শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে একটি স্টিল মিলে গলিত লোহা গায়ে পড়িয়া ১৩ জন শ্রমিক মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন। তাহাদের মধ্যে দুইজন মারা যান। বাকিরা এখনো চিকিত্সাধীন। তন্মধ্যে অন্তত ছয়জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলিয়া জানা গিয়াছে। এই মিলে রড তৈরির জন্য যখন লোহা গলানো হইতেছিল, তখন এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে। মিলটিতে ছিল না পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। ছিল না কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো নজরদারিও। এভাবে আমাদের দেশে কর্মস্থলে প্রায়শ দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। ইহার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সার্বিক অসচেতনতা ও উদাসীনতাই বড় দায়ী। বিশেষত রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার বহুতল ভবনে আমাদের নির্মাণ শ্রমিকরা যে ঝুঁকি নিয়া কাজ করেন, সেখানেও প্রায় সময় ঘটিতেছে দুর্ঘটনা। দেওয়াল প্লাস্টার করা বা রং করিতে গিয়া অনেকেই পড়িয়া গিয়া হতাহত হইতেছেন।
উল্লেখ্য, তৈরি পোশাক কারখানায় উপর্যুপরি অগ্নিকাণ্ড ও সাভারের রানাপ্লাজা দুর্ঘটনার পর চাপে পড়িয়া হইলেও এই খাতের কর্মপরিবেশ উন্নয়নে ব্যাপক কাজ হইয়াছে। এইজন্য আমরা প্রশংসিতও হইয়াছি। কিন্তু ইহার বাহিরেও যে আরও নানা ঝুঁকিপূর্ণ খাত আছে, সেইখানকার কর্মপরিবেশের উন্নয়নে আমরা তেমন মনোযোগী নই বলিলেই চলে। আবার আমাদের দেশের প্রচলিত শ্রম আইনে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিধান করা হইয়াছে। কিন্তু আইন থাকিলেও আইনের প্রয়োগ সেইভাবে নাই। যাহারা কারখানা পরিদর্শনের দায়িত্বে আছেন, অভিযোগ রহিয়াছে যে, তাহারা বকশিশ পাইয়াই সন্তুষ্ট থাকেন। এই দায়িত্বহীনতা, অনিয়ম ও গাফিলতির কারণেও বেশির ভাগ সময় কর্মস্থলে দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হইতেছে। এইসকল বৃহদাকার নির্মাণ কাজ যত বৃদ্ধি পাইতেছে, কর্মস্থলে শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠিতেছে। ইহাছাড়া রাজধানীসহ দেশের প্রায় সর্বত্রই ওয়েল্ডিং, প্লাস্টিকজাত ও রাসায়নিক সামগ্রীসহ নানা ধরনের যেইসকল ছোটো ও মাঝারি কারখানা রহিয়াছে, সেইখানে চরম ঝুঁকির মধ্যে কাজ করিতে হইতেছে হাজার হাজার মানুষকে। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটজনিত অগ্নিকাণ্ড, বয়লার বা রাসায়নিক গুদামে বিস্ফোরণ কিংবা নির্মীয়মান ভবন হইতে ভারী কিছু পড়িয়া ঘটিতেছে হতাহতের মতো দুঃখজনক ঘটনা।
সরকারি ও বেসরকারি সকল পর্যায়ে কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ ও স্বাস্থ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করিবার জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালে জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি নীতিমালা ২০১৩ প্রণয়ন করে। এই মন্ত্রণালয়ের সচেতনতামূলক এক নির্দেশনায় বলা হইয়াছে, উঁচু স্থানে কাজ করিবার সময় লিফট, সেফটি বেল্ট, শক্ত দড়ি-মাচা ব্যবহার, কাজের সময় মাথায় হেলমেট, পায়ে গামবুট ও মুখে মাস্ক ব্যবহার করিতে হইবে। বিদ্যুতের তারের কাছে ভেজা রড উঠানো-নামানো হইতে বিরত থাকিতে হইবে। কিন্তু এইসকল নির্দেশনা খুব একটা মানা হয় না। যেমন—সাউথ এশিয়ান ইয়ুথ রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্টের (সেরিড) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, বাংলাদেশে বিশেষত নির্মাণশিল্পে কর্মক্ষেত্রে ৪৯ শতাংশ শ্রমিক সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করেন না। ইহাছাড়া উপযুক্ত নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শ্রমিক নিয়োগ করা হইতেছে। ফলে তাহারা নানা ধরনের দুর্ঘটনায় পড়িতেছেন। অতএব, যাহাদের জন্য এই নিরাপত্তা তাহাদেরও সচেতনতার পরিচয় দিতে হইবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশপাশি তাহাদের নেতাদেরও কর্মপরিবেশ উন্নয়নে তত্পর হইতে হইবে।