প্র জ ন্মে র জু টি
বিতর্কে বিশ্বজয়
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৩১
বিশ্ব বিতর্কের দরবারে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করা এই দুই নক্ষত্র ছেলেবেলা থেকেই একটু অন্য রকম ছিলেন। যেকোনো বিষয়ে তাদের আগ্রহের কমতি ছিল না। রাতিব কলেজ পর্যায়ে থাকতেই বিতর্ক শুরু করেন। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর কিছুদিন বিরতি দিয়েছিলেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেট ক্লাবের উদ্যোগে রাতিব ও আকিব আবার বিতর্ক শুরু করেন। শুরুর পর থেকেই তারা বেশ ভালো করতে থাকেন। আকিবও স্কুল পর্যায়ে কিছু বিতর্ক করেছিলেন। ২০১২ সালে আকিব আর রাতিব আইবিএ, নর্থসাউথ এবং এলসিএলএস আয়োজিত বিতর্ক প্রতিযোগিতাতেও চ্যাম্পিয়ন হন।
বিতর্ক জগতে খুব উচ্চমানের প্রতিযোগিতা হলো—ওয়ার্ল্ডস। বার্লিনে অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল ৪০০টি দলের ৮০০ জন তার্কিক। এ ছাড়াও বিচারক এবং অন্যান্য অফিসিয়াল মিলিয়ে মোট অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাবে। সাধারণত বনেদি কোনো ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয় হোস্ট-এর ভূমিকা পালন করে থাকে। যেমন মার্কিন দেশের প্রথিতযশা প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় আজ অবধি তিনবার এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। ক্রিসমাস এবং নিউ ইয়ারের ছুটির সময় অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে টুর্নামেন্ট, বিভিন্ন দেশ থেকে আগত তার্কিক এবং বিচারকবৃন্দ প্রতিযোগিতা চলাকালীন সময়ে ক্যাম্পাসের ছাত্রাবাসেই বসবাস করেন।
রাতিব ও আকিব বার্লিনে উত্সবের পাশাপাশি বেশ আনন্দেই কাটিয়েছেন ক’টা দিন। তারা জানালেন দিনভর সিরিয়াস ডিবেটের পরে রাতভর পার্টি-মাস্তি করাটা প্রাণের উচ্ছাসে ভরপুর তারুণ্যের কাছে এক প্রকার অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে ওয়ার্ল্ডসের নিউ ইয়ারের বর্ষবরণ পার্টিটা সত্যিই দেখার মতো। আর প্রতিযোগিতার আরেকটা আকর্ষণীয় দিক হলো এর সামাজিক মেলবন্ধন। অনেক অনেক দেশ থেকে আগত বিভিন্ন জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষের মেলবন্ধন এই ওয়ার্ল্ডস। কমন বিষয় একটাই—সবাই তরুণ, সবাই ভালোবাসেন বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তি-তর্কের লড়াই, জানালেন রাতিব।
আকিব মনে করেন, যেসব বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয় এই ওয়ার্ল্ডসে, অনেক ক্ষেত্রে তা বাকি জীবন অটুট থেকে যায়। বাংলাদেশ থেকে প্রতিযোগী দল ওয়ার্ল্ডসে যাচ্ছে প্রায় ২০-২৫ বছর ধরে। ’৯০-এর দশকের মাঝামাঝি প্রথমবারের মতো ওয়ার্ল্ডসে অংশ নেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ থেকে কয়েকজন তার্কিক। এরপরে আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাদেশি তার্কিক ওয়ার্ল্ডসে গিয়েছেন। ২০০৯ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। মাত্র তিন-চার বছরের মাথায় তাদের এই অভাবনীয় সাফল্য প্রমাণ করে যে মেধায়-মননে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা তাদের পূর্বসুরিদের তো অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে, বরং আজ বিশ্বের অন্যান্য জাতিদের সাথে প্রতিযোগিতা করছে সমান তালে। আর তাদের মেধা, নৈপুণ্য আর গগনচুম্বী আত্মবিশ্বাস দিয়ে হারিয়েও দিচ্ছে বাকি বিশ্বকে!
আলোচনায় এই দুই মেধাবী শিক্ষার্থী জানালেন, মূল প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ন দলগুলো এখন পর্যন্ত সব ইংরেজি-ভাষী দেশ থেকেই আসছে। গত ৩৩ বছরের বিজয়ী দলগুলোর নাম লেখা আছে। বুঝাই যায়, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, কানাডা আর আমেরিকার ব্যাপক আধিপত্য। বিশেষ করে কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারাবাহিক সাফল্য একদম চোখে পড়ার মতো। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ও সিডনি, ব্রিটেনের অক্সফোর্ড এবং গ্লসগো বিশ্ববিদ্যালয়—ওয়ার্ল্ডস অঙ্গনে এদের সাফল্যের ঐতিহ্য বহুদিনের। রাতিব ও আকিবের কাছে বিতর্কের ফরমেট সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘ওয়ার্ল্ডস বিতর্কের ফরম্যাট হলো ‘ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি’ স্টাইল। খুব বেশি ডিটেইলসে না গিয়ে মোটা দাগে এই স্টাইলের ডিবেট হয় নিম্নরূপ। ব্রিটিশ সাংসদীয় ধারায় একটি তর্কের বিষয় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। নানা রকম মোশন হতে পারে, রাজনীতি-অর্থনীতি অথবা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে। মোশনের পক্ষে থাকে দুটো দল, বিপক্ষে দুটো দল, আর প্রতিটি দলে থাকেন ২ জন করে তার্কিক। তাই একেকটি ডিবেটে অংশ নেন মোট আটজন। যেহেতু সাংসদীয় ধারার বিতর্ক, তাই মোশনের পক্ষে যারা বক্তব্য দেবেন, তাদের ডাকা হয় সরকারি দল, আর যারা মোশনের বিপক্ষে বিতর্ক করেন, তারা হলেন বিরোধী দল।
রাতিব ও আকিব দু’জনই তাদের পরিবার থেকে বিতর্কের ব্যাপারে সব সময়ই উত্সাহ পেয়েছেন। বিতর্কের সুবাদে প্রায়ই তাদের রাতে বাড়ি ফিরতে হতো, অথবা বাইরে যেতে হতো। সেই দিকগুলো বেশ ভালোভাবেই নিয়েছিলেন তাদের পরিবার। আর তাদের চেষ্টা ছিল সবার আস্থা আর ভালোবাসার জায়গাটিতে শ্রদ্ধা থেকে বড় একটা সফলতা অর্জন করা। এবার সেটা তারা করে দেখিয়েছেন। নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই এখন তাদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। তাদের হাত ধরেই যে বিশ্ব দরবারে আরেকবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াল বাংলাদেশের পতাকা। তর্ক-বিতর্কের এই দুনিয়ায় তারা জানান দিলেন, বাংলাদেশ আসছে এক সম্ভাবনাময় আগামী নিয়ে, সব ক্ষেত্রেই তারা একদিন শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে। রাতিব আর আকিবের মতো আমাদেরও বিশ্বাস, নতুন প্রজন্ম যেদিন দেশ চালাবে সেদিনের বাংলাদশ হবে আরও সুন্দর। এই দুই তরুণ তুর্কীকে প্রজন্মের অভিনন্দন।
রাতিব মর্ত্তজা আলী
অর্থনীতি বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
ডাকনাম :রাতিব
জন্ম তারিখ ও স্থান :সেপ্টেম্বর ২৯, ঢাকা
মায়ের নাম :রোখসানা আলী
বাবার নাম :মো. শাহরিয়ার আলী
প্রথম স্কুল :ব্লুমিং ফ্লাওয়ার স্কুল
প্রিয় উক্তি :উইনিং ইজ নট এভরিথিং, ইটস বি অনলি থিং।
প্রিয় পোশাক :গেঞ্জি, জিন্স
অবসর কাটে যেভাবে :টিভি দেখে
সাফল্যের সংজ্ঞা :যে কাজটা করছি, সেটা করে খুশি থাকতে পারাটাই সফলতা।
আকিব ফারহান হোসেন
ব্র্যাক বিজনেস স্কুল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
ডাকনাম :আকিব
জন্মতারিখ ও স্থান :১৩ ফেব্রুয়ারি, ঢাকা
মায়ের নাম :ড. ইয়াসমিন ইসলাম
বাবার নাম :প্রফেসর মো. আফজাল হোসেন
প্রথম স্কুল :সানবীম
প্রিয় উক্তি :ট্রাই টু বি ডিফারেন্ট
প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট
অবসর কাটে যেভাবে :সাঁতার কেটে আর ভিডিও গেমস খেলে
সাফল্যের সংজ্ঞা :নিজের ব্যক্তিগত সফলতায় সবাইকে সন্তুষ্ট করা।