প্র জ ন্ম মু খ
বহুগুণী একজন
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:০৬
তিনি সব সময় চেষ্টা করেছেন ভিন্ন ধরনের কিছু করতে, নতুন কিছু করতে। যে কাজ কঠিন সেটা করতে এখনও তিনি ভালোবাসনে। এটা তার ভেতরে এমন এক অভ্যাসের জন্ম দিয়েছে যে, ডাক্তার হিনেবে যখন চিকিত্সা করেন, সহজ রোগের চেয়ে জটিল রোগের চিকিত্সা করতে বেশি আনন্দ পান। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সখ্যতা সেই ছোট বয়স থেকেই। স্কুলে দেয়াল পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন, স্কুল শেষ করার আগেই ‘ইত্তেফাক’সহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের ছোটদের বিভাগে কবিতা ও গল্প লিখেছেন। এখন দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’-এর স্বাস্থ্য পাতার সম্পাদনা করছেন। বহুমুখী প্রতিভার এই মানুষটির নাম মুজাহিদুল ইসলাম আকাশ, তাকে নিয়ে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার
ছেলেবেলায় ক’জনই বা বই পড়তে ভালোবাসেন? অথচ আকাশ ছিলেন সম্পূর্ণ অন্যরকম। তিনি বলছিলেন তার ছেলেবেলার কথা, ‘নতুন বইয়ের গন্ধ আমার ভালো লাগে। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করেই আমি পরের ক্লাসের বই কিনে পড়া শুরু করতাম। যতদিন বইয়ে নতুন নতুন গন্ধ থাকত, আমি পড়তাম। তা সে পাঠ্যবই হোক আর গল্পের বই হোক। এ কারণে নতুন ক্লাসে ওঠার আগেই সব সময় বই পড়া হয়ে যেত। ক্লাসে ভালো ফল হতো কোনো বাড়তি পরিশ্রম ছাড়াই। আমি পরীক্ষার আগের দিনও দিব্যি ঘুরে বেড়াতাম। বাড়িতে পড়াশোনার একটা পরিবেশ ছিল। বাবা পড়াশোনার ব্যাপারে এত কড়া ছিলেন যে, আমাদের সব ভাইবোনদের সামনে ছাত্র হিসেবে ভালো না হয়ে কোনো উপায় ছিল না। খারাপ কাজ বা কুসঙ্গে মেশার তো প্রশ্নই আসে না। মায়ের কাছ থেকে শিখেছি মানবিকতা। ধনী-গরিব সবাই যে সমান—একেবারে ছোটবেলা থেকেই এ বোধটি তাই তৈরি হয়েছে মনের গহীনে।’
ছোট্ট আকাশ দুষ্টু ঠিক ছিলেন না, তবে চঞ্চল ছিলেন। আর মাথায় সব সময় নতুন কিছু, ভিন্ন ধরনের কিছু করার চিন্তা থাকত। জীবনের শেষ দিনটিতেও মনের ভেতরে ভালো কিছু, নতুন কিছু করার আগ্রহ নষ্ট হবে বলে মনে হয় না। ছোটবেলায় বেশিরভাগ শিশু যখন পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখে, একটু বড় হয়ে দেখে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন, তখন তার স্বপ্ন ছিল লেখক বা রাজনীতিবিদ হওয়ার। তার মনে হয়, সমাজ ও দেশকে ভালো কিছুর দিকে বদলে দিতে লেখক বা রাজনীতিবিদ হলেই কাজ করার বেশি সুযোগ থাকে। প্রজন্মের এই চিকিত্সক ও লেখকের স্কুলজীবন কেটেছে প্রিয় শহর টাঙ্গাইলে। মডেল প্রাইমারি স্কুল হয়ে বিন্দুবাসিনী স্কুল। লেখালেখির সূত্রপাতটাও সেখানে। পঞ্চম শ্রেণীতে থাকার সময় একটি দৈনিক পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সখ্যতা সেই বয়স থেকেই। স্কুল শেষ করার আগেই ‘ইত্তেফাক’সহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের ছোটদের বিভাগে কবিতা ও গল্প লিখেছেন। তবে জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা হয়েছে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িয়ে। নতুন নতুন কত ভালো বই যে পড়ার সুযোগ হয়েছে! তার ফল হিসেবেই হয়তো পরপর তিনবার জেলা পর্যায়ে বইপড়া প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছেন। সেই বই পড়ার নেশাটা এখনও রয়েই গেছে তার।
নটরডেম কলেজের দিনগুলো তার জন্য খুব প্রেরণার। কীভাবে নিয়মের মধ্যে থেকে নিজেকে তৈরি করতে হয় সেটা নটরডেমে না পড়লে হয়তো শিখতেই পারতেন না। কলেজেও লেখাপড়ার পাশাপাশি যুক্ত ছিলনে অনেকগুলো কাজের সঙ্গে। নটরডেম অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মজার মজার বহু কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। এই কলেজে থাকার সময়ই সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’-এর বিশেষ সংখ্যায় তার গল্প প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে লেখালেখির সূত্র ধরেই সম্পাদক শফিক রেহমানের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ আসে। সাপ্তাহিক ও দৈনিক ‘যায়যায়দিন’-এ কাজ করেছেন অনেক বছর। সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’-এ ‘আলোয় ভুবন ভরা’ নামের কলামটি লিখেছেন বহুদিন। দৈনিক ‘যায়যায়দিন’-এ সম্পাদনা করেছেন স্পোর্টস অ্যান্ড ফিটনেস ম্যাগাজিন ও এন্টারটেইনমেন্ট বিভাগ। জাতীয় পর্যায়ে পত্রিকায় কাজ শুরু করেছিলনে অবশ্য ‘ভোরের কাগজ’ দিয়ে ১৯৯৬ সালে। কাজ করার সুযোগ হয়েছে বিবিসি-খ্যাত প্রয়াত সাংবাদিক আতাউস সামাদ, প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি শওকত মাহমুদ, আবেদ খান, ইমদাদুল হক মিলন প্রমুখ ব্যক্তিদের সঙ্গে। এখন দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’-এর স্বাস্থ্য পাতার সম্পাদনা করছেন। টেলিভিশনেও কাজ করেছেন তিন বছর। শফিক রেহমানের উপস্থাপনায় বিটিভিতে প্রচারিত ‘লাল গোলাপ’-এ যুক্ত ছিলেন। মেধাবী এই মানুষটি তার বহুমুখী কাজের প্রসঙ্গে বলেন, ‘যদিও আমি পেশাগত জীবনে একজন ডেন্টাল সার্জন কিন্তু পত্রপত্রিকার সঙ্গে একটা মনের সম্পর্ক সব সময়ই ছিল। তবে এর বাইরেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজ করার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। কমনওয়েলথের ইয়ুথ ফোরামের এশিয়া মহাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন দুই বছর। কমনওয়েলথের তত্কালীন মহাসচিব ডোনাল্ড সি ম্যাককিননসহ কাজ করেছেন কমনওয়েলথ ভুক্ত দেশগুলোর মন্ত্রী পর্যায়ের মানুষগুলোর সঙ্গে। কাজ করতে এবং বেড়ানোর অংশ হিসেবে তার দেখা হয়েছে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া, সাউথ আফ্রিকা, সিঙ্গাপুর, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বটসোয়ানার মতো দেশগুলো।
তিনি বিশ্বাস করনে, উদ্দেশ্য ভালো থাকলে, কাজে একাগ্রতা থাকলে, পরিশ্রম করতে পিছু পা না হলে যেকোনো কাজ সফলভাবে করা সম্ভব। স্বপ্ন দেখেন বহু কিছুর। ‘হয়তো এর সব করা হয়ে উঠবে না কিন্তু যদি সুযোগ পাই তাহলে একটা হাসপাতাল করতে চাই। যার সেবার মান হবে বিশেষায়িত কিন্তু খরচ হবে একেবারে সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে। জানি, কঠিন কাজ। কিন্তু আমি যে সারাজীবন কঠিনেরেই ভালোবেসেছি!’ বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন আকাশ।
ছবি দীপঙ্কর দীপু