প্রস্তুতি এখনই স্কুলে প্রথম দিন
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৫১
শিশুদের সৌন্দর্য চিরন্তন। আজকের কুঁড়িরাই আগামীর প্রস্ফুটিত ফুল। এরাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যত্। একটি শিশুর বেড়ে ওঠাকে নিশ্চিত করতে এবং সমাজের মূলস্রোতে তাদের অভ্যস্ত করে তুলতে অভিভাবকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে শিশুর প্রথমদিনের স্কুলে যাওয়ার ব্যাপারটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ, কেননা পড়াশোনার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর সময়টি শিশুর মানসিকতার উপরে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। তাই এবার আপনার সন্তানের প্রথমদিনের স্কুলের অভিজ্ঞতাকে আরও সহজতর করে তোলার নানা উপায় নিয়ে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার
স্কুলের প্রথম দিনেই কেঁদেকেটে অস্থির মাহিন। বাবা-মা বাসা ছেড়ে কিছুতেই নতুন জায়গায় একা থাকতে রাজি না। বাবা-মা দুজনই চাকরি নিয়ে ব্যস্ত। ফলে জীবনের প্রথম স্কুল তার জন্য হয়ে উঠেছে ভীতিকর এক অভিজ্ঞতা। রোল কলে প্রেজেন্ট দিতে পারেনি। পিটিতে অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর হুড়োহুড়িতে পড়ে জামা-কাপড় নষ্ট করেছে। ক্লাসটিচার পরিচয় জানতে চাইলে হা করে তাকিয়ে ছিল। সবাই হেসেছে। মাহিনের মতো অনেক শিশুকেই এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। কিন্তু একটু পূর্ণ প্রস্তুতি থাকলেই কিন্তু সন্তানের জীবনের প্রথম স্কুল দিনটিকে করে তুলতে পারেন আনন্দময়। সন্তানকে আদর যত্নে বড় করে তুলেছেন। এখন স্কুলে যাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিতে যদি সহায় না হন, তবে মাহিনের মতো আপনার সন্তানও স্কুলে যেতে চাইবে না। তাই আগেই জেনে নিন সন্তান প্রথম স্কুলে যাওয়ার আগে আপনার প্রস্তুতি।
শুরু
শিশুর স্কুল ভর্তি শেষ হলেও ক্লাস শুরু হয়নি। হঠাত্ করে ভিন্ন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে তার সময় লাগবে। তাকে সেই সময়টুকু দিন। আগে থেকেই কিছু অভ্যাস গড়ে তুলুন। পরিবার শিশুর প্রথম শিক্ষালয়। স্কুলে পাঠানোর আগে বর্ণমালা, গণনা, সাতটি বারের নাম (বাংলা ও ইংরেজি), মাসের নাম, জাতীয় প্রতীক, পশুপাখি ও ফুলের নাম শেখান। খেয়াল রাখতে হবে এই শেখানোটাও যেন হয় আনন্দময়। মজার মজার ছড়া, গল্প, রূপকথার গল্প ইত্যাদি প্রতিদিন সময় করে পড়ে শোনান। শুনতে শুনতেই শিশুর ছড়া মুখস্ত হয়ে যাবে। মুখস্থ ছড়া অন্যকে শোনাতে বলুন। এতে শিশু প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও পরে উত্সাহী হবে। শিশুর সঙ্গে তার স্কুলের গল্প করুন। যাতে সে স্কুলে যেতে আগ্রহী হয়। স্কুল শুরু হওয়ার আগেই তাকে স্কুলে নিয়ে যান। তার স্কুলটি ঘুরিয়ে দেখান। পরিচয় করিয়ে দিন শিক্ষকদের সঙ্গে। খেলার মাঠ কিংবা দোলনা দেখিয়ে তাকে উত্সাহিত করুন। এতে শিশু পরিচিত হয়ে উঠবে স্কুলের নতুন পরিবেশে। সম্পূর্ণ অপরিচিত ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আপনার সন্তান গোমরামুখে ক্লাস করছেন দৃশ্যটা ভাবুন। এই কষ্টের হাত থেকে বাঁচতে হলে আগেভাগেই সন্তানকে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয় করানোর উদ্যোগ নিতে পারেন। স্কুল থেকে ফোন নম্বর নিয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের ফোন করে সকলের একটা ‘গেট-টুগেদার’ করাতে পারেন। এতে স্কুল শুরু হওয়ার আগেই সে পেয়ে যাবে বন্ধু। স্কুল শুরুর আগে বাচ্চাকে তার দৈনন্দিন রুটিনের পরিবর্তে স্কুলের সময়সূচি অনুযায়ী একটি রুটিন করে দিন। যাতে স্কুল শুরু হওয়ার আগেই সে নতুন সময়সূচিতে অভ্যস্ত হতে পারে। স্কুলে যাওয়ার আগে সন্তানকে তার নাম, বাবা-মায়ের নাম, বাড়ির নম্বর, ফোন নম্বর মুখস্থ করিয়ে দিন। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কাজে লাগাতে পারবে। এ ছাড়াও ওর রোল নম্বর, সেকশন মুখস্থ করিয়ে দিন। শিক্ষকদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে হবে কীভাবে, রোল কল করলে প্রেজেন্ট কল করতে হবে কীভাবে কিংবা কীভাবে নতুন বন্ধু তৈরি করতে হবে—সে বিষয়েও দিতে পারেন ধারণা। অনেক সময় বাচ্চারা বাথরুমে যাওয়ার বিষয়টি বলতে লজ্জা পায়। শিশুকে বলেন, বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেই সে যেন শিক্ষককে জানায়। টিফিন পিরিয়ডে ওর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে আগেভাগেই স্কুলের টিফিনের সময় মেনে তাকে খেতে দিন। তাহলে স্কুলে টিফিন খেতে তার সমস্যা হবে না। সন্তান বাইরের পরিবেশে যাচ্ছে। তাকে নিতে হবে অনেক দায়িত্ব। ফলে ওর নিজের কাজ নিজেকেই করতে উত্সাহিত করুন। জুতার ফিতা কিংবা ড্রেস পরা একবার আপনি দেখিয়ে দেওয়ার পর ওকেই প্র্যাকটিস করতে বলুন। এতে সে নিজে নিজেই শেখার আনন্দ পাবে। আপনিও হবেন নির্ভার। স্কুলের সময়সূচি মাথায় রেখে রওনা দিন। যাতে ক্লাশ শুরু হওয়ার অন্তত পনের-বিশ মিনিট আগে পৌঁছানো যায়। এতে শিশু ক্লান্ত হবে না। বাড়ি ফেরার পর স্কুলের সব গল্প শুনবেন। অবশ্যই পরের দিনের হোম ওয়ার্কটা একসঙ্গে বসেই সেরে নেবেন।
স্কুল পরিচ্ছদ
স্কুল ড্রেস : জীবনের প্রথম স্কুল, প্রয়োজন নতুন ড্রেস। শুধু রাজধানীর স্কুলগুলো নয়, দেশের প্রায় স্কুলেই নির্দিষ্ট ড্রেস পরা বাধ্যতামূলক। একেকটি স্কুলে একেক কাপড়ের ড্রেস, যেমন সাদা-কালো, সবুজ, নীল ড্রেস। আর কাপড় সাধারণত সুতি, টেট্রন থার্টি ফাইভ বা সিক্সটি ফাইভ প্রতি গজ ৫০ থেকে ৭৫ ঢাকা, পপলিন গজ ৫০ থেকে ৮০ টাকা, প্যান্টের কাপড় কটন, সুতি, সেঞ্চুরি, প্রতি পিস ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা, সঙ্গে কাটিং রেট। এ ছাড়া দোকানে বিভিন্ন সাইজের রেডিমেড শার্ট ও প্যান্ট পাবেন ১৫০ থেকে ৩৭৫ টাকা পর্যন্ত।
স্কুল ব্যাগ :বাজারে বিভিন্ন কার্টুন সংবলিত ব্যাগ টম অ্যান্ড জেরি, স্পাইডারম্যান, সুপারম্যান, হারকিউলিস, ক্যাপ্টেন চরিত্রের বিভিন্ন সাইজের ব্যাগ পাবেন ১৫০ থেকে ৭৫০ টাকা পর্যন্ত।
জুতা :নতুন স্কুল, নতুন ড্রেস, নতুন ব্যাগের সঙ্গে জুতাটাও চাই নতুন। তা না হলে কী আর হয়। তবে ড্রেস যে কালারের হোক না কেন জুতা হবে সাদা কেডস, না হয় কালো সু। বিভিন্ন কোম্পানির এসব সাদা কেডস পাবেন ১৭৫ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত। এর সঙ্গে রয়েছে কাপড়ের জুতা ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত। কালো সু পাবেন ২৭৫ থেকে ৭০০ টাকায়।
টিফিন বক্স :সব মা-ই তার সন্তানকে স্কুলের টিফিন বাসা থেকে বানিয়ে দেন। এই টিফিন বহন করার জন্য চাই টিফিন বক্স। বিভিন্ন কালারের ও সাইজের এসব বক্স পাবেন ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। বিশুদ্ধ পানির জন্য দরকার পানির বোতল বা পানির ফ্লাস্ক। দাম পড়বে ৫০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত।
পেন্সিল বক্স :প্রথম ক্লাসের পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় পেন্সিল দিয়ে। আর এসব পেন্সিল ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন কালারের। এর সঙ্গে দরকার হয় রাবার শার্পনার, স্কেল ইত্যাদি। নানা রকমের ডিজাইনের কার্টুনখচিত এসব পেন্সিল বক্স হয় কাপড়ের, রাবারের ও প্লাস্টিকের। দাম পড়বে ৫০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত।
কোথায় পাবেন :আপনার সন্তানের স্কুল উপকরণের জন্য যেতে পারেন বিভিন্ন মার্কেটে, বিভিন্ন স্টেশনারির দোকানে ও মেগাশপগুলোতে। সেখান থেকে আপনার পছন্দমত চাহিদা অনুযায়ী এসব কালেকশন করতে পারেন।
কিছু পরামর্শ
আমরা জানি, পায়ে হেঁটে চলা সবচেয়ে নিরাপদ। গাড়িতে চড়ার চেয়ে স্বল্প দূরত্বে পায়ে হেঁটে আপনি এবং আপনার সন্তান চলুন। লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। সুযোগ থাকলে সাইকেলে করে বাচ্চাকে স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন।
ফুটবল, টেনিস, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলাধুলা করতে দিন। সম্ভব হলে এসব সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করে দিন।
শিশুরা স্বভাবতই চঞ্চল হয়। তারা খেলতে, দৌড়াতে পছন্দ করে। কিন্তু আমাদের বিধি-নিষেধের ফলে তারা ধীরে ধীরে স্বভাবজাত অভ্যাসগুলো হারিয়ে ফেলে। যার দরুন অতিরিক্ত ওজনের অধিকারী হয়, এই সকল দিকে আমাদের নজর দেওয়া উচিত।
ছোট বাচ্চাদের সবসময় কোলে না রেখে নামিয়ে দিন। এতে সে হাত-পা নাড়বে এবং খেলতে পারবে যাতে ব্যায়াম হবে।
স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে উত্সাহিত করুন। নাশতা অথবা দুপুরের খাবার হিসেবে ফলমূল এবং শাক-সবজি দিন। বিভিন্ন ধরনের সালাদ দিন।
চকলেট, স্ন্যাক্স, ফাস্টফুড, কোমল পানীয়ের ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে তুলে ধরবেন এবং এসব খাওয়া থেকে বাচ্চাদের বিরত রাখবেন।