, টিকা দেওয়ার পরও পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হইতে সময় লাগে। বাংলাদেশে গত কয়েক বৎসরে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক চাপ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাসের অবনতি শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করিয়াছে। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করিয়াছেন-মায়ের অপুষ্টি ও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার হ্রাস। জন্মের পর মাতৃদুগ্ধ শিশুর প্রথম প্রতিরক্ষা বলয়। সেই বলয় দুর্বল হইলে সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। একটি দিক লক্ষণীয়: হামে আক্রান্তদের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি বলিয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বহু পরিবার হাসপাতালে যায় না, অনেকেই ব্যক্তিগত চিকিৎসকের পরামর্শ লয়। ফলে প্রকৃত সংক্রমণ যদি সরকারি সংখ্যার তুলনায় বহুগুণ বেশি হয়, তাহা হইলে পরিস্থিতি আসলে আরো ভয়াবহ। সরকার ইতিমধ্যে গণটিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করিয়াছে এবং লক্ষ্যমাত্রার চাইতেও বেশি শিশুকে টিকা প্রদান করিতে সক্ষম হইয়াছে। ইহা অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু কেবল টিকা দিলেই সংকট শেষ হইবে না। প্রয়োজন শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা, প্রান্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনর্গঠন, অপুষ্টি মোকাবিলা, মাতৃদুগ্ধপান উৎসাহিত করা এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক গবেষণা।

হামের এই ভয়াবহতা আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিতেছে। জনস্বাস্থ্য কেবল হাসপাতালের শয্যা বা ঔষধের প্রশ্ন নহে। ইহা পুষ্টি, প্রতিরোধ, তথ্যব্যবস্থা, সামাজিক সচেতনতা এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার সমন্বিত ফল। ৬৬৬ শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিসংখ্যান নহে-ইহা রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি একটি সতর্কবার্তা। যদি আমরা এই সংকটের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান না করি, তাহা হইলে আজকের হাম কাল অন্য কোনো রোগের রূপ ধরিয়া পুনরায় আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়িবে। তখন হয়তো প্রশ্নটি আবারও উঠিবে-মৃত্যুগুলি কি সত্যিই অনিবার্য ছিল? আরো একটি অনিবার্য প্রশ্ন উচ্চারণ করিতেই হয়-হামের এই ভয়াবহতা আমাদের যে কঠিন শিক্ষা দিতেছে, তাহা কি আমরা ঠিকমতো গ্রহণ করিতেছি?

ইত্তেফাক/এএম