ঈর্ষা এবং বন্ধুত্বে সমাধান

‘বন্ধু তোমার পথের সাথিকে চিনে নিও।’ নানা সম্পর্কের মাঝে বন্ধু সম্পর্কটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি এ কথাটির সত্যতাও অনস্বীকার্য। বন্ধু আছে এবং থাকবেই, এরই মাঝে চোরাকাঁটা হয়ে থাকতে পারে ঈর্ষা আর অবিশ্বাসের বীজ। তাই মন দিয়ে চিনে নিতে হবে বন্ধুকে... পথের সাথিকে। কেননা এই সম্পর্কের মাঝে ঈর্ষা আর ভালোবাসা পরস্পরের প্রতিবেশী, তাই এবার বন্ধুত্বের নানা সমীকরণ নিয়ে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু কবি লর্ড বায়রন ডানাবিহীন ভালোবাসার সঙ্গে তুলনা করেছেন বন্ধুত্বকে। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার মধ্যে অনেক তফাত আছে। কিন্তু ঝট করিয়া তফাত ধরা যায় না।’ তবে সহজ ভাষায় বন্ধুত্ব বলতে পরস্পরের বোঝাপড়ার সম্পর্ককেই বোঝায়। কিন্তু এ এমন এক সম্পর্ক যার সীমানা অনেক বেশি প্রসারিত। বন্ধুত্ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরও বলেছেন, ‘বন্ধুত্ব বলতে তিনটা পদার্থ বোঝায়। দুইজন ব্যক্তি ও একটা জগত্।’ কবিগুরুর এই বক্তব্য থেকে বন্ধুত্বের একটা রূপ দাঁড় করানো যায়, আর তা হলো—গাণিতিক হিসাবে বন্ধুত্বের অবস্থান দুই ও তিনে। অর্থাত্ যেখানে বন্ধু আছে, সেখানে দুজনে মিলে তৃতীয় একটা পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন থাকে। বন্ধুত্বের সংজ্ঞা বিষয়ক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন দার্শনিক অ্যারিস্টটলও। খুব সহজ ভাষায় তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘বন্ধুত্ব হলো দুই দেহে এক আত্মা।’ কিন্তু বর্তমানে জনাব অ্যারিস্টটল সাহেবকে ভুল প্রমাণিত করে বন্ধুত্ব এখন অনেকটাই দুই দেহ এবং দুই চিন্তা। কি অবাক হচ্ছেন পড়ে? মনে মনে ভাবছেন, ‘বন্ধু’র মাঝে ‘বন্ধুত্ব’ ও ‘ঈর্ষা’ কেমন করে একই সাথে থাকে? বন্ধু তো বন্ধুই, এরমধ্যে আবার এ রাজনীতি এল কোথা থেকে। আছে আছে, কারণ নিশ্চয়ই আছে। মানুষ যেখানে রয়েছে, সেখানে ঈর্ষা শব্দটি থাকবে না—এ আবার কেমন কথা, এমনটা হওয়া কি সম্ভব! আসলে বন্ধুত্ব অনেকটা পানির মতো, যে পাত্রে রাখবেন সেই পাত্রের আকার ধারণ করবে। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বন্ধুত্বের রংও বদলে যায়। বন্ধুত্বের সম্পর্কে অনেক রকম রাজনীতি আছে এবং এই সহজ সত্যটাকে মেনে নিয়েই বন্ধুত্বে সতর্ক থাকতে হবে। তাই কোনো ভুলে পা আটকে গেলেও আপনি দেখবেন বের হওয়ার রাস্তা অনায়াসেই খুঁজে পেয়েছেন। কয়েকটা কেসস্টাডির মাধ্যমে বন্ধুত্বের এই জটিল সমীকরণটি নিয়ে এবার আলোচনা করা যাক। কিছু বাস্তব গল্প  কোনো কিছুতেই ভালো লাগে না মেরাজের। নিজের স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতেও তার ভালো লাগে না। কিন্তু কিছুই করার নেই, শুধু ক্লাসনোট ও পরীক্ষার সময় সাহায্যের জন্য ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গে মেরাজকে ভালো সম্পর্ক রাখতে হয়। সারমর্ম :এটাও এক ধরনের বন্ধুত্ব, যেখানে ভালো লাগা বা অ্যাটাচমেন্টের বদলে নিজের স্বার্থ বা প্রয়োজনই হলো সম্পর্কের শিরদাঁড়া। এ ধরনের বন্ধুত্বের কথা প্রকাশ্যে এলে হয়তো অনেকেই খারাপ বলে, কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেই এ ধরনের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ধরে রাখেন। যাই হোক, কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই মেরাজকে দোষারোপ করা যায় না, কারণ, তার অন্য বন্ধুরা তো আর তার হয়ে ক্লাসনোট জোগার করে দেবে না বা পরীক্ষার সময় নোটও লিখে দেবে না। অতএব, ক্লাসমেটের সঙ্গ অসহ্য মনে হলেও মুখ বুঁজে মেরাজকে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। একটু ভেবে দেখুন, আমরা কিন্তু অনেকেই বিভিন্ন জায়গায় মানে স্কুল-কলেজে বা অফিসেও এই একই কাণ্ড করি। অর্থাত্, বন্ধুত্ব বজায় রাখার জন্য নয়, প্রয়োজন মেটানোর দায়ে।  একেবারেই মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে শিমু। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে সহজেই তার একটা নিজস্ব গ্রুপ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মাসখানেক পরেই দেখা গেল, নিজের গ্রুপের লোকজনের সঙ্গে তার আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, বরং ক্লাসের গ্রুপের সঙ্গ তিনি বেশি এনজয় করেন। ব্যস, ওদিকের পুরোনো বন্ধুদের ভুলে নতুন গ্রুপে থেকে গেলেন। সারমর্ম :এখানে দোষী কে বা কারা? শিমু নিজে, পুরোনো বন্ধুরা, না কি নতুন বন্ধুরা? না, সম্ভবত দোষী কেউই নয়! কারণ, সম্পর্কের রসায়নটা এ রকমই। শিমুর হয়তো অল্পদিনেই তার পুরোনো বন্ধুদের বোরিং বলে মনে হয়েছিল। তাই তিনি নিজের ভালোলাগাকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য পুরোনোদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাননি। নতুনদের ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে পুরোনো বন্ধুদের ভুলে যাওয়াটা অনেকটা বিশ্বাসঘাতকতা করার মতোই। অতএব সিমি ঠিক করেছেন, না ভুল করেছেন—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছা খুব একটা সহজ কাজ নয়। এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে, শিমুর মতো অনেকের কাছে বন্ধুত্ব হলো স্বার্থ চরিতার্থের একটা পদ্ধতিমাত্র!  বন্ধু গ্রুপের প্রায় সবাইকেই পছন্দ করে মোহনা, কিন্তু অদিতিকে একেবারেই পছন্দ নয় তার। শুধু তাই-ই নয়, অদিতিকে একঘরে করার জন্য নানা সময়ে বিভিন্ন প্ল্যান করেন তিনি। আসলে তার যেহেতু অদিতিকে পছন্দ নয়, তাই অন্য কেউ অদিতিকে পছন্দ করুক এটা মোহনা চান না। সারমর্ম :খুবই কমন সাইকোলজি। ‘তার ক্রেজ আমার চেয়ে বেশি’ বা ‘তার অনুরাগীর সংখ্যা আমার চেয়ে অনেক বেশি’ অথবা ‘সে দেখতে আমার চেয়ে বেশি সুন্দর’—এ ধরনের ব্যাপারগুলোর ফলে অনেকের সঙ্গে অনেকের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়। শুধু বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে ক্ষান্ত থাকে না, একে অপরের ঘোরতর শত্রুতেও পরিণত হয় অনেক সময়। তবে, এ ধরনের সম্পর্ক সাধারণত সকলের অগোচরেই থাকে। রীতিমতো নিজস্ব অনুরাগী গ্রুপও তৈরি হয়ে যায়। বড় বড় বন্ধু গ্রুপ স্রেফ কয়েকজনের ইগোর লড়াইয়ের জন্যই ভেঙে যায়। না, এর কোনো সমাধান সূত্র নেই, তবে দাওয়াই রয়েছে। যেমন—এই মানসিকতার বন্ধুদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা বা নিজেদের গ্রুপে এ ধরনের লোকজন থাকলে আগেভাগেই তাকে একঘরে করে দেওয়া প্রভৃতি। তবে দেখবেন, ক্লাসে এমন অনেকে রয়েছে, যারা পরস্পরকে দু’চোখে দেখতে না পারলেও শুধু সামাজিকতার দায়ে বছরভর ‘হাই-হ্যালো’ চালিয়ে যায়।  ভার্সিটির বন্ধুদের সাথে বিশেষ বন্ধুত্ব হয়নি এষার। ফলে, কোনো উত্সব বা অনুষ্ঠানে জমিয়ে মজা করার জন্য পাড়ার বন্ধুরাই তার প্রধান ভরসা। কিন্তু এবার ছুটির দিনে ক্লাসের বন্ধুরা তার সাথে ঘুরবে বলে প্ল্যান করেছে। এদিকে পাড়ার বন্ধুদের তিনি কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। যাই হোক, পাড়ার বন্ধুদের যে করেই হোক বুঝিয়ে দেবেন বলে ঠিক করে তিনি ক্লাসের বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বের হলেন। সারমর্ম :এটাও এক ধরনের বন্ধুত্ব। প্রত্যেক বছর পাড়ার বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বেরোনোর অর্থ এই নয় যে, সারাজীবন আপনাকে তাদের সাথেই ঘুরতে হবে। কলেজে ওঠার পর এমন হতেই পারে যে, আপনার সঙ্গে কলেজের বন্ধুদের সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়ে গেল। তখন? এ ক্ষেত্রে কিছু করার নেই বন্ধু, বড় হয়ে ওঠার একটি অন্যতম শর্ত হলো, ব্যালান্স করতে শেখা। এ ক্ষেত্রেও আপনাকে রাজনৈতিক প্রতিভা দেখাতে হবে। এই চারটি কেসস্টাডির বাইরেও হয়তো আরও অন্য ধরনের বন্ধুত্বকেন্দ্রিক সমস্যা রয়েছে। তবে যেকোনো সমস্যার মূলে রয়েছে ঈর্ষা। আর সমস্যাগুলোর সমাধানও সম্ভব কিছু স্বাভাবিক বিবেচনা দিয়েই। আসলে বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখলে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে সেটা কখনোই ক্ষতিকারক হয় না। মডেল শয়ন, রেজা