দাম্পত্যে নয় কনকনে শীতে
প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:১৫
কে ফোন করেছিল? এতক্ষণ ধরে কী কথা হচ্ছিল? আজকে অফিসে তুমি কার সঙ্গে লাঞ্চে গিয়েছিলে? অফিস কলিগদের সাথে শপিংয়ে যাওয়ার কী দরকার ছিল? গতকাল মা ফোনে কী বলেছিল? ইত্যাদি ইত্যাদি... কী ক্লান্ত হয়ে পড়লেন! পড়ারই কথা, দাম্পত্য মানেই কী শুধু প্রশ্ন প্রশ্ন প্রশ্ন! নাকি দাম্পত্য মানে দু’জনের সম্মিলিত আস্থার জায়গা। বিয়ের পর হানিমুন তারপর কয়েক বছর প্রেম, তারপর? তারপরই কেমন জানি একঘেয়েমি, কিছুটা ক্লান্ত, অনেকটা বিরক্ত। তাই এ সকল সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই—ঘুরে দাঁড়ানো। সম্পর্কে নতুন মোড় গড়ার কিছু মন্ত্র নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার
এ কথা সত্য যে, চিরায়ত সুখ কিংবা প্রতিদিন সুখের সাগরে ভেসে যাওয়া কোনোটাই এই বাস্তবতার ইট-পাথরের ব্যস্ত শহরে দাম্পত্য জীবনে নিশ্চিত ঘটনা নয়। কিন্তু তাই বলে নির্জীব বস্তুর মতো দুটি মনের পাশাপাশি থাকা, একে অন্যের ভালো লাগার ক্রমাগত দূরত্ব তৈরি হওয়া, যন্ত্রনির্ভর সংসার জীবনে প্রতিদিন যান্ত্রিক সংলাপে নিজেদের ব্যস্ত করে তোলা ইত্যাদি নানা উপসর্গ আমাদের প্রতিনিয়ত শীতল দাম্পত্য জীবনে শীতার্ত দুঃখে দংশিত করে। ঋতু পরিবর্তনের এই অশুভ সময়ে নানা অসুখ যেমন দানা বাঁধে দেহের গভীরে তেমনি আধুনিক সময়ের এই ব্যস্ত ক্ষণে মনের কোণেও অশনি সংকেত উঁকি দেয় বারবার। একঘেয়েমি জীবন কিংবা একে অন্যের প্রতি ভালোবাসার পেলব টানের অভাব যদি কখনও দু’জনকে দূরে সরিয়ে দেয় তবে তা আপনাকে ভাবিয়ে তুলতে পারে এ কথা যেমন সত্যি; তেমনি শুধু ভাবনার জানালা খুলে ধরলেই নয়, বরং সেই জানালার বাইরে যে সুনীল আকাশ তার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলেই জীবনের এই শীতলতা থেকে মুক্তি মিলতে পারে। সম্পর্কে আন্তরিকভাবে সচেতন হওয়ার চেষ্টা করা, কিংবা দাম্পত্য জীবনে স্বাভাবিক পরিণতি থেকে নিজেদের আলাদা করতে স্বামী-স্ত্রীর উচিত নিজেদের মতো করে সময় বের করে নেওয়া। এমনকি নিজেদের লাইফস্টাইল বা ফ্যাশন চেতনায় পরিবর্তন আসতে পারে। পরিবর্তন আসতে পারে আউট ওয়ার্ড এপিয়ারেন্সের। এমনকি ঘরের বাতাসে যদি দমবদ্ধ ভাব তৈরি হয় তবে বদলানো যেতে পারে ঘরের ফার্নিচারগুলো কিংবা ঘরের পর্দায় আসতে পারে নতুনত্বের ছোঁয়া। হঠাত্ করে হয়তো বেড রুমে দেয়ালে লাগতে পারেন নতুন রং কিংবা একজন আরেকজনকে উপহার দিতে পারেন প্রিয় কোনো পোশাক, হাতঘড়ি, মানিব্যাগ বা পার্স। এ-তো গেল বাহ্যিক পরিবর্তন এমনকি মানসিক পরিবর্তনও আসতে পারে পুরোপুরি। যেমন নিজের অভিযোগগুলো চেপে না রেখে আচার-আচরণে কিংবা মুখ ফুটে সঙ্গীকে জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে। দু’জনেরই উচিত দু’জনকে প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করা আর ইতিবাচক পরিবর্তনকে ধারণ করা এবং নেতিবাচক পরিবর্তন সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া। এভাবেই অকারণেই সঙ্গীর কাছ থেকে দূরে থাকার জড় অবস্থার অবসান ঘটবে। প্রয়োজনে কোনো ভ্রমণ কিংবা শহরের ভেতরেই ছুটাছুটি নতুন করে উপলব্ধি দিতে পারে নিজেদের সম্পর্কে। এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় দাম্পত্য সম্পর্ক একটি নিবিড় মনোযোগের বিষয়। যাকে তুলনা করা যেতে পারে চারাগাছের সঙ্গে। এই চারাগাছটিকে নিয়মিত যত্ন নেওয়া চাই, প্রয়োজনে পানি দেওয়া চাই এবং সময়মতো রোদ-ঝড়ের তীব্রতা থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা চাই। ভালোবাসা, যত্ন, কেয়ারিং আর শেয়ারিংয়ের মিলিত চেষ্টায় শীতল দাম্পত্যে ঝড় উঠতে পারে স্বর্গসুখের। আর কে না চায় জীবনের প্রতিটি বিন্দু, স্বপ্নের প্রতিটি কোষ এবং প্রাপ্তির প্রতিটি সিন্ধু ভরে উঠুক প্রত্যাশার অবারিত জলে। এভাবেই হয়তো জীবনের গল্পগুলো পূর্ণ হয়ে উঠবে আমাদের সঞ্চারিত স্বপ্নে।
সিনেমার নায়কের মতো আপনার স্বামী হবে দারুণ অ্যাট্রাকটিভ, ভীষণ শক্তিশালী আর আইডিয়াল—এমন মনে করবেন না। পর্দার বাইরের শাহরুখ খান নিশ্চয়ই একা একদল গুণ্ডার সঙ্গে লড়ার কথা ভাববেন না। হবু স্বামীকে বদলে গড়েপিটে আপনার মনের মতো করে নেবেন। এই আশা নিয়ে কখনও বিয়ের পিঁড়িতে বসবেন না। মনে রাখতে হবে, মানুষ নিজেকে বদলাতে পারে অন্যকে নয়। আর একটা কথা, একজনের সবকিছু কখনও আরেক জনের মনের মতো হতে পারে না। বিয়ের আগে পাঁচজনে পাঁচ রকম কথা বলবে। অনেকে পাত্রের দোষ খুঁজে বের করবে। শ্বশুরবাড়ি সম্বন্ধে নানা রকম ভয় দেখানোর চেষ্টা করবে। আজেবাজে পরামর্শ দেবে। এসব কথায় একদম কান দেবেন না। লক্ষ্য করে দেখবেন যারা এসব করছে, তাদের কারোই স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো নয়। আমি দেখতে তেমন সুন্দরী নই, আমাকে ওর পচ্ছন্দ হবে তো? এ রকম নেগেটিভ চিন্তা একেবারেই করবেন না। সৌন্দর্য মোটেই বাইরের চেহারার উপর নির্ভর করে না। ব্যক্তিত্বের ও ভালোবাসার ওপর নির্ভর করে। চারদিক চেয়ে দেখুন, কত সাধারণ চেহারার মেয়ে বিবাহিত জীবনে সুখী। অন্যদিকে সুন্দরী স্ত্রীকে ছেড়ে স্বামী চলে গেছে এমন ঘটনাও ঘটে। আপনার স্বামীকে বলুন—আমি তোমায় ভালোবাসি। বিয়ে পুরোনো হলেও বলুন। মুখে যদি না বলতে পারেন তাহলে চোখে চোখে বলুন, সামান্য একটু ছোঁয়া দিয়ে বলুন। চিরকুটে লিখে দিন মনের কথা।
দাম্পত্যের কিছু সহজ মন্ত্র
সম্পর্ক সবসময় মধুর হয় না! দাম্পত্য জীবনে ঝগড়া বিবাদ থাকবেই। সংসারের হিসেবের খাতার মতোই পানসেও হতে পারে দৈনন্দিন, তবু হাতে হাত রেখে চলতে হবে সারাটি জীবন! এই মনোভাব নিয়েই শুরু করুন প্রতিটি দিন! মনে রাখবেন বিচ্ছেদ কখনোই কোনো সমাধান নয়! সম্পর্ক সুমধুর করার দায়িত্ব এবং ক্ষমতা আপনার হাতেই।
দাম্পত্য সম্পর্কের মাঝে ভালোবাসার প্রকাশটি সব সময়ই জরুরি। এ জন্য দামি কোনো গিফট দেওয়াই বড় কথা নয়। বরং আপনার সান্নিধ্য আর সঙ্গীকে চমকে দেওয়ার মতো যেকোনো কিছুই হতে পারে ভালোবাসার ভিন্ন এক বার্তা।
সম্পর্কের মাঝে যেন কোনো একঘেয়েমি চলে না আসে সে জন্য মাঝে মাঝে নিজেদের শেয়ারিংগুলোতে নতুনত্ব আনা উচিত। উদাহরণস্বরূপ—সপ্তাহের ছয়দিন যেখানে কাজের চাপে স্ত্রীকে ফোন করার কথা ভুলে যান, সেখানে মাঝে মাঝে একটা দিন কষ্ট করে হলেও নিয়মের বাইরে তাকে বেশি বেশি ফোন দেওয়ার চেষ্টা করুন। অথবা কর্মব্যস্ত দিনে অফিস ম্যানেজ করে আগেভাগে বাড়ি এসে তাকে নিয়ে চলে যান সারপ্রাইজ কোনো ট্রিপে।
আপনার সঙ্গী বা সঙ্গিনী কোন বিষয়টি পছন্দ করেন আর কোনগুলো করেন না সেগুলো ভালো করে জেনে নিন।
বিয়ে বার্ষিকী, জন্মদিন ইত্যাদি নিয়মিত উপলক্ষের বাইরে হঠাত্ হঠাত্ উপহার দিয়ে কিংবা কোথাও বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করে প্রিয় মানুষটিকে চমকে দিন।
সপ্তাহের ছয়দিন কাজের পর ছুটির দিনটিকে আলসেমিতে নষ্ট না করে এ দিনটিতে নিজেদের সম্পর্কের জন্য বাড়তি কিছুটা সময় দেওয়ার চেষ্টা করুন।
পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং নিজের কোনো ভুল হলে তা অকপটে স্বীকার করে নিন। সেই সাথে অন্যের ভুলকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অভ্যাসও গড়ে তুলুন।
সঙ্গী কিংবা সঙ্গিনীর ভুল ধরার অপেক্ষায় বসে না থেকে তার ভুলগুলো যতটা সম্ভব ভালোবাসা দিয়ে শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করুন।
অন্য কারো সম্পর্ক বা অতীত কোনো সময়ের সাথে তুলনা দিয়ে বর্তমানের সম্পর্কটিকে খাটো করবেন না। নিজের ইচ্ছাগুলো যেমন সঙ্গীকে বুঝিয়ে বলবেন তেমনি তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার গুরুত্বও দিতে শিখুন।
সমস্যা ঘনীভূত হওয়ার আগেই সেটিকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসুন।
কোনো বিশেষ দিনে তার কাছের মানুষদের একত্রে ডেকে ঘরোয়া আয়োজনের চেষ্টা করুন।
তার পছন্দের গান ছেড়ে শুরু করতে পারেন সকাল বেলাটা। ঘুম থেকে উঠেই প্রিয় গান শুনে নিশ্চয় ভালো হয়ে যাবে তার মন।
মাঝে মাঝে আগের দিনের মতো বা প্রেম করে বিয়ে করে থাকলে আগের সময়ের মতো কোনো মজাদার কিছু করুন। সাধারণত বিয়ের পর সম্পর্কগুলো একঘেয়ে হয়ে যায়।
চিঠি বা নোটের ব্যবহার করুন! ভাবুন তো! আপনার সঙ্গীটি দূরে কোথাও ভ্রমণে যাচ্ছে ফোন করে সব ঠিকঠাক মতো চলার কথা বলার চেয়ে যদি তিনি ব্যাগ খুলে তারপর প্রতিটি কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে একটা করে চিঠি পান! কেমন লাগবে!!
জীবনসঙ্গীর ওপর বিশ্বাস না হারিয়ে তাকে প্রাণখুলে ভালোবাসতে শিখুন এবং ভালোবাসার বন্ধনেই তাকে দাম্পত্য সম্পর্কে বেঁধে রাখুন।