দু ই প্র জ ন্ম

ব্যাংকিং খাতের দু’জন

একই পেশার দুই প্রজন্মের দুই ব্যক্তিত্বকে নিয়ে আমাদের এবারের আড্ডা বসেছিল একটি মনোরম ইন্টেরিয়রের মাঝে। আলোচনায় অংশ নিয়েছেন ব্যাংকিং সেক্টরের সফল একজন মো. গিয়াসউদ্দীন পিন্টু এবং তার গুরু মো. আফাজ উদ্দীন। দুই প্রজন্মের নানা ধ্যানধারণাসহ তাদের শুরুর গল্পগুলোই ছিল আড্ডার প্রাণোচ্ছল অংশ। তাই শুরুতেই গুরু মো. আফাজ উদ্দীনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম তার শুরুর গল্পটি। উত্তরে তিনি বলেন, ‘বর্তমান পেশায় একজন আইনজীবী হলেও আমার শুরুটা ঘটে ব্যাংকিং দিয়ে, আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ফিন্যান্সিয়াল ব্যাংকিংয়ে অনার্সসহ মাস্টার ডিগ্রি পাস করি। সেখান থেকেই আমার সিটি ব্যাংকে অফিসার হিসেবে যোগদান, সেখানেই আমার গিয়াসউদ্দীন পিন্টু সাহেবের সাথে পরিচয়। ব্যাংকে ছিলাম আমি সাত বছর, হেড অফিস অ্যাডভান্স ডিভিশনে ছিলাম চার বছর, আর বেগম বাজার ব্রাঞ্চে ছিলাম তিন বছর। তারপর নিজের ক্যারিয়ারের একটু ভিন্নতা আনার জন্যই ব্যাংকে চাকরির পাশাপাশি ল-তে ভর্তি হই এবং ল-এ পড়াশোনা শেষ করি। তারপর ব্যাংকের অন্যান্য সিনিয়রদের পরামর্শে আমি ব্যাংকের চাকরির পরিবর্তে আইনজীবী হিসেবে কর্ম পরিকল্পনা করি। এ ছাড়া আমার আত্মীয়জন খলিলুর রহমান, তিনিও একজন আইনজীবী, তিনিই আমার এই পেশায় গুরু, তার কাছেই আমার হাতে খড়ি। তার উত্সাহে আমি ১৯৯৭ থেকে এই আইনজীবী পেশায় আছি। এ ক্ষেত্রে একজনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেই হয়, সিটি ব্যাংকের তত্কালীন ডিমডি নাজমুল কাদের সাহেব একদিন আমাকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘আমাদের একজন প্যানেল ল-ইয়ার দরকার যিনি ব্যাংকিংও বুঝেন কোর্টও বুঝেন, সে ক্ষেত্রে আপনি একটা সিভি জমা দেন।’ তারপর থেকেই আমি সিটি ব্যাংকের প্যানেল ল-ইয়ার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হই। সেই থেকেই মূলত শুরু। আমি প্রথমে জর্জ কোর্টের অ্যাডভোকেট ছিলাম। তারপর দু’বছর পর সুপ্রিম কোর্টে তালিকাভুক্ত হই। আমার আইনজীবী পেশায় আসার সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা আমি পেয়েছি আমার অর্ধাঙ্গিনী বুলবুলি রহমানের কাছ থেকে। আমার এক মেয়ে নিপা আফরোজ (অন্তরা) ও এক ছেলে ফয়সাল রহমান (অনিক), মূলত এই নিয়েই আমার পারিবারিক আবহ।’ তারপরই জানতে চেয়েছিলাম গিয়াসউদ্দীন পিন্টুর সাথে তার পরিচয়ের গল্পটি, জবাবে মো. আফাজউদ্দীন বলেন, ‘ব্যাংকে কাজ করার সময়ই গিয়াসউদ্দীন পিন্টুর সাথে আমার পরিচয়। সময়টা তার ব্যাংকার জীবনের প্রথম দিকের কথা, তখন তাকে ব্যাংকের কাজে উপযুক্ত করে গড়ে তোলার দায়িত্বটি অফিসিয়ালি আমাকে নিতে হয়েছিল। আমি বরাবরই তাকে দেখেছি একজন মেধাবী, বিনয়ী, সত্, আত্মপ্রত্যয়ী অফিসার হিসেবে। আমি দেখেছি কাজ শেখার মানসিকতা তার মধ্যে ছিল প্রচণ্ড। যেকোনো কাজই দু-একবার বুঝিয়ে দিলে তা সে অনায়াসেই সফলভাবে শেষ করতে পারত। আমি চেষ্টা করেছি তাকে অনুপ্রেরণা দিতে, আমার প্রতি তার কৃতজ্ঞতাবোধ, বিনয়ী ভাব সব সময়ই আমাকে মুগ্ধ করেছে। এ ছাড়া চাকরির পাশাপাশি টিভি নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে সে মানুষের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে। মোট কথা তার মেধা ও নিরলস প্রচেষ্টার জন্য নতুন প্রজন্মের জন্য তিনি একজন মডেল। আমি তার ও তার পরিবারের সমৃদ্ধি সব সময়ই কামনা করি।’ যথারীতি চলে আসি গিয়াসউদ্দীন পিন্টুর কাছে, জানতে চেয়েছিলাম তার শুরুর গল্পসহ মো. আফাজউদ্দীনের সাথে তার পরিচয় সময়ের কিছু স্মৃতিকথা, উত্তরে পিন্টু বলেন, ‘আমার জন্ম হয় ঢাকার কেরানীগঞ্জে, গ্রামের নাম কালীগঞ্জ। আগে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি আমি একজন ব্যাংকার হবো। আসলে আমার জীবনের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল না। আমার এই এলোমেলো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আবেগগুলোকে সাথে নিয়ে একসময় দেখা গেল আমি টিভি নাটকেও অভিনয় করেছি। আমাদের পরিবারের সকলেরই পেশা ব্যবসা, শুধুমাত্র আমিই একজন চাকরজীবী। আমার জীবনে বরাবরই বাবার প্রভাব অনেক বেশি ছিল। বাবা মাঝে মাঝে ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার জন্য পাঠাত। তখন দেখতাম, ওখানে প্যান্ট-শার্ট-টাই পরা একটি চকচকে ভাব নিয়ে সবাই বসে আছে, ব্যাপারটা আমার অনেক ভালো লাগত। মার্কেটিংয়ে পড়াশোনা করি এবং সেই থেকেই ব্যাংকিংয়ের সাথে আমি সম্পৃক্ত। আমি প্রথমে যোগ দিই সিটি ব্যাংকে। সত্যিকার অর্থে আমি যখন ব্যাংকিং পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত হই, তখন আমাকে পোস্টিং দেওয়া হয় সিটি ব্যাংক বেগম বাজার ব্রাঞ্চে। তো প্রথমদিন যখন আমি ব্যাংকে জয়েন করলাম, তখন আমার মাঝে একপ্রকার ভীতি কাজ করছিল। তারপর সবার সাথে পরিচয় শেষে আমার ম্যানেজার সাহেব আমাকে কাজ শেখার দায়িত্বটা দিলেন আমার বড় ভাই এবং গুরু আফাজ উদ্দীন সাহেবকে। তখন থেকেই তার সান্নিধ্যে আমার কাজ করা এবং কাজ শেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। পরবর্তীকালে কাজ করতে করতে তার সাথে আমার যে সম্পর্ক ছিল তা অনেকটা পারিবারিক আবহের মধ্যে চলে আসে। ওই সময় তিনি আমাকে হাতে ধরিয়ে শিখিয়েছিলেন ব্যাংকিং সেক্টরের অ-আ-ক-খ, সেই সাথে আমার ব্যক্তিগত জীবনেও অন্যতম পরামর্শদাতা হিসেবে ছিলেন। তার কাছ থেকেই আমি ব্যাংকিংয়ের টোকেন স্ক্রল থেকে শুরু করে ফরেন এক্সচেঞ্জ, অ্যাডভান্স, জেনারেল ব্যাংকিং সবই শিখেছি। আফাজ ভাই-ই আমার মাঝে লক্ষ্য গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। আমার ব্যাংকিং ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে আরেকজনে নাম না বললেই নয়, সিটি ব্যাংকে চাকরি করার সময় সিটি ব্যাংকের ফরমাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন আব্বাস উদ্দীন আহমেদ, তিনি জানতেন ছেলেটা নাটক করে বেড়ায় কাজের প্রতি খুব বেশি সিরিয়াস না। তখন হঠাত্ করেই তিনি একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তার একজন সেক্রেটারি দরকার, ওই জায়গাটায় আমাকে ট্রান্সফার করে নিলেন। তারপর তার সান্নিধ্যে আমি নয় মাস কাজ করি, সেখান থেকেই আমি সিদ্ধান্ত নিই আমি ব্যাংকেই কাজ করব।’ এই প্রজন্ম সম্পর্কে আফাজ উদ্দীনের মূল্যায়ন এবং নতুন ব্যাংকারদের প্রতি তার পরামর্শ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগে একটা সময় ছিল সিগনেচার করতে পারলেই একজন মানুষকে শিক্ষিত বলে গণ্য হতো। কিন্তু এখন একজন মাস্টার ডিগ্রি পাস করা মানুষও যদি টেকনোলজির সাথে সম্পৃক্ত না হয় তাহলে তাকে সম্পূর্ণ শিক্ষিত বলা যাবে না। এই প্রজন্ম যথেষ্ট স্মার্ট এবং তারা বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ করছে। এখন যারা কাজ করছে তারা অনেক বেশি টেকনোলজির সহায়তা গ্রহণ করছে। এটা খুবই ভালো। কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে, সৃষ্টিশীলতা নিজ থেকে তৈরি করতে হবে এবং তথ্যপ্রযুক্তি এই সৃষ্টিশীলতাকে সার্পোট দেবে। তবে নতুনরা খুবই বুদ্ধিমান। তারা ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদিকে ব্যবহার করে অনেক অ্যাডভান্স কাজ করে। আর ব্যাংকিং চাকরি অনেক বেশি সিনসিয়ারলি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ভুল বা এতটুকু পরিমাণে অবহেলার কোনো জায়গা নেই। বর্তমানে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সহমর্মিতার মানসিকতা উঠে যাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে অবশ্যই ইন্টাররিলেশনশিপ বাড়ানো উচিত। নতুন যারা আসছে তাদের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ আর নতুন যারা ব্যাংকিং সেক্টরে আসছে তাদের সম্পর্কে মূল্যায়ন জানতে চাইলে গিয়াসউদ্দীন পিন্টু বলেন, ‘ব্যাংকিং সেক্টরে নতুন যারা আসছে, তারা অনেক মেধাবী। কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যাপারটি হচ্ছে এদের মাঝে ধৈর্য কম। একটি প্রবাদ আছে, Rome was not built in a day। আমরা এখন কথায় কথায় বলি প্রফেশনাল, আসলে প্রফেশনাল হওয়া ভালো কিন্তু অতি প্রফেশনাল হওয়া ভালো না। এ ক্ষেত্রে আমি নতুনদের বলব একটু সতর্ক দৃষ্টি রাখতে।’ এরপর ব্যাংকিং সেক্টরে নতুনদের আহ্বান এবং শুভ কামনা জানিয়েই আমাদের এই আড্ডার সমাপ্তি ঘটে। ছবি দীপঙ্কর দীপু