প্র জ ন্ম মু খ
স্থাপনার রূপকার
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:০১
খুব শখ করে যে স্থাপত্যে আসা তার; ঠিক তা নয়। উচ্চমাধ্যমিকের পর আর সবার মতোই চাইছিলেন দেশসেরা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন। কিছুদিন স্থাপত্যের অ-আ-ক-খ সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করলেন, হয়ে গেলেন সৃজনশীল এই দুনিয়ার গুণমুগ্ধ ভক্ত। তারপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি, ভালোলাগার বিষয় আর্কিটেকচারই তাকে ভালোবেসে আপন করে নিয়েছে। এই সুবিশাল শৈল্পিক জগতের নান্দনিকতার যেখানেই হাত দিয়েছেন, তাকে বিমুখ হতে হয়নি। সময়ের মেধাবী এই স্থপতির নাম মেরিনা তাবাশ্যুম। নিজের প্রতিষ্ঠান মেরিনা তাবাশ্যুম আর্কিটেক্টস-এর প্রধান
হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এই প্রজন্মকে নিয়ে কাজ করছেন
সুন্দর একটা আগামীর জন্য। তার বর্ণিল কর্মজীবন নিয়ে লিখেছেন
সাজেদুল ইসলাম শুভ্র আর ছবি তুলেছেন দীপংকর দীপু
স্থাপত্যে ভর্তি হওয়াটাকে নিজের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন মেরিনা, আর বুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে প্রমাণ করেছিলেন কাজটা তিনি চাইলেই পারবেন। স্নাতক শেষ করার পরই আর পড়ালেখায় আগ্রহী হননি, ব্যবহারিক কাজটাই তাকে বেশি টানত। তখন থেকেই বেশকিছু প্রজেক্টের কাজ করতেন। ফার্মগুলোতে কাজ করার সুবাদে অনেক নতুন নতুন চিন্তাচেতনার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটে। আর্কিটেকচারের মডেল তৈরিতেও তিনি ছিলেন বেশ পটু, আর শিক্ষাজীবনের এই অভিজ্ঞতাগুলো আজও তার কর্মজীবনে প্রভাব রেখে চলেছে। এখনও কাজ করতে করতে অনেক চ্যালেঞ্জ সামনে আসে। সেটা তিনি খুব অন্যরকমভাবে দেখেন না, স্থপতিদের জন্য এমনটা স্বাভাবিকই বলে মনে হয় তার কাছে। মেরিনা তাবাশ্যুম মনে করেন, একজন আর্কিটেক্টের কাজ কেবল ভবন তৈরি করার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাদের উপর অনেক দায়িত্ব এসে ন্যস্ত হয়, একটা বাসযোগ পরিবেশ রচনা করাই সার্বিকভাবে তাদের লক্ষ্য থাকা উচিত। ইদানীং মানুষের এ বিষয়ে অনেক সচেতনতা বেড়েছে মত দিয়ে মেরিনা জানালেন, তাদের শুরুর সময়টাতে এতটা কাজের সুযোগ না থাকলেও দিনকে দিন ধারণা পাল্টাচ্ছে। অনেকেই এ পেশায় আগ্রহী হচ্ছেন। মান ও শিল্পসম্মত কাজের জন্য মানুষ স্থপতিদের উপর আস্থাও রাখছে। বিষয়গুলোকে ইতিবাচক বলে মনে করেন তিনি। এই সময়ে সরকারি-বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, এই দিকটাকে কেমন চোখে দেখেন তিনি? উত্তরে মেরিনা খানিকটা দ্বিধার সাথে বললেন, ‘নতুন প্রজন্ম আসছে এটা অবশ্যই আশাব্যঞ্জক, তবে খেয়াল রাখা জরুরি যেন মানের ক্ষেত্রে আপস না করা হয়। শুধু ডিপার্টমেন্ট খুলে বসলেই হবে না, সেটার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। আমি নিজেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিজাইন কোর্স নিই, তাদের সাথে কাজ করতে যেয়ে দেখেছি, কিছু কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’ মেরিনা তাবাশ্যুম মনে করেন, পেশা হিসেবে এখন আর্কিটেক্ট খুবই সমাদৃত, অনেক কাজের সুযোগ রয়েছে। শুধু ভবনের নকশা করেই থেমে থাকা না, সব ধরনের ক্রিয়েটিভ কাজেই আর্কিটেক্টদের হাতের ছোঁয়া দেখা যাচ্ছে। রাজউক এবং নগর পরিকল্পনাতেও তাদের সরব উপস্থিতি। প্রসঙ্গতই জানতে চেয়েছিলাম, নতুনদের কাজ কেমন লাগে, তিনি বললেন, ‘নতুনদের মাঝে আগ্রহ রয়েছে, তবে অবশ্যই নিজের দক্ষতাটা ঝালাই করে নিতে হবে। যারা এখনও পড়ছে, তাদের সিনিয়রদের সাথে কাজ করা উচিত। এভাবে কাজের ফলে নিজের অভিজ্ঞতাটা বাড়ানো যায়, যোগাযোগের মাধ্যমটাও তৈরি হয়, আর এটা এমনই একটা পেশা যেখানে পারস্পরিক সৌহার্দ্যটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মেরিনা তাবাশ্যুম পড়াশোনা শেষ করেই কাজ প্রবেশ করেছিলেন, আর সেটা ছিল কাসেফ মাহবুব চৌধুরীর সাথে আরবানা নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। পরবর্তীতে নিজেই ধানমন্ডিতে প্রতিষ্ঠা করেন মেরিনা তাবাশ্যুম আর্কিটেক্টস। এই প্রতিষ্ঠানটিকে তথাকথিত ফার্ম বলতে চান না তিনি, তার ভাবনায় এটা মূলত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং প্রকল্পগুলো নিয়েই তরুণ আর্কিটেক্টদের সাথে নিজের চিন্তা বিনিময় করার একটা জায়গা। ইতোমধ্যেই তিনি বেশকিছু প্রকল্প দিয়ে পরিচিতি পেয়েছেন। ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’ তার পরিকল্পনায় নির্মাণ কাজ শুরু করেছিল, সরকারের পালাবদলে পূর্ণতা না পেলেও আবার তা শুরু হয়েছে। এর বাইরে দেশে ও দেশের বাইরে অনেকগুলো কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে এই স্থপতি ‘আর্কিটেক্ট অব দ্য ইয়ার’ পদক পান। এর বাইরে নানা একাডেমিক স্বীকৃতি তো রয়েছেই। প্রজন্মের মেধাবী এই স্থপতির শৈশব-কৈশোর কেটেছে ঢাকাতেই, হলিক্রসের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। তারপর ভর্তি হন বুয়েটে। পরিবারে প্রায় সবাই-ই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার ধরনের পেশায় সম্পৃক্ত ছিলেন। মা প্রায় এক দশক হলো তাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে, বাবা স্বনামধন্য চিকিত্সক। স্থাপত্যজীবন নিয়েই রচিত হয় এখন তার প্রতিদিনের সুখের দিনলিপি। এই স্থাপত্যেই নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে মেরিনা তাবাশ্যুম, সুন্দর আর পরিকল্পিত একটা আগামীর স্বপ্ন দেখেন তিনি।
মেরিনা তাবাশ্যুম
জন্ম তারিখ ও স্থান :৪ জুন, ঢাকা
মায়ের নাম :তাহমিনা হাই
বাবার নাম :প্রফেসর মো. আব্দুল হাই
প্রথম স্কুল :লিটল জুয়েলস কিন্ডারগার্ডেন
প্রিয় মানুষ :আমার বাবা
প্রিয় পোশাক :স্বাচ্ছন্দ্যময় যেকোনো কিছু
অবসর কাটে যেভাবে :ভ্রমণ করে
সাফল্যের সংজ্ঞা :নিজের প্রকল্পটা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা।