এই শীতে সিলেট

হযরত শাহজালাল (র) এর সমাধি সিলেট শহরের প্রাণকেন্দ্রে হযরত শাহজালাল (র)-এর সমাধি। মাজার কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে শুরুতেই দেখা মিলবে দরগাহ মসজিদ। মসজিদটি বর্তমানে আধুনিক রূপ নিলেও প্রথমে এটি তৈরি হয়েছিল ১৪০০ খ্রিস্টাব্দে। মসজিদের পাশেই রয়েছে মাজারে ওঠার সিঁড়ি। উপরে উঠে মাজারে প্রবেশ করতে হয় গম্বুজবিশিষ্ট একটি হল ঘরের মধ্য দিয়ে। এই হল ঘরের ঠিক পশ্চিমের ভবনটি ঘড়ি ঘর। ঘড়ি ঘরের আঙ্গিনার পূর্ব দিকে যে তিনটি কবর রয়েছে তা হযরত শাহজালাল (র)-এর ঘনিষ্ঠ তিনজন সঙ্গীর। এর দক্ষিণপাশে গ্রিলঘেরা ছোট্ট ঘরটি হযরত শাহজালালের চিল্লাখানা। দু ফুট চওড়া এ চিল্লাখানায় তিনি জীবনের তেইশটি বছর ধ্যানমগ্ন কাটিয়েছেন বলে কথিত আছে। চিল্লাখানার উত্তরের প্রবেশ পথ দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়বে উঁচু ইটে বাঁধানো হযরত শাহজালাল (র)-এর সমাধি। এটি নির্মাণ করা হয় ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে। এর পাশেই রয়েছে ইয়েমেনের রাজা শাহজাদ আলীর কবর এবং ১৪১০ খ্রিস্টাব্দে সিলেটের শাসনকর্তা মুক্তালিব খান উজিরের কবর। হযরত শাহজালাল (র)-এর পুরো মাজার কমপ্লেক্সটি ঘুরে দেখার মতো জায়গা। মাজার কমপ্লেক্সেও পূর্ব পাশের পুকুরেও দেখা মিলবে বহুকালের ঐতিহ্য গজার মাছের। শত শত জালালী কবুতরও রয়েছে এখানে। মাজার কমপ্লেক্সের পশ্চিম পাশের একটি ঘরে এখনও রক্ষিত আছে হযরত শাহজালাল (র)-এর ব্যবহূত তলোয়ার, প্লেট, বাটি ইত্যাদি। ক্বিন ব্রিজ হযরত শাহজালাল (র)-এর সমাধি থেকে ২৫-৩০ টাকা রিকশা ভাড়ার দূরত্বে ক্বিন ব্রিজ। সুরমা ব্রিজ নামেও এটি বেশ পরিচিত। ১৯৩৬ সালে নির্মাণ করা হয় এটি। তত্কালীন ইংরেজ গভর্নর মাইকেল ক্বিনের নামেই এর নাম করণ হয়। ১১৫০ ফিট লম্বা এবং ১৮ ফিট প্রস্থ এ ব্রিজটি দেখতে ধনুকের মতো বাঁকানো। আলী আমজাদের ঘড়িঘর ক্বিন ব্রিজ থেকে নিচে তাকালেই চোখে পড়ে একটি ঘড়িঘর। ব্রিজের পাশে চাঁদনীঘাটে অবস্থিত এ ঘড়িঘরটি আজও দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। জানা যায়, পৃথ্বিমপাশার বিখ্যাত জমিদার আলী আমজাদ খাঁ দিল্লির চাঁদনীচকে শাহজাদী জাহানারা কর্তৃক নির্মিত ঘড়িঘর দেখে মুগ্ধ হন। মনিপুরী জাদুঘর শহরের সুবিদবাজার এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এ জাদুঘর। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসী সম্প্রদায় মনিপুরীদের শত বছরের কৃষ্টি আর ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে এ জাদুঘরের মাধ্যমে। এ জাদুঘরে দেখা মিলবে কয়েকশ বছরের পুরোনো ঘণ্টা, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহূত নানান দ্রব্যসামগ্রী, যুদ্ধে ব্যবহূত সরঞ্জাম, মণিপুরীদের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প সামগ্রীসহ আরও অনেক কিছু। ওসমানী স্মৃতি জাদুঘর সিলেট শহরের কোর্ট পয়েন্টের কাছে নাইওরপুলে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গনি ওসমানীর বাস ভবন ‘নূর মঞ্জিল’। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের পরিচালনায় এ ঘরে বসেছে ওসমানী স্মৃতি জাদুঘর। এ জাদুঘর খোলা থাকে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা ৩০ মিনিট থেকে বিকাল ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত এবং অক্টোবর থেকে মার্চ সকাল ৯টা ৩০ মিনিটি থেকে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। শুক্রবার খোলা থাকে বিকেল ৩টা ৩০ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার এবং অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে জাতীয় জাদুঘর বন্ধ থাকে। এ জাদুঘরের কোনো প্রবেশ মূল্য নেই। মালনিছড়া চা বাগান শহর ছেড়ে বিমানবন্দরের দিকে একটু এগোলেই হাতের বাম পাশে সুন্দর এ চা বাগানটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো চা বাগান। ইংরেজ সাহেব হার্ডসনের হাত ধরে ১৮৫৪ সালে এ চা বাগানের প্রতিষ্ঠা। মালনিছড়ায় চা বাগানের ভেতরে ঘুরে বেড়ানোর মজাটাই আলাদা। অনুমতি নিয়ে চা বাগানের কোনো কর্মচারীর সহায়তায় ঘুরে দেখা যেতে পারে বাগানটি। মালনিছড়া চা বাগানের মধ্যে একটি কমলালেবুর বাগানও আছে। হযরত শাহ পরানের (র.) সমাধি হযরত শাহ পরান ছিলেন হযরত শাহ জালাল (র.)-এর ভাগ্নে। তিনিও ছিলেন একজন আধ্যাতিক ব্যক্তি। শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার পূর্ব দিকে দক্ষিণগাছের খাদিমপাড়ায় রয়েছে এই মহান ব্যক্তির মাজার। বিশাল বটগাছের ছায়াতলে এ মাজারে উঠতে হয় সিঁড়ি বেয়ে। প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্তের পদচারণায় মুখরিত থাকে পুরো মাজার এলাকা। কীভাবে যাবেন সড়ক, রেল ও আকাশ পথে ঢাকা থেকে সরাসরি সিলেট যাওয়া যায়। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকেও সিলেট আসতে পারেন। ঢাকা থেকে গ্রিন লাইন পরিবহন, সোহাগ পরিবহন, সৌদিয়া পরিবহনের এসি বাস যায় সিলেটে। ভাড়া ৮০০-১০০০ টাকা। এ ছাড়া ঢাকার ফকিরাপুল, কমলাপুর, সায়দাবাদ প্রভৃতি জায়গা থেকে শ্যামলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, সৌদিয়া, মামুন পরিবহন, সিলকম পরিবহন ইত্যাদি সংস্থার নন-এসি বাসও সিলেটে যায়। ভাড়া ৩০০-৫০০ টাকা। ঢাকার কমলাপুর থেকে মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৬.৪০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস, সপ্তাহের প্রতিদিন দুপুর ২টায় ছাড়ে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস এবং বুধবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ছাড়ে উপবন এক্সপ্রেস। ভাড়া এসি বার্থ ১০১৮টাকা, এসি সিট ৬৭৯ টাকা, প্রথম শ্রেণী বার্থ ৫৯০ টাকা, প্রথম শ্রেণী সিট ৩৯৫ টাকা, স্নিগ্ধা শ্রেণী ৫৬৪ টাকা, শোভন চেয়ার ২৯৫, টাকা, শোভন ২৪৫ টাকা, সুলভ ১৫০ টাকা। এ ছাড়া ঢাকা থেকে বাংলাদেশ বিমান (০২-৭১৬৮৮৪২), ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স (০২-৮৯৩২৩৩৮, ০২-৮৯৩১৭১২), রিজেন্ট এয়ারের (০২-৮৯৫৩০০৩) বিমান নিয়মিত চলাচল করে সিলেটের আকাশে। কোথায় থাকবেন সিলেট শহরে থাকার জন্য বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল আছে। তবে শহরের পাশে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকার জন্য সিলেটের সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা হলো শুকতারা প্রকৃতিনিবাস। শহরের পাশে খাদিমনগরে প্রাকৃতিক পরিবেশে পাহাড়ের উপরে শুকতারার কটেজগুলো। কক্ষ ভাড়া ৫০০০-৬৫০০ টাকা। তবে বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার ছাড়া সপ্তাহের অন্যান্য দিনে এ মূল্যের উপরে মিলবে ১০ ভাগ ছাড়। যোগাযোগ :শুকতারা প্রকৃতি নিবাস, উদ্দীনের টিলা, শাহপরাণ উপশহর, খাদিমনগর সিলেট। ফোন :০৮২১-২৮৭০৯৯৪-৫,০১৭৬৪-৫৪৩৫৩৫। www.shuktararesort.com এ ছাড়াও সিলেট শহরে বিভিন্ন মানের হোটেল আছে। শাহজালাল উপশহরে আছে পাঁচ তারকা মানের হোটেল রোজ ভিউ (০৮২১-৭২১৮৩৫), নাইওরপুল এলাকায় হোটেল ফরচুন গার্ডেন (০৮২১-৭১৫৫৯০), জেল সড়কে হোটেল ডালাস (০৮২১-৭২০৯৪৫), ভিআইপি সড়কে হোটেল হিলটাউন (০৮২১-৭১৮২৬৩), লিঙ্ক রোডে হোটেল গার্ডেন ইন (০৮২১-৮১৪৫০৭), শহরের বাইরে বিমানবন্দর সড়কে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের পর্যটন মোটেল (০৮২১-৭১২৪২৬), খাদিম নগরে জেসটেট হলিডে রিজর্ট (০৮২১-২৮৭০০৪০)। এ ছাড়া শহরের অন্যান্য সাধারণ মানের অন্যান্য হোটেল হলো আম্বরখানায় হোটেল পলাশ, (০৮২১-৭১৮৩০৯)। দরগা গেইটে হোটেল দরগাগেইট (০৮২১-৭১৭০৬৬)। দরগা গেইটে হোটেল উর্মি (০৮২১-৭১৪৫৬৩)। জিন্দাবাজারে হোটেল মুন লাইট (০৮২১-৭১৪৮৫০)।