প্রজন্মের ভাস্কর

আকৃতি থেকে প্রকৃতি প্রতিটি অংশে থাকে শৈল্পিক ছোঁয়া, প্রতিটি গাঁথুনিতে থাকে মেধাবী চিন্তার জোগান। এমনটাই হচ্ছে ভাস্কর্য। নিজের মনের ভাবনা ও শিল্পবোধের সমন্বয়ে তারা নির্মাণ করেন একেকটি নান্দনিক শিল্পকর্ম, যা দেখে আমরা সবাই বিস্মিত হই। তবে এসব শিল্পকর্ম শুধু আনন্দ বা বিস্মিত হওয়ার জন্য নয়, এর পেছনে থাকে একটি গল্প বা মেসেজ। যা সমাজের নানা প্রেক্ষাপট থেকেই সৃষ্টি। একজন ভাস্কর সমাজের হাসি-কান্না, দুঃখ-উচ্ছ্বাস সবকিছুই মেলে ধরেন তার কাজে। তাই এই প্রজন্মের কয়েকজন ভাস্করদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। যারা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে স্বকীয় অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। পুরো আয়োজনটি দেখুন পরের পৃষ্ঠায়। আয়োজনটি গ্রন্থনা এবং সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র তেজস হালদার জস সার্থক শিল্পকর্ম শিল্পীর শৈল্পিক সত্তার পরিচায়ক। কোনো কিছুই শিল্পীকে আটকে রাখতে পারে না শিল্পের টানে। ছেলেটা তখন ছোট, দুষ্টুমি করে দিনমান। সারাদিন অস্থির করে রাখে বাসা। বাড়ির ছোট ছেলে, সবার অতি আদরের সেই ছেলেকে একদিন ভর্তি করিয়ে দেওয়া হলো আবাসিক স্কুলে। সমুদ্রবন্দর মংলায় সেই স্কুলটা। পড়ার সময়ে সবাই যখন বাড়ির কাজ করতে ব্যস্ত, গোপনে সে খাটের নিচে বসে করত মাটি দিয়ে ভাস্কর্য তৈরি। শিল্পের বিচারে সেদিন সেগুলোকে ভাস্কর্য বলা না গেলেও এই প্রজন্মের একজন ভাস্করের জন্ম সেদিন সেভাবেই খাটের নিচে বসে। বলছিলাম তেজস হালদারের কথা, বাবা-মায়ের আদরের জস। এই ছেলেটাই দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় স্নাতক করে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এখন পুরোদস্তুর মনোনিবেশ করেছেন ভাস্কর্য তৈরিতে। তার শুরুর গল্পটা এ রকমই, মংলার সেই আবাসিক স্কুলেই তাদের একটা ক্লাসে শেখানো হতো মাটির কাজ। মাটির কাজ করার সময়েই তার আগ্রহের সূচনা হয়। প্রথম তিনি করেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবক্ষ মূর্তি। সেদিন প্রধান শিক্ষক তার কাজে মুগ্ধ হয়ে ডেকে পাঠালেন, প্রশংসা করলেন খুব। সেদিনই ভেবেছিলেন শিল্পী হবেন। তারপর সেই পড়াশোনার মাঝে মাঝে চলত কাজ। এইচএসসির সময় আর সেভাবে কাজ করা হয়নি। অনেকে বলেছিলেন চারুকলায় পড়ে কী হবে! কিন্তু তিনি তার আগ্রহের জায়গাটি ধরতে পেরেছিলেন। সবার চিন্তা-ভাবনা আর নেতিবাচক কথাকে পেছনে রেখেই তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন সেদিন। চারুকলায় ভর্তি হয়ে বেছে নিলেন ভাস্কর্য। তৃতীয় বর্ষে থেকেই নিজের একটা কাজের জন্য পেয়ে গেলেন ‘গোল্ড মেডেল’। তারপর চতুর্থ বর্ষে পেলেন এশিয়ান অ্যাওয়ার্ড। এত অল্প বয়সেই আমাদের দেশে তিনিই প্রথম পান এই সম্মাননা। তারপর চাইছিলেন কাজ নিয়ে প্রদর্শনী করবেন। ২০০৭ সালের দিকে বেঙ্গল গ্যালারিতে হয়ে গেল তার একক প্রদর্শনী। বাংলাদশের মানুষ যে এই শিল্পটিকে ভালোবাসে তার প্রমাণ সেদিন তিনি পেয়েছিলেন। তার ৫৫টি ভাস্কর্যই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল প্রদর্শনীতে। এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি। সমালোচকদের কটু কথা এড়িয়ে তিনি কাজ করে চলেছেন। নিজেই এখন স্টুডিও দিয়েছেন। কাজ করছেন আপন মনে। তিনি মনে করেন, যদি কেউ এটাকেই পেশা আর নেশা হিসেবে নিয়ে আঁকড়ে থাকতে চায় তাহলে তার স্টুডিও দরকার। আর তিনি বলেন, ‘যদি আমাদের দেশে ভাস্কর্যের বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দিয়ে স্থাপনায় পরিণত করা যায়, তাহলে আরও কাজের ক্ষেত্র বাড়বে। আর এই বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে অনেকেই ভিন্ন দিকে চলে যায়।’ জস মনে করেন, এতে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কাজ করা হয়। কেউ চাইলেই করতে পারেন না যেকোনো শিল্প, তার জন্য সেভাবে মনোনিবেশ করতে হয়। অন্য কাজের ফাঁকে ফাঁকে শিল্পচর্চা বা যেকোনো সৃজনশীল কাজ সম্ভব নয়। আমাদের দেশে নতুন অনেক মেধাবীরা এগিয়ে আসছে সেটা অনেক ভালো। তবে জস মনে করেন, ইন্টারনেট থেকে অনুকরণ করার চেয়ে সেগুলো নিয়ে ভেবেচিন্তে কাজ করলেই বরং স্বকীয়তার একটা প্রকাশ ঘটে। এই বিষয়গুলোতে তরুণরা আরও বেশি আগ্রহী হবে আশা তার। চার ভাইবোনের মাঝে সবার ছোট সন্তান তেজস হালদার। পরিবারের সবার ভালোবাসা পেয়েছেন তাই সব সময়। তার কাজের অন্যতম অনুপ্রেরণা বাবা এখন আর নেই, মা আছেন তাদের মাঝে। অন্য ভাইবোনেরাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তিনি স্বপ্ন দেখেন একটা স্টুডিও করবেন ভাস্কর্য তৈরির জন্য, যেখানে অনেকেই আসবে, কাজ করবে আর ভাবনাতর বিনিময় হবে। নতুন নতুন ভাবনার আশ্রয়ে নবপ্রজন্মের হাত ধরেই তো আমরা এগিয়ে যাব সমৃদ্ধির পথে। তেজস হালদার জস ডাক নাম :জস জন্ম তারিখ ও স্থান :৪ জুলাই, গোপালগঞ্জ মায়ের নাম :আরতী হালদার বাবার নাম :মণিন্দ্রনাথ হালদার প্রথম স্কুল :সেইন্ট পলস উচ্চ বিদ্যালয়, মংলা প্রিয় মানুষ :আমার মা প্রিয় উক্তি :বর্তমানই ভবিষ্যত্ তৈরি করে দেয়। প্রিয় পোশাক :টি-শার্ট, জিন্স অবসর কাটে যেভাবে :সিনেমা দেখে সাফল্যের সংজ্ঞা :পরিশ্রম আর অধ্যবসায়। ---- লিটন পাল রনি দাদার নাম মেঘলাল পাল। এই মেঘলাল পালের হাত ধরেই ঢাকার অদূরে ধামরাই থানায় শুরু হয় ধাতব ঢালাইয়ের কাজ। ইতালিয়ান লস্ট ওয়াক্স প্রসেসে ধাতব ঢালাই বাংলাদেশে একমাত্র এই ধামরাইতে করা হয়। দাদার পরবর্তীতে বাবা আনন্দ পালও নিজেকে নিয়োজিত করেন এই পেশায়। পারিবারিক পেশার কারণে তাদের বাড়িতে আনাগোনা ছিল অনেক ভাস্কর্য শিল্পীর। সেই সূত্রেই ছোটবেলা থেকেই অনেক জ্ঞানী-গুণী ভাস্কর ও শিল্পীর সান্নিধ্য পেয়েছেন তিনি। এই সান্নিধ্য এবং নিজেরে ভেতরের সহজাত প্রবৃত্তিই তাকে শিল্পী হতে উত্সাহ জুগিয়েছে বলে মনে করেন প্রজন্মের মেধাবী ভাস্কর লিটন পাল রনি। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র। ১৯৮৭ সালে ধামরাইয়ে জন্ম তার। জন্মের পর থেকেই দেখে আসছেন পারিবারিক পেশা হিসেবে মূর্তি বানানোর কলাকৌশল। কৌশলগুলোকে পেশাগত না করে পরম ভালোবাসায় নিজের মজ্জাগত করে নেন সেই ছোটবেলা থেকেই। কখনও খেলার ছলে, কখনও সময় কাটাতে হাতে তুলে নিয়েছেন কাঠ বা মাটি। পেশাগতভাবে তাদের বাড়িতে বানানো হতো ঐতিহ্যবাহী সব মূর্তি ও পুতুল। কখনও বাঁশি হাতে কৃষ্ণ অথবা গরুর পিঠে বসা দুর্গা। কিন্তু এসব ঐতিহ্যগত মূর্তিগুলো তাকে খুব বেশি টানত না। তাই ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও পারিবারিক পেশাকে গ্রহণ না করে আধুনিক ভাস্কর্য শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার উদ্দেশ্যে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। ভবিষ্যতে স্বাধীনভাবে ভাস্কর্য চর্চাকে পেশা হিসেবে নেওয়াই তার ইচ্ছা। ইচ্ছা বাংলাদেশের ভাস্কর্যে নতুন কোনো মাত্রা যোগ করা। বাংলাদেশের ঐতিহ্যগুলোকে বা লোকজ উপাদান বিষয়গুলোকে নিজস্ব ধারায় আধুনিক ভাস্কর্য রূপে সমগ্র বাংলাদেশব্যাপী ছড়িয়ে দেবেন এমন স্বপ্ন দেখেন তিনি। তার এই শিল্পী জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে করা কাজগুলোর মধ্যে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত সৈনিকের ভাস্কর্য, বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সময় করা বনানীর মোড়ে ক্রিকেটারদের ভাস্কর্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া আরও অনেক প্রবীণ ভাস্করের সাথে বিভিন্ন ভাস্কর্য নির্মাণের কাজে তিনি অংশ গ্রহণ করেছেন। ভাস্কর্য নির্মাণের মাধ্যম হিসেবে ধাতুই তার প্রথম পছন্দ। যদিও উচ্চমূল্যের কারণে মাধ্যম হিসেবে ধাতু আমাদের দেশে খুব বেশি প্রচলিত না। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে মাধ্যম হিসেবে ধাতুর ব্যবহার আরও বেশি হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের রুচির পরিবর্তনই তাকে আশা জোগাচ্ছে বলে তিনি জানান। এই শিল্পের অগ্রগতির প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে তিনি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবকেই দায়ী করেন। তা ছাড়াও চিত্রকর্মের মতো ভাস্কর্যকে প্রচলিত শিল্পমাধ্যম হিসেবে সবশ্রেণীর মানুষ এখনও যে গ্রহণ করতে পারেনি এই বিষয়কেও দায়ী মনে করেন তিনি। শুধুমাত্র ফিগার এক্সপ্রেশনকে ভাস্কর্যের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে আধুনিক ভাস্কর্যের প্রচলিত ধারণাকে বদলে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলা এই উদ্যমী তরুণের ভেতর থেকে আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের আব্দুর রাজ্জাক বা হামিদুজ্জামানকে খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষায় রইলাম আমরা। লিটন পাল রনি ডাক নাম :রনি জন্ম তারিখ ও স্থান :৪ জানুয়ারি, ঢাকা। মায়ের নাম :বীনা পাল বাবার নাম :আনন্দ পাল প্রথম স্কুল :ধামরাই হার্ডিংস হাই স্কুল প্রিয় মানুষ :আমার বাবা প্রিয় উক্তি :নো রিক্স, নো গেইন প্রিয় পোশাক :শার্ট, প্যান্ট অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে, সাফল্যের সংজ্ঞা :কষ্ট ছাড়া কিছুই মেলে না। ---- রূপম রায় তার স্কুল-কলেজ দুটোই কেটেছে গ্রামে। স্কুলজীবনে চারুকলা বিষয়ে বরাবরই ভালো করতেন এবং বন্ধুদেরও সাহায্য করতেন। তখন জানতেন না এ বিষয়ে পড়াশোনা করা যায়। বাবাই প্রথম চারুকলার কথা বলে তাকে এবং উত্সাহ দেয় চারুকলায় পড়ার জন্য। এসএসসি’র পর প্রথমে এক একাডেমীতে ভর্তি হন। সেখানকার স্যাররা তার কাজ দেখে প্রশংসা করে এবং বলে এটা নিয়েই পড়াশোনা করতে। এইচএসসি পরীক্ষার পর বড় ভাইয়ের সাথে ঢাকায় আসেন এবং চারুকলায় পরীক্ষা দিয়ে চান্স পান। এভাবেই সুপ্ত ভালোলাগার স্থানে তার আসা, কথা বলছিলাম এই প্রজন্মের মেধাবী ভাস্কর রূপম রায় সম্পর্কে বন্ধুদের কাছে যিনি রুমি নামেই পরিচিত। গ্রামের শৈশব যেমন হয়, তার শৈশব তেমনি কেটেছে। বিভিন্ন ফলের গাছ, পুকুর, নদী ছিল তার প্রিয় স্থান। আর পরিবার থেকেও পেয়েছেন অবাধ স্বাধীনতা। দুই ভাই এক বোনের মাঝে রুমির অবস্থা সবার ছোট। ভাই-বোন, মা-বাবাকে নিয়েই তার পরিবারিক আবহ। চারুকলায় ভর্তি হওয়ার পাঁচ মাস আগে তার বাবা মারা যান। বাবাকে চারুকলায় ভর্তির সংবাদটি না দিতে পারাটা তার আজন্ম ব্যর্থতা বলে তিনি মনে করেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে রুমি বলেন, ‘ঢাকাসহ নানা জায়গায় আমার কিছু ‘কমিশন ওয়ার্ক’ আছে। আর আমি বর্তমান কাজ করছি সাউন্ড নিয়ে। যার শিরোনাম ‘শব্দের অন্তঃপ্রকৃতি’। এই সিরিজে আমি বেশ কিছু কাজ করেছি এবং করছি। সাউন্ড নিয়ে কাজ করার পেছনে বর্তমান সময়ের সাউন্ডের অভিজ্ঞতাকে আমি কাজে লাগিয়েছি। আদিম কাল থেকেই মানুষের অনুভূতি প্রকাশের প্রধান মাধ্যম শব্দ। যে কারণে শব্দের সাথে ব্যক্তিক সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কিন্তু সময়, কাল ভেদে এই শব্দের ভিন্নতা দেখা যায়। আমার চারপাশের শব্দ আমার অনুভূতিকে বারবার পরিবর্তন ঘটায়। সেই ভিন্নতার অনুভূতির শব্দকে আমি কয়েকটা ক্যাটাগরিতে ফেলার চেষ্টা করি। এই পর্যবেক্ষণকে পরবর্তীতে আরও সংক্ষিপ্ত করে একটা মৌলিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করি এবং এই ধরনের শব্দগুলোকে আমি তিনটি ক্যাটাগরিতে ফেলি : ডিরেক্ট সাউন্ড, ইনডাইরেক্ট সাউন্ড, ইকো। ডিরেক্ট সাউন্ড বলতে আমি প্রকৃতি থেকে আসা শব্দকে বুঝিয়েছি। ইনডিরেক্ট সাউন্ড বলতে মানুষের তৈরি কৃত্রিম শব্দকে বুঝিয়েছি এবং ইকো বলতে নিজের শব্দ নিজে শোনাকে বুঝিয়েছি।’ তার করা প্রতিটি কাজের কনসেপ্টের পেছনে যে বিষয়গুলো বেশি প্রাধান্য পায় এবং এ ক্ষেত্রে তার স্বাচ্ছন্দ্যবোধ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বর্তমান সময়ের মানুষ। বর্তমান সময়ের নানাবিধ অভিজ্ঞতাকে আমি আমার কাজে প্রয়োগ করি। আসলে যা বর্তমান সময়ে নৈতিকতার সাথে সম্পর্কিত। আর প্রত্যেকটি বিষয়ই আমি নিজে অনুভব করে কাজ করি এবং অন্যের অনুভূতিগুলোর মাধ্যমে আমার অভিজ্ঞতার ব্যাপকতা আনি।’ এই প্রজন্মের কাছে পেশা হিসেবে ভাস্করের চাহিদা এবং এ প্রজন্ম সম্পর্কে তার মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মূলত আমাদের বেড়ে ওঠা নানাবিধ শিল্প-কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সঠিকভাবে আমরা দেখি কম। আমি মনে করি বর্তমান সময়ে তরুণ সমাজে পরিবর্তন এসেছে। আমাদের মৌলিক চাহিদার বাইরেও একটা চাহিদা আছে। আর সে চাহিদা মেটায় শিল্প। আমি মনে করি বর্তমান তরুণরা যান্ত্রিকতার বাইরে এসে তারা শিল্পকে গ্রহণ করছে।’ রূপম রায়ের ভবিষ্যত্ স্বপ্ন ভাস্কর্য তথা এই শিল্পের সাথেই থাকা এবং সাধারণ মানুষকেও শিল্পের সাথে যুক্ত করা। রূপম রায় ডাক নাম :রুমি জন্ম তারিখ ও স্থান :৪ মে, দাকোপ, খুলনা। মায়ের নাম :সবিতা রায় বাবার নাম :প্রতাপ রায় প্রথম স্কুল :হরিণটানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :বাবা-মা, ভাইবোন প্রিয় উক্তি :‘নিজেকে জান’ (সক্রেটিস) প্রিয় পোশাক :টি-শার্ট, শার্ট, জিন্স ও পাঞ্জাবি অবসর কাটে যেভাবে :আড্ডা দিয়ে, গান শুনে, বই পড়ে, সিনেমা দেখে সাফল্যের সংজ্ঞা :কাজের মাধ্যমে আত্মিক তৃপ্তি। ----- সৈয়দ তারেক রহমান ছোটবেলা থেকেই ছবি আকার সাথে যুক্ত। তখন যেমন খুশি তেমন আঁকলেও তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় প্রথম একজন বিখ্যাত ব্যক্তির পোর্ট্রেট হুবহু এঁকে ফেলেন। ফলাফল বাবা বিপুল আগ্রহে তাকে শিশু একাডেমীতে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সেই থেকে শুরু। তারপর এসএসসি ও এইচএসসি’র পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ভর্তি পরীক্ষা দিলেন কোচিং ছাড়াই। টিকে গেলেন। সময়ের মেধাবী ভাস্কর সৈয়দ তারেক রহমানের শুরুর গল্পটা এমনই। পরিচিত জনদের কাছে যিনি কমল নামেই বেশি পরিচিত। কমলের বাবা সরকারি কর্মকর্তা তাই ছোটবেলা থেকেই তার বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে বড় হওয়ার সুযোগ হয়েছে। অনেক অঞ্চলের মানুষ ও পরিবেশের মধ্যে তার বেড়ে ওঠা। বাবা ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক সব বিষয়ে তাকে উত্সাহ দিতেন। তেমনি তার মা’ও। ফলে ছবি আঁকা নিয়ে উত্সাহে কখনও ভাটা পড়েনি। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কমল বলেন, ‘আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি বাবা একদিন আমাকে একটি দৈনিকে ছোটদের পাতায় ছবি এঁকে পাঠাতে বলেছিলেন এবং নিজেই সেটা পোস্টের ব্যবস্থা করেছিলেন। যদিও সে ছবি কখনও ছাপানো হয়নি, তারপরও এইটা বিরাট একটা উত্সাহ।’ তিন ভাই বোনের মধ্য কমলের অবস্থান দ্বিতীয়। তার উল্লেখযোগ্য কাজগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে কমল বলেন, ‘আমার প্রথম দিকের ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে ‘ইয়োগা’ নিয়ে করা কাজ ‘বৃষাসন’, ‘ধনুরাস’, ‘মত্সাসন’ এবং পরবর্তীতে করা ‘অন্তর্ভূমির সন্ধানে’-এর সিরিজ যেটা এখনও চলছে, এগুলো আমার পছন্দের।’ তার কাজের কনসেপ্টের পেছনে যে বিষয়গুলো বেশি প্রাধান্য পায় এবং এ ক্ষেত্রে তার স্বাচ্ছন্দ্যবোধ সম্পর্কে জানতে চাইলে উত্তরে তিনি বলেন, ‘বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতায় জৈবিক মানুষ এবং সব যান্ত্রিক বিষয়ের মধ্যকার পারস্পারিক সম্পর্ক, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, মিথস্ক্রিয়াকে আমি আমার আবেগ-অনুভূতি দিয়ে প্রকাশের চেষ্টা করি। মানুষ যে যান্ত্রিক সভ্যতা দিনে দিনে অনেক মজবুত করে গড়ে তুলেছে তা কী অনেক বেশি আগে থেকে? ১৫০ বছর আগেও কি উঁচু বিল্ডিং, এতো কলকারখানা ছিল? এত এত আধুনিক জিনিস অনেক কম সময়ে অনেক দ্রুত বেড়ে উঠেছে। এগুলো মানুষকে অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। আগের মতো মানুষকে আর অনেক বেশি শারীরিক পরিশ্রম করতে হয় না। কিন্তু এগুলো মানুষের মানসিক গঠনকে দুর্বল করে দিয়েছে বলে আমার মনে হয়। একজন সাধারণ মানুষ জাহাজ ডুবি হয়ে জনহীন দ্বীপে পড়লে এখনকার তুলনায় সপ্তদশ শতাব্দীতে অনেক বেশি কিছু করতে পারত। আমার ভাস্কর্যে আমি নিজের মতো করে এই বিষয়গুলোকেই উপস্থাপনের চেষ্টা করি। কাজের সময় প্রতিটি মুহূর্তই যেন আমি নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করি।’ এই প্রজন্ম সম্পর্কে তার মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই প্রজন্মের মধ্যে আমার মনে হয় সবাই জীবনটাকে গতানুগতিকতার বাইরে নিয়ে ভাবতে চায়। মানে আমাকে চাকরি করতেই হবে, ইঞ্জিনিয়ার হতেই হবে—ব্যাপারটা এমন না, আমি কী করে মজা পাচ্ছি—সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অধিকাংশকেই মুক্ত মনের মানুষ বলে মনে হয়।’ সবশেষে তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন হচ্ছে ভাস্কর্যকে আমাদের দেশের মানুষের আরও কাছে দেখতে চাওয়া। এজন্য তার পক্ষে যতটুকু চেষ্টা করা সম্ভব তা করতে তিনি কখনো পিছপা হবে না। এই শিল্পকে সহজভাবে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়াই হচ্ছে তার মূল লক্ষ্য । সৈয়দ তারেক রহমান ডাক নাম :কমল জন্ম তারিখ ও স্থান :১৪ মার্চ, পাবলা, খুলনা। মায়ের নাম :নাজনীন রহমান বাবার নাম :সৈয়দ মুস্তাফীজুর রহমান প্রথম স্কুল :কালিগঞ্জ পাইলট হাইস্কুল,কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা। প্রিয় মানুষ :বাবা-মা, ভাই-বোন প্রিয় উক্তি :‘দর্পের পরিণতি আত্মধ্বংস।’(ঈশপ) প্রিয় পোশাক :টি-শার্ট, শার্ট ও জিন্স অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে, বই পড়ে, সিনেমা দেখে সাফল্যের সংজ্ঞা :নিজের বিরূপ দিক সম্পর্কে নিজের সাথে যুদ্ধ করে জেতা।