প্রযুক্তি বিশ্ব ২০১২
যাদের হারিয়েছি
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:২০
সময়ের ধারাবাহিকতায় প্রাপ্তির খাতা যেমন পূর্ণ হয়, তেমনি হারানোর তালিকাও লম্বা হতে থাকে। সদ্য শেষ হয়ে যাওয়া ২০১২ সালে তেমনি প্রযুক্তি বিশ্বের নানা প্রাপ্তির মাঝেও আমাদের হারাতে হয়েছে প্রযুক্তি বিশ্বের কয়েকজন অসামান্য পথিকৃেক। আধুনিক প্রযুক্তির অর্জনের পেছনে তাদের অবদান অস্বীকার্য। তাদের কয়েকজনের কথা তুলে ধরা হলো এই লেখায়।
ডেভিড এল ওয়াল্টজ:সার্চ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক
ইন্টারনেট এমন একটি জায়গা, যেখানে রয়েছে সব ধরনের তথ্য। কোটি কোটি ওয়েবসাইটের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় ওয়েবসাইটটি খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন বিষয়। তবে এই কঠিন কাজটি আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছে ‘সার্চ ইঞ্জিন’ নামের এক প্রযুক্তি। সার্চ ইঞ্জিন না থাকলে শেষ পর্যন্ত ইন্টারনেট পরিণত হতো এক তথ্যের জঞ্জালে। এই সার্চ ইঞ্জিনের পেছনে যে ব্যক্তির অবদান অনস্বীকার্য তিনি হলেন ডেভিড এল. ওয়াল্টজ। ১৯৪০ সালে জন্মগ্রহণ করা ওয়াল্টজ ১৯৭২ সালে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য যে সন্দর্ভটি জমা দিয়েছিলেন, তাতে তিনি এক বিশেষ ধরনের এলগরিদম দেখিয়েছিলেন। যা কম্পিউটারকে ত্রিমাত্রিকভাবে কোনো কিছু পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা যুক্ত হতে পারে। আশির দশকে এসে তিনি এমন এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, যার মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে আধুনিক সার্চ পদ্ধতির সূচনা হয়। কম্পিউটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্যতম এক সূচনা নিয়ে আসে তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তি। আর বর্তমানে সব ক্ষেত্রেই বহুলভাবে ব্যবহূত সার্চ প্রোগ্রামের মূলেই রয়েছে তার উদ্ভাবন। গত বছর মার্চে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
জ্যাক ট্র্যামিয়েল:পার্সোনাল কম্পিউটারের অন্যতম জনক
পার্সোনাল কম্পিউটারের ইতিহাস বলতে গেলে আইবিএম বা অ্যাপল’র মতো প্রতিষ্ঠানগুলোই উঠে আসে আলোচনার শীর্ষে। তবে পার্সোনাল কম্পিউটারকে সর্বপ্রথম সাধারণ মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে দিতে যে প্রতিষ্ঠানটি বেশি ভূমিকা রেখেছে, তার নাম কমোডোর। আর কমোডোরের উদ্যোক্তা, প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই প্রযুক্তির ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছেন জ্যাক ট্র্যামিয়েল। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে অ্যাপল তাদের প্রথম পিসি দিয়ে বিশ্বকে চমকিত করে। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানেই ১৯৭৭ সালে তারা অ্যাপল ২ বাজারে নিয়ে আসার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এর আগেই কমোডোর প্রথম পিসি বাজারে ছাড়ে। ১৯৮০ সালে তারা প্রথম ৩০০ ডলারে মধ্যেই বাজারে ছাড়ে কমোডোর ৬সি২০, যা তখনকার সময়ে ছিল অকল্পনীয়। কমোডোর ৬৪ দিয়েও তিনি সাড়া পেয়েছিলেন প্রযুক্তি বাজারে। গত বছর ৮ এপ্রিল পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন ৮৪ বছর বয়সী ট্র্যামিয়েল।
ইউগেন পলি:টিভি রিমোটের উদ্ভাবক
রিমোট ছাড়া টেলিভিশন তো আজকের দিনে কল্পনাই করা যায় না। আজকের দিনে আমরা যে রিমোটগুলো ব্যবহার করে থাকি, তার উদ্ভাবককে আমরা হারিয়েছি গত বছরে। তিনি ইউগেন পলি। ১৯১৫ সালে জন্ম নেওয়া পলি প্রকৌশল বিষয়ে পড়ালেখা করলেও তা শেষ না করেই যোগ দেন কাজে। জেনিথ ইলেকট্রনিক্সে সাধারণ একজন কর্মী হিসেবে যোগ দিলেও পরবর্তীতে তিনি সেখানকার অন্যতম প্রকৌশলীতে পরিণত হন। তার এক সহকর্মী রবার্ট অ্যাডলার ১৯৫০ সালে প্রথম রিমোটটি তৈরি করলেও সেটি ছিল তারযুক্ত। এই সীমাবদ্ধতা দূর করে ১৯৫৫ সালে পলি তৈরি করেন বিশ্বের প্রথম তারহীন রিমোট, যার নাম ছিল ‘ফ্ল্যাশ-ম্যাটিক’। টিভি অন/অফ করা, চ্যানেল পাল্টানো এবং ভলিউম কমানো-বাড়ানোর কাজ করা যেত এই ‘ফ্ল্যাশ-ম্যাটিক’ দিয়ে। এর মাধ্যমে ইতিহাসে নিজেকে অমর করে রেখেছেন ইউগেন পলি। গত বছর মে মাসে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
রবার্ট এস লেডলি:সিটি স্ক্যানের উদ্ভাবক
চিকিত্সা শাস্ত্রের সাথে প্রযুক্তির ব্যবহার আজকের দিনে সাধারণ এবং অতাবশ্যক মনে হলেও একটা সময় তেমন ছিল না। চিকিত্সা শ্রাস্ত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারের সূচনায় যাদের অবদান রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম রবার্ট এস লেডলি, জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের ফিজিওলজি, কয়োফিজিক্স এবং রেডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক লেডলি তার লেখনির মাধ্যমে সবাইকে প্রযুক্তি ব্যবহারে উত্সাহিত এবং অনুপ্রাণিত করেছেন। তিনি নিজেও প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। ডিজিটাল কম্পিউটারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রোমোজোম বিশ্লেষণ, অটোমেটেড কম্পিউটারাইজড ট্রান্সভার্স অক্সিয়ালসহ নানা উদ্ভাবন রয়েছে তার। তবে গোটা শরীরের সিটি-স্ক্যান করার প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মধ্য দিয়েই তিনি স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। গত বছরের জুলাই মাসে আমরা হারিয়েছি অধ্যাপক রবার্ট-এস লেডলিকে।
ভিক্টর পুওর:মাইক্রোপ্রসেসরের অন্যতম উদ্ভাবক
আজকের তথ্য প্রযুক্তির যে যুগের সূচনরা হয়েছে, তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা সম্ভবত মাইক্রোপ্রসেসর। মাইক্রোপ্রসেসরের কল্যাণেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কম্পিউটার বা অন্যান্য ডিভাইসের আবির্ভাব ঘটেছে এ কথা বলাই যায়। স্বশিক্ষিত এই হার্ডওয়্যার প্রকৌশলী যখন তত্কালনি কম্পিউটার টার্মিনাল কর্পোরেশনে (পরবর্তীতে ডাটাপয়েন্ট কর্পোরেশন) কর্মরত ছিলেন, তখন যে দলটি বিশ্বের প্রথম সফল কম্পিউটার মাইক্রো প্রসেসর তৈরি করেছিল, তার অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। ইন্টেল ৮০৮০ মাইক্রোপ্রসেসরের আর্কিটেকচারটি তার হাতেই করা। বর্তমানে এক্স৮৬ ফ্যামিলির যে মাইক্রোপ্রসেসর আর্কিটেকচার রাজত্ব করছে তার মূলেই ছিলেন তিনি। গত বছরের আগস্ট মাসে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন এই নিভৃতচারী ৭৯ বছর বয়সে।
বিল মাগ্রিজ:প্রথম ল্যাপটপের ডিজাইনার
চলতি শতাব্দীর শুরু থেকেই ল্যাপটপের রাজত্ব শুরু হলেও গত শতাব্দীর আশির দশকে এর যাত্রা শুরু। পিসি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে উঠতেই আবির্ভাব ল্যাপটপের। আর ১৯৮২ সালে বিশ্বের প্রথম ল্যাপটপটি ডিজাইন করে যিনি প্রযুক্তির ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছেন, তিনি বিল মাগ্রিজ। গ্রিড সিস্টেমস কর্পোরেশনে কর্মরত বিল মাগ্রিজের ডিজাইন করা প্রথম ল্যাপটপটির নাম ছিল গ্রিড কম্পাস। ৮০৮৬ প্রসেসরে চালিত এই ল্যাপটপে ছিল ৩৪০ কে ম্যাগনেটিক বাবল মেমোরি, ২০০ বড মডেম। এর ওজন ছিল ১১ পাউন্ড বা ৫ কেজির কিছু কম। সেই সময়ের তুলনায় কমই বটে। ৮০০০ ডলার মূল্যের গ্রিড কম্পাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে কম্পিউটিং বিশ্বে। এর ডিজাইনার মাগ্রিজ গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে ৬৯ বছর বয়সে দেহ ত্যাগ করেন।
জোসেফ উডল্যান্ড:বারকোডের উদ্ভাবক
বিভিন্ন পণ্যের সাথে বারকোড যুক্ত হওয়া গোটা বিশ্বের ইতিহাসেই এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আর এই বারকোডের উদ্ভাবক হিসেবেই চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন নরম্যান জোসেফ উডল্যান্ড। নিউ জার্সিতে জন্ম নেওয়া জোসেফ যন্ত্র প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ড্রক্সেল ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে পড়ালেখা করা জোসেফ তার প্রতিষ্ঠানের এক ডিনের পরামর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই বারকোড উদ্ভাবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। শুরুতে তার বারকোডের ধারণাটি সমাদৃত না হলেও একটা সময় গিয়ে এটি পরিণত হয় অত্যাবশ্যক উপাদানে। গত বছর ডিসেম্বরে ৯১ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।