‘এ বছরেই সরকারের সকল অফিস
ই-সার্ভিসের আওতায় নিয়ে আসা হবে’
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:১৯
মাত্র এক বছর পূর্বে বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ভেঙে নতুন একটি মন্ত্রণালয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। এই এক বছরে ডিজিটাল বাংলাদেশের হাল টেনে ধরতে মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে কয়েকবার। তার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে এই মন্ত্রণালয়ের সচিব হয়েছেন মো. নজরুল ইসলাম খান। তার সাথে কথা হয় সরকারের নানা ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে। তিনি বলেন, ‘এ বছরই সরকারের সব অফিসকে ই-সার্ভিসের আওতায় আনা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ তাদের সেবাগুলো অনলাইনে পেতে পারে। এ জন্য সরকারের সকল অফিসে ২ মেগাবাইট ডেডিকেটেড দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করা হবে।’ তার মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যেই দুইটি প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এই দুইটি প্রকল্প হলো ‘বাংলাগভনেট’ ও ‘ইনফো সরকার’।
কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান, সরকারের অন্যতম বড় একটি প্রতিশ্রুতি ছিল দেশকে তথ্যপ্রযুক্তি সেবার আধুনিকায়নের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ রূপান্তর করা। ‘রূপকল্প ২০২১ : ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার কাজ ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ২০১২ সালে বর্তমান সরকার কর্তৃক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট বেশ কিছু কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। নজরুল ইসলাম খান জানান, এসব কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও গতিশীল এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ে অধিকতর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ই-টেন্ডারিং ব্যবস্থা প্রবর্তন বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি। তিনি বলেন, ‘একটি মানসমপন্ন, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও কার্যকর ক্রয় পদ্ধতি তথা সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রমকে গতিশীল এবং এ বাবদ অর্থ ব্যয়ে অধিকতর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ইলেক্ট্রনিক টেন্ডার বা ই-টেন্ডারের আগমন। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা শর্তে ঠিকাদারগণ এই পদ্ধতিতে টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। ফলে ক্রয় কাজের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের হার ও গুণগতমান উভয়ই বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনভিপ্রেত বহিঃপ্রভাব তিরোহিত হবে যা আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির উপরও অনুকূল প্রভাব রাখতে সক্ষম হবে। অর্থাত্ একটি স্বচ্ছ, গতিশীল ও টেকশই ব্যবস্থা প্রবর্তিত হবে।’ ২০১২ সালে এর পূর্ণ ব্যবহার শুরু করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে ডিজিটাল স্বাক্ষর নিয়েও কাজ চলছে বলে জানান তিনি। ডিজিটাল স্বাক্ষর তথ্য প্রেরণকারীর পরিচয় নিশ্চিত করে। সাথে সাথে তথ্য বিনিময়কালে তথ্যটিতে কোনো অনভিপ্রেত পরিবর্তন রোধ করে। প্রচলিত পদ্ধতিতে কোনো দলিলে পরিচিতি নিশ্চিত ও অনভিপ্রেত পরিবর্তন রোধকল্পে যেমন হাতের লেখা স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়, ইলেক্ট্রনিক্যালি তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট জটিল গাণিতিক পদ্ধতি ঠিক তেমনি পরিচিতি নিশ্চিত ও অনভিপ্রেত পরিবর্তন রোধে কাজ করে। সাধারণত ইন্টারনেটে বা নেটওয়ার্কে আর্থিক লেনদেন বা অন্য কোন গোপনীয় লেনদেনের ক্ষেত্রে তথ্যের সঙ্গে ডিজিটাল স্বাক্ষর জুড়ে দেওয়া হয়। প্রতিটি দলিলের জন্য স্বাক্ষর হয় ভিন্ন ও গোপনীয়। ফলে নকলের কোনো সুযোগ নেই। প্রেরকের পরিচয় যাচাইয়ের কাজটিও হয় সফটওয়ারের মাধ্যমে। ডিজিটাল স্বাক্ষরছাড়া ইলেক্ট্রনিক লেনদেন সম্ভব নয়। কারণ, লেনদেন হতে হবে পরিচিতিসহ অনভিপ্রেত ও হস্তক্ষেপ মুক্ত।
রেকর্ডরুম থেকে নকল প্রাপ্তিসহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সকল সেবাসমূহ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে ‘জেলা ই-সেবাকেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্থাপিত কাউন্টারে এসে সরাসরি, ডাকযোগে, উপজেলা ই-সেবাকেন্দ্রে, ইউআইএসসি থেকে এবং অনলাইনে জেলা তথ্য বাতায়নের (District Web Portal) মাধ্যমে জনগণ আবেদন করতে পারবেন। আবেদনের পর আবেদনকারীকে আইডি নম্বরসহ প্রাপ্তিস্বীকারপত্র এবং সেবা প্রাপ্তির সম্ভাব্য তারিখ দেয়া হয়। এই আইডি নম্বর জানিয়ে আবেদনকারী অন-স্টপ কাউন্টারে এসে সরাসরি, এসএমএস করে, ফোনের মাধ্যমে, ডাকযোগে এবং ই-মেইলের মাধ্যমে সেবা প্রাপ্তির সর্বশেষ অবস্থা জানতে পারবেন। ইতোমধ্যে দেশের সকল জেলায় জেলা ই-সেবাকেন্দ্র স্থাপনের কাজ সমপন্ন হয়েছে। জনগণের দোরগোড়ায় সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দেশের সকল ইউনিয়নে স্থাপন করা হয়েছে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র। এসব তথ্য ও সেবাকেন্দ্র থেকে তৃণমূলের জনগণ মোবাইল ব্যাংকিং, জীবন বীমা সুবিধা, বিদ্যুতের বিল পরিশোধ, বিভিন্ন সরকারি ফরম, সরকারি ঘোষণা, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন বিষয়ক তথ্য ছাড়াও ই-মেইল করা, ইন্টারনেট ব্যবহার করা, মোবাইল ফোন রিচার্জ করা, কম্পিউটার কম্পোজ, প্রিন্ট দেওয়া ইত্যাদি সেবা পাচ্ছে।
জাতীয় শিক্ষক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং ইউএনডিপি’র অর্থায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রাম যৌথভাবে ই-বুক প্রণয়নের সাথে সম্পৃক্ত। ই-বুক হলো মুদ্রিত বইয়ের ইলেকট্রনিক সংস্করণ যা ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ কম্পিউটারসহ অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্র যেমন, ই-বুক রিডার, মোবাইল ফোন, পিডিএ, সিডি ও আইপ্যাডে পাঠযোগ্য। প্রাথমিক স্তরের ৩৩টি এবং মাধ্যমিক স্তরের ৭৩টিসহ মোট ১০৬টি পাঠ্যপুস্তক ইতোমধ্যেই ই-বুকে রূপান্তরের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানান নজরুল ইসলাম খান।
সরকারের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে মন্ত্রণালয় ও অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) মিলে ই-সার্ভিস প্রদান করবে। নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘২৪০০০ তথ্য বাতায়নের কাজ চলছে। এর জন্য ডাটা সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। এবার সব ওয়েব পোর্টালও একটি কমন প্ল্যাটফর্মে তৈরি হবে।’