ট্রাফিক সিগন্যালের কার্যকারিতা

রাজধানীতে ট্রাফিক সিগন্যাল এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতেই চলিতেছে। যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রধান প্রধান সড়কে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতির ব্যবস্থা থাকিলেও তাহার সুষ্ঠু ব্যবহার পরিলক্ষিত হইতেছে না। বাতি থাকার পরও হাত নাড়িয়া সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করিতেছেন ট্রাফিক পুলিশ। কোথাও কোথাও বাতি জ্বলেই না ঠিকমত। কেননা বাতিগুলি নষ্ট অথবা সিগন্যালে বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হয় না। কোন কোন মোড়ে সিগন্যাল বাতি একেবারে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। এদিকে ম্যানুয়েল পদ্ধতির ট্রাফিক সিগন্যালে বৈষম্য প্রদর্শন করা হইতেছে বহু ক্ষেত্রে। ভুক্তভোগী লোকের এমন অভিযোগের অন্ত নাই। যেমন পাবলিক বাসের চাইতে প্রাইভেট গাড়িকে বেশি সুযোগ দেওয়া হইতেছে। কোন কোন জায়গায় ১৫ মিনিটে সিগন্যাল পড়িতেছে ৬টি। বলাবাহুল্য, এইভাবেও বাড়িতেছে জনদুর্ভোগ। সিগন্যাল ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে বাস কিংবা প্রাইভেট চালকরাও আজকাল স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি মানিয়া চলিতে অনিচ্ছুক। বেকায়দায় না পড়িলে তাহারা খেয়ালখুশি মতই যাতায়াত করেন। রাজধানীতে সিগন্যাল ব্যবস্থা পাকিস্তান আমল হইতেই আছে। মাঝে-মধ্যে সংস্কার বা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে। সর্বশেষ ২০০৫ সালে শুরু হওয়া স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক প্রকল্প শেষ হয় ২০০৯ সালের নভেম্বরে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গৃহীত এই প্রকল্পে ব্যয় হয় ২৫ কোটি টাকা। ইহার আওতায় ৫৯টি সড়কের মোড়ে এ ধরনের আধুনিক বাতির ব্যবস্থা করা হয়। পিক অফ-পিক সময় বিবেচনা করিয়া নির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া হয় বিভিন্ন রুটের ট্রাফিক সিগন্যালের সময়সূচি। নূতন এই পদ্ধতি চালুর ক্ষেত্রে বেশ কয়েকবার প্রচারণা ও এমনকি ট্রাফিক আইন মানিয়া চলার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা হয়। কিন্তু এই উদ্যোগটি যে কার্যকর হয় নাই তাহা এখন বেহাল দশা দেখেই উপলব্ধি করা যাইতেছে। ফলে আবার যেইকার সেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। ইহাতে ট্রাফিক আইন মানিয়া চলার ক্ষেত্রেও সকলের গাছাড়া ভাব দেখা যাইতেছে। ট্রাফিক সিগন্যালের এই সামগ্রিক ও বিরূপ পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা বহাল রাখার ক্ষেত্রেও প্রশ্ন দেখা দিয়াছে। অনেকে মনে করেন, বাহিরের উন্নত দেশে এই স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতিগুলি অধিক কার্যকর। কেননা সেখানে গাড়ি-ঘোড়ার চাপ কম এবং নাগরিকদের আইন মানার প্রবণতা বেশি। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে যানবাহনের চাপ এতই বেশি যে, অনেক সময় ম্যানুয়েল পদ্ধতিই অধিক কার্যকর ও যানজট নিরসনে তুলনামূলকভাবে সফল। এখন প্রশ্ন হইল, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের সময় পরামর্শদাতা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা বিষয়টি কেন উপলব্ধি করিতে পারিলেন না? ইহাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয়ের বিষয়টিও অস্বীকার করা যায় না। এখন আমাদের বক্তব্য হইল, হয় অকেজো সিগন্যাল বাতিগুলি যথাযথভাবে কার্যকর করিতে হইবে অথবা ইহা একেবারে উঠাইয়া দিতে হইবে। বাতিগুলি কার্যকর করিতে হইলে সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীদের তত্পরতা বাড়াইতে হইবে। আবার রাজধানীতে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি দিলে ঢাকার বাহিরের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলিতেও আধুনিক ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে হইবে। নতুবা ঢাকার বাহির হইতে আসা লোকজন অনভ্যস্তবশত আইন ভঙ্গ করিবে ইহাই স্বাভাবিক। তাই ট্রাফিক ব্যবস্থা ও আইন-কানুন সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির প্রচেষ্টাও অব্যাহত রাখিতে হইবে।