এক নজরে প্রযুক্তি বিশ্ব ২০১২

বছর জুড়েই প্রযুক্তি বিশ্বে উপহার দিয়েছে নতুন নতুন পণ্য, নতুন নতুন সেবা। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও বছর জুড়ে নানা ঘটন-অঘটনের মধ্য দিয়ে ছিল আলোচনায়। বছর জুড়ে ঘটে যাওয়অ নানা ঘটনার মধ্য থেকে প্রযুক্তি বিশ্বের ২০১২ সালের সর্বাধিক আলোচিত কয়েকটি ঘনা তুলে ধরা হলো এই লেখায়। প্যাটেন্ট মামলা বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে প্যাটেন্ট মামলায় ব্যাস্ত সময় কাটিয়েছে। এর মধ্যে প্যাটেন্ট মামলায় সারা বছরই আলোচনায় ছিল অ্যাপল। স্যামসাং, এইচটিসিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের আদালতে অ্যাপল মামলা চালিয়ে যায় বছর জুড়েই। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে একটি মামলার চূড়ান্ত রায় অ্যাপল বিজয়ী হয় স্যামসাংয়ের বিরুদ্ধে। স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি সিরিজের বেশকিছু পণ্যে অ্যাপল’র প্যাটেন্ট অবৈধভাবে ব্যবহূত হয়েছে বলে রায় দেয় আদালত। পরে অ্যাপল স্যামসাংয়ের পণ্য বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞার আবেদন জানালেও তা খারিজ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এদিকে জার্মানি, চীনসহ কয়েকটি দেশে আবার অ্যাপল হেরে যায় স্যামসাংয়ের কাছে। বছরের শেষভাগে এসে অ্যাপল চুক্তি করে এইচটিসির সাথে। এতে করে অ্যাপল-এইচটিসির বিদ্যমান প্যাটেন্ট দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের চুক্তিতে আবদ্ধ হলে তা প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য স্বস্তির বলে মন্তব্য করেছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। উন্মুক্ত ইন্টারনেটের পক্ষে প্রযুক্তি বিশ্ব স্টপ অনলাইন পাইরেসি অ্যাক্ট (SOPA) নিয়ে বেশ ভালো সাড়া পড়ে প্রযুক্তি বিশ্বে। পরবর্তীতে SISPA, PIPA এবং আরও কিছু অনলাইন নীতিমালা বাস্তবায়নে তত্পর হয়ে উঠে পশ্চিমা বিশ্বের কর্পোরেট মিডিয়া হাউজগুলো এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ। এসব নীতিমালার মূল লক্ষ্য ছিল ইন্টরনেটের বিভিন্ন কনটেন্টের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের অধিকার লাভ, যা উন্মুক্ত ইন্টারনেটের ধারণার বিরোধ। এসব নীতিমালা নিয়ে আলোচনা উত্থাপিত হলে সরব হয়ে ওঠে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। গুগল, উইকিপিডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের সেবা সীমিত সময়ের জন্য বন্ধ রেখে এবং লোগোতে কালো দাগ ব্যবহার করে প্রতিবাদ জানায়। শেষ পর্যন্ত এসব আন্দোলনের কারণে বাস্তবায়িত হতে পারেনি SOPA, PIRA বা SISPA এর মতো নীতিমালা। বছরের শেষের দিকে জাতিসংঘের টেলিযোগাযোগ বিষয়ক সংস্থা আইটিইউ তাদের সম্মেলনে বিশ্বব্যাপী সাধারণ একটি ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ নীমিতালা প্রণয়নের বিষয়ে উদ্যোগ নেয়। তবে পরবর্তীতে প্রভাবশালী পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো এর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেলে হালে পানি পায়নি আইটিইউ-এর প্রস্তাবনা। ফেবুকের আইপিও এবং ১০০ কোটি গেল ২০১২ সালেই শেয়ার বাজারে প্রবেশ করে সামাজিক যোগাযোগের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুক। অন্যতম বৃহত্ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই যাত্রা শুরু করে তারা। অবশ্য শেয়ারের দাম পড়তে বেশি সময় লাগেনি। এই ব্যর্থতা সত্ত্বেও গত বছরে প্রযুক্তি বিশ্বের অসামান্য এক অর্জনের সাথে জড়িয়ে ছিল ফেসবুক। প্রথম সামাজিক যোগাযোগের সাইট হিসেবে এই বছরেই তারা ১০০ কোটি ব্যবহারকারীর মাইলফলক পেরিয়ে যায়। মাইক্রোসফটের ঘুরে দাঁড়ানো অ্যাপল, গুগল আর ফেসবুকের চাপে পড়ে বেশ অনেকটাই কোনঠাসা হয়ে পড়ে টেকজায়ান্ট মাইক্রোসফট। তবে হাল ছাড়েনি তারা। সদ্য সমাপ্ত ২০১২কে একরকম ঘুরে দাঁড়ানোর বছর হিসেবে গ্রহণ করে তারা। আর চমক হিসেবে তারা এ বছরে নিয়ে আসে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের এক ভিন্ন ধরনের সংস্করণ এবং নিজস্ব ট্যাবলেট পিসি। সম্পূর্ণ টাচস্ক্রিননির্ভর উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম উইন্ডোজ ৮ নিয়ে বাজারে কিছুটা হলেও সাড়া ফেলতে সক্ষম হয় তারা। তবে উইন্ডোজ ফোন নিয়ে আশাবাদী হতে পারেনি মাইক্রোসফট। ‘সারফেস’ ট্যাবলেট আবার খুব বেশি হতাশ করেনি তাদের। আইপ্যাড, আইফোন, রেটিনা ডিসপ্লে বছর জুড়ে মামলা ছাড়াও নিজেদের আইকনিক সব পণ্য আর সেবা দিয়েও আলোচনায় ছিল অ্যাপল। এ বছর তারা তৃতীয় সংস্করণের ‘দ্য নিউ আইপ্যাড’ এবং চতুর্থ সংস্করণের ‘মিনি আইপ্যাড’ নিয়ে বাজার দখলে রাখে ভালোভাবেই। তাদের স্মার্টফোনের সর্বশেষ সংস্করণ আইফোন ৫-ও রেকর্ড ভাঙা-গড়ায় ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে। আবার আইপড টাচের পঞ্চম প্রজন্ম এবং আইপড ন্যানোর সপ্তম প্রজন্মও প্রশংসিত হয়েছে সর্বত্র। আর এ বছরে বিভিন্ন ডিভাইসে রেটিনা ডিসপ্লের সংযোজন ছিল এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা।বছরের শেষের দিকে অবশ্য তাদের নিজস্ব ম্যাপিং সার্ভিস সঠিকভাবে কাজ না করায় সমালোচনার মুখে পড়ে তারা। ইয়াহুর নেতৃত্বে পরিবর্তন বছর জুড়ে ইয়াহু আলোচনায় ছিল তাদের নেতৃত্বের পরিবর্তন দিয়ে। বছরের শুরুতেই তারা তারেদ সিইও হিসেবে নিয়োগ দেয় ইবে’র পেপ্যাল ইউনিটের প্রধান স্কট থম্পসনকে। তবে শেষ পর্যন্ত তার জীবনবৃত্তান্ত সংক্রান্ত কেলেংকারিতে ফেঁসে গিয়ে সিইও বাদ পদ থেকে বরখাস্ত হতে হয় তাকে। পরবর্তীতে গুগলের কর্মকর্তা। মারিসা মেয়ারকে ইয়াহু নিজেদের সিইও হিসেবে নিয়োগ দিয়ে চমকে দেয় প্রযুক্তি বিশ্বকে। মারিসা মেয়ার ইয়াহুতে যোগদানের পরপরই ইয়াহুর মার্কেট শেয়ার বাড়তে শুরু করে। ইয়াহুতে বড় ধরনের কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসতে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। নকিয়ার পতন-স্যামসাংয়ের উত্থান স্মার্টফোনের জয়জয়কার শুরু হওয়ার পর থেকেই পিছিয়ে পড়তে থাকে নকিয়া। এই বছর অবশ্য তারা লুমিয়অ সিরিজের উইন্ডোজ ফোন দিয়ে চেষ্টা করে বাজারে ফিরে আসতে। তবে তাতে সাফল্য পায়নি তারা। লুমিয়া সিরিজের ফোনগুলো অ্যানড্রয়েড ফোনের কাজে পাত্তাই পায়নি। পরবর্তীতে আশা সিরিজের স্বল্পমূল্যের স্মার্টফোন বাজারে এনেও আশাহত হতে হয়েছে তাদের। স্মার্টফোন ছাড়া সার্বিকভাবে মোবাইল ফোনের বাজারে শীর্ষস্থানটিও শেষ পর্যন্ত হারাতে হয়েছে তাদের। চলতি বছরে স্যামসাং সার্বিকভাবে বিশ্বব্যাপী মোবাইল ফোন বিক্রিতে উঠে আসে শীর্ষে। এতে করে নকিয়ার বছরের রাজত্বের অবসান ঘটে। ট্যাবলেট পিসির জয়জয়কার ২০১১ সালের ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালেও ছিল ট্যাবলেট পিসির জয়জয়কার। অ্যাপল, স্যামসাংয়ের পর এই বাজারে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে যোগ দেয় মাইক্রোসফট এবং অ্যামাজন। বিশেষ করে অ্যামাজন তাদের ‘কিন্ডল’ সিরিজের কয়েকটি ট্যাব দিয়ে বাজারে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে। উইন্ডোজ ৮ সমৃদ্ধ বেশকিছু ট্যাবলেটও আলোচনায় উঠে আসে বছরের শেষের দিকে। তবে ভারতে মাত্র ৩ হাজার রুপির ট্যাবলেট ‘আকাশ’ যুক্ত করে নতুন মাত্রা। গুগল বছর জুড়ে গুগলও ছিল প্রযুক্তি বিশ্বের নানা আলোচনায়। এরমধ্যে বরাবরের মতোই বেশকিছু প্রতিষ্ঠান কিনে নেয় তারা; কিছু কিছু সার্ভিস বন্ধও করে দেয়। তবে প্রযুক্তি বিশ্বে তাদের ক্রোমবুক এবং নেক্সাস সিরিজের স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটগুলো সাড়া জাগিয়েছে। ক্রোমবুকগুলো আবার ভর্তুকি দিয়ে স্কুলে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশংসিত হয়েছে তারা। এ ছাড়া তাদের ‘প্রজেক্ট গ্লাস’ দিয়েও তারা আলোচনা ধরে রাখে। আনুষ্ঠানিকভাবে গুগল’র সেজেই তিন প্রদর্শন করেন এর নানা ফিচার। আর এটি নতুন বছরেই বাজারে আসার ঘোষণাও জানায় গুগল।