অলস সময়ে ফেসবুক স্ক্রল করছিলাম। হঠাৎই কয় দিন আগের একটা খবরে চোখ আটকে গেল। বরিশালের উজিরপুর পৌরসভায় বাঁশ ও সুপারিগাছ দিয়ে তৈরি একটি অস্থায়ী সাঁকো লাল ফিতা কেটে উদ্বোধন করেছেন সরকারি দল বিএনপির স্থানীয় একজন নেতা। একে তো বাঁশের সাঁকো, তাও আবার অস্থায়ী! আগ্রহ নিয়ে খবরটা পড়লাম। উদ্বোধন উপলক্ষ্যে সাঁকোটি ফুল ও বেলুন দিয়ে সাজানো হয়; ফিতা কাটার পাশাপাশি করা হয় ঢোল- বাদ্য ও বয়াতিদের গান পরিবেশনেরও ব্যবস্থা। সবশেষে উপস্থিত নারী-পুরুষের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ তো আছেই। বিষয়টা আমার কাছে বেশ আগ্রহোদ্দীপকই মনে হলো। বিশেষ করে লাল ফিতার ব্যাপারটি।
ফিতা তো কত রঙেরই হয় বা হতে পারে; সাদা, হলুদ, সবুজ, গোলাপি, এমন আরো কত! কিন্তু ‘লাল ফিতা’ শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তার বস্তুগত দিকের চেয়ে রূপকার্থক দিকটি প্রধান হয়ে ওঠে। তখন সেটি আর ফিতা থাকে না, হয়ে ওঠে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতার প্রতীক। এ শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশ্ব জুড়েই এই লাল ফিতার আভিজাত্য আর দৌরাত্ম্য নিয়ে অসংখ্য বাস্তব এবং ব্যঙ্গাত্মক গল্প প্রচলিত আছে। আমি নিজে এই লাল ফিতার জগতে অনেকদিন বিচরণ করেছি। সে কারণেই হয়তো এই শব্দবন্ধটি শুনলে একধরনের নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ি। কাজ করতে গিয়ে যতটুকু জেনেছি ফাইলবন্ধনী হিসেবে লাল ফিতার প্রচলন হয় ১৬শ শতাব্দীতে। স্পেনের রাজা এবং পবিত্র রোমান সম্রাট পঞ্চম চার্লস তার বিশাল সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা আধুনিকীকরণ করতে জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নথিগুলোকে সাধারণ নথি থেকে আলাদা করার জন্য লাল ফিতা দিয়ে বেঁধে রাখার নির্দেশ প্রদান করেন।
সাধারণ নথিগুলো বাঁধা হতো সাধারণ দড়ি দিয়ে। স্পেনের অনুসরণে পরবর্তীতে ১৬শ শতাব্দীর শেষভাগে এবং ১৭শ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী ও করণিকরা আইনি ও দাপ্তরিক নথিপত্র সুরক্ষিত ও সংগঠিত রাখতে লাল কাপড়ের ফিতা ব্যবহার শুরু করেন। সময়ের সাথে সাথে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটলে ১৮শ ও ১৯শ শতাব্দীতে সরকারি অফিসগুলোতে লাল ফিতা দিয়ে বাঁধা ফাইলের স্তূপ জমতে থাকে। ফাইল খোলার জন্য তখন আক্ষরিক অর্থেই লাল ফিতা কাটতে হতো, যা কাজের গতিকে শ্লথ করে দিত। এ নিয়ে সেসময়ে অনেকের মাঝে অসন্তোষ কাজ করতযার প্রতিফলন দেখা যায় অনেক লেখকের লেখায়।
১৮৫০ সালের দিকে স্কটিশ লেখক থমাস কার্লাইল এবং বিখ্যাত ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্স তাদের লেখায় সরকারি নিয়মকানুনের অন্ধ অনুকরণকে ব্যঙ্গ করতে ‘লাল ফিতা’ শব্দটিকে একটি নেতিবাচক আমলাতান্ত্রিক রূপক হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলেন। চার্লস ডিকেন্স তার ডেভিড কপারফিল্ড (১৮৫০) উপন্যাসে জন্মভূমি ব্রিটেনকে এক নারীরূপে কল্পনা করে লিখছেন :‘ব্রিটানিয়া, সেই হতভাগী নারী, সর্বদা আমার সামনে থাকে, একটি বাঁধা মুরগির মতো :অফিসের কলম দিয়ে বিদ্ধ, এবং লাল ফিতা দিয়ে হাত-পা বাঁধা।’ আমাদের এই উপমহাদেশেও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। এমনি এক গল্পে আছে, ভারতের এক সরকারি দপ্তরের এক কেরানির একটি পেনসিল ভেঙে যাওয়ায় নতুন একটি পেনসিলের দরকার পড়ে। সেজন্য সে স্টোর রুম ইনচার্জের দ্বারস্থ হয়। স্টোরকিপার এ বিষয়ে একটি ফাইল খোলেন। ফাইলটি বিভিন্ন টেবিল ঘুরে, ২২ জন কর্মকর্তার স্বাক্ষর নিয়ে অবশেষে অনুমোদন পায়। ততদিনে তিন মাস পার হয়ে গেছে এবং পেনসিলের দামের চেয়ে ফাইলের কাগজের খরচ বেশি হয়েছে। উত্তর প্রদেশের লাল বিহারীর গল্পটি আরো মজার। ভুলবশত সরকারি কোনো কাগজে লাল বিহারীকে মৃত বলে উল্লেখ করা হয়। এটিকে সংশোধন করে নিজেকে জীবিত প্রমাণ করার জন্য তিনি আদালতে এক মামলা ঠোকেন। দীর্ঘ ১৯ বছর আইনি লড়াইয়ের পর লালবিহারী প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে, তিনি মারা যাননি। এই লাল ফিতার দৌরাত্ম্যের কারণে তিনি নিজের নাম বদলে রেখেছিলেন ‘লাল বিহারী মৃত’। আসা যাক ফিতা কেটে সাঁকো উদ্বোধনের কথায়। আধুনিক ইতিহাসে প্রথম বড় আকারের ফিতা কাটার অনুষ্ঠান হয়েছিল ১৮১৭ সালে নিউ ইয়র্কের এরি খালের উদ্বোধনে।
এরপর ১৯ শতকের শেষের দিকে ১৮৯৮ সালে আমেরিকার লুইজিয়ানারেললাইন উদ্বোধনের মাধ্যমে এটি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পায়। ব্রিটিশ শাসনামলে এই ধারাটি ভারতীয় উপমহাদেশে যার মধ্যে বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত ছিল প্রবেশ করে। তৎকালীন ভাইসরয়, গভর্নর বা জমিদাররা বড় কোনো স্থাপনা, সেতু বা রেললাইনের কাজের শুরুতে এবং শেষে এ ধরনের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করতেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ সেতুর কথা মনে করা যেতে পারে। পদ্মা নদীর ওপরন নির্মিত এই ঐতিহাসিক ব্রিজটি ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন করেন অবিভক্ত ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ যার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দেশ পুনর্গঠনের যুগে বড় বড় সেতু, কালভার্ট, এবং সরকারি ভবনের ফলক উন্মোচন ও ফিতা কাটার সংস্কৃতি এক নতুন মাত্রা পায়। আশির ও নব্বইয়ের দশক থেকে এটি বাংলাদেশের একটি নিয়মিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং প্রচারণার
অংশ হয়ে দাঁড়ায় এবং সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধনে ফিতা কাটা একটি নিয়মিত আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। এর আগে যেখানে সাধারণত বড় প্রকল্প উদ্বোধনের বেলায় আনুষ্ঠানিকতা করা হতো, কালক্রমে গ্রামের পায়েচলা রাস্তা কিংবা কালভার্ট উদ্বোধনেও আড়ম্বরপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতার প্রচলন ঘটতে থাকে। উল্লেখ্য, পাকিস্তান আমলে এবং স্বাধীন বাংলাদেশেও প্রথম দিকে মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) বা জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) ছিলেন নিজ নিজ এলাকার সর্বেসর্বা। সে সময়ে স্থানীয় ছোট-বড় রাস্তা, সেতু, স্কুল বা কালভার্ট উদ্বোধনে তাদেরই প্রধান অতিথি করা হতো, তারাই এই সব উদ্বোধন করতেন।
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝিতে মহকুমা ব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়া এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিস্তৃতির পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা বৃদ্ধি পায়।
এখন যে কোনো ছোট-বড় প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বা উদ্বোধনে স্থানীয় সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীরাই প্রধান অতিথি থাকেন। এই পরিবর্তনটি মূলত শাসনব্যবস্থার আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা থেকে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে ধাবিত হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও, বাস্তবে তা দলীয় কর্তৃত্ববাদকেই সংহত করছে যার ফল অনেক সময়ই ইতিবাচকতার ইঙ্গিত বহন করে না। মহকুমা প্রশাসক বা জেলা প্রশাসকদের হাত থেকে ফিতা কাটার ক্ষমতা যখন জনপ্রতিনিধিদের হাতে গেল, তখন থেকে এটি রাজনৈতিক প্রচারের একটি হাতিয়ারে পরিণত হলো। অতি ব্যবহারের ফলে সেই হাতিয়ারের লক্ষ্যবস্তুও ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর প্রকল্পে নেমে আসছে এ যেন এক স্বাভাবিক পরিণতি। একটা সময় যেখানে পদ্মার বুকে হার্ডিঞ্জ সেতুর মতো সাম্রাজ্যিক কীর্তি উদ্বোধনেই কেবল ফিতা কাটা হতো, আজ সেখানে একটি অস্থায়ী বাঁশের সাঁকোও ঢোল- বাদ্য, ফুল-বেলুন আর মিষ্টি বিতরণের আয়োজনে উদ্বোধন করতে হয়। এখানেই লাল ফিতা আর ফিতা কাটার গল্প দুটো এসে এক বিন্দুতে মিলে যায়।
একদিকে লাল ফিতা প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রতার যেখানে একটি পেনসিল বদলাতেও তিন মাস আর ২২ জন কর্মকর্তার স্বাক্ষর লাগে, অন্যদিকে ফিতা কাটা হয়ে উঠেছে অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমকের প্রতীক যেখানে কয়েক দিনের আয়ু নিয়ে তৈরি একটি অস্থায়ী বাঁশের সাঁকোও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের মর্যাদা পায়। দুটোই আসলে একই মুদ্রার এপিঠ- ওপিঠ :প্রকৃত কাজের চেয়ে কাজের প্রদর্শনী, বাস্তবতার চেয়ে আনুষ্ঠানিকতাকে বড় করে দেখার এক প্রবণতা। লাল ফিতায় বিলম্বিত হয় কাজ শুরু হওয়ার আগেই, আর ফিতা কাটায় উদ্ধসঢ়;যাপিত হয় এমন কিছু, যার স্থায়িত্ব হয়তো সেই ফিতারই সমান। উজিরপুরের সেই বাঁশের সাঁকোটি হয়তো আর কিছুদিন পরেই ভেঙে পড়বে, নতুন করে বাঁধতে হবে। কিন্তু তার উদ্বোধনের স্মৃতি হিসেবে রয়ে যাবে একটি খবর, কিছু ছবি, আর লাল ফিতার একটি টুকরোযা শেষ পর্যন্ত মনে করিয়ে দেবে আমাদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিতা, বিশেষ করে লাল ফিতা, কত শক্তিশালী।
লেখক: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

