অবৈধ বিলবোর্ড ও বিলবোর্ড নীতিমালা
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:০৯
দেশের প্রতিটি মহাসড়ক ও জেলা শহরের প্রধান রাস্তার পার্শ্বে বিজ্ঞাপনচিত্রসহ অসংখ্য বিলবোর্ড রহিয়াছে। কিন্তু ইহার অধিকাংশই অবৈধ। সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজের) জায়গায় এসব বিলবোর্ড বসানো হইলেও ইহার নিয়ন্ত্রক সরকার সমর্থক দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের প্রভাবশালী নেতারা। সাধারণত রাজধানীতে একটি বিলবোর্ড প্রতি বত্সরের জন্য ২ হইতে ৫ লক্ষ টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়। ভাড়া হইতে যে টাকা আসে, তাহার বড় অংশ ঐ সমস্ত নেতারই পকেটে যায়। সওজের কোন কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীও সহযোগী হিসাবে কিছু ভাগ পাইয়া থাকেন বটে। শুধু এই সরকারের আমলেই নহে, বিগত বিএনপি সরকারের সময়েও একই অনিয়ম হইয়াছে। কোন প্রকার বিনিয়োগ ছাড়াই এই অবৈধ বাণিজ্য করিয়া অনেকে আখের গুছাইয়া লইয়াছেন। তবে এখন যোগাযোগমন্ত্রীর নির্দেশে সওজের জায়গায় বিলবোর্ডের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। সেই সঙ্গে নূতন করিয়া বিলবোর্ড নীতিমালা প্রণয়ণের কাজ চলিতেছে। এই পদক্ষেপে ঐ প্রভাবশালী মহলের ক্ষোভ প্রকাশ অব্যাহত আছে বলিয়া জানা যায়।
সারা দেশে সওজের জায়গায় আসলে কতগুলি বিলবোর্ড রহিয়াছে খাতা-কলমে তাহার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নাই। মাঠ পর্যায় হইতে বিলবোর্ড সম্পর্কে যে প্রতিবেদন পাঠানো হয়, সেখানেও সংখ্যার ক্ষেত্রে চলে লুকোচুরি। বাস্তবতার সহিত কখনও মিল খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। আর এভাবেই অবৈধ বিলবোর্ডের সংখ্যা দিন দিন বাড়িতেছে। আবার বৈধভাবে বিলবোর্ডের অনুমতি নেওয়া হইলেও মেয়াদ বাড়ানোর সময় নানা প্রকারে অসাধুতা অবলম্বন করা হয়। একদিকে অনুমতির তোয়াক্কা না করা ও অন্যদিকে মেয়াদ বাড়ানোর সময় অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া এই উভয় প্রকার দুর্নীতির কারণে সরকার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। শুধু সওজ নহে, সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার জায়গাতেও অনেক অবৈধ বিলবোর্ড রহিয়াছে। একইভাবে এসব সংস্থা রাজস্ব হইতে বঞ্চিত হইতেছে। অথচ তাহাদের অর্থের সংকট প্রকট। অর্থের অভাবে অনেক প্রকল্প ও কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করিতে পারিতেছে না এই সংস্থাগুলি। বিলবোর্ড হইতে যথাযথভাবে অর্থ আদায় করিতে পারিলে স্থানীয় সরকারের এসব সংস্থা কিছুটা হইলেও স্বাবলম্বী হইতে পারে। কেননা নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য তাহাদেরকে বারবার নিজস্ব আয় বাড়াইবার তাগিদ দেওয়া হইতেছে।
বিলবোর্ডগুলি দেখা-শোনার জন্য যাহারা দায়িত্বে রহিয়াছেন, তাহারা দুইটি কারণে দায়িত্ব পালন করিতে পারিতেছেন না। এক. অবৈধ বিলবোর্ড বাণিজ্যের সহিত তাহারা নিজেরাও কোন না কোনভাবে জড়িত। এই অর্থের ভাগ-বাটোয়ারা তাহারা নিয়মিতভাবে পাইয়া আসিতেছেন। দুই. তাহারা অবৈধ বাণিজ্য পরিচালনাকারী তথা দলীয় নেতা-কর্মীদের ভয় পাইতেছেন। অথচ তাহারা যখন সরকারি বেতন-ভাতা পাইতেছেন, তখন ইহার দেখভালের দায়িত্ব তাহাদের উপরই বর্তায়। তাহারা এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করিতে পারিতেছেন না বলিয়াই আজ সমাজের সর্বত্র বিশৃৃঙ্খলা দেখা দিয়াছে। নিয়ম-কানুনকে অনেকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করিয়া চলিয়াছেন।
যাহা হউক, সওজের বিলবোর্ড নীতিমালার জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হইয়াছে। কমিটি এই মাসের মধ্যেই চূড়ান্ত খসড়া নীতিমালা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠাইবে বলিয়া জানা যায়। এদিকে সওজের বিভিন্ন অফিসের মাধ্যমে সারাদেশের বিলবোর্ডের হিসাবও চূড়ান্ত করা হইতেছে। হিসাব-নিকাশ শেষ হইলে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় ঝটিকা অভিযান প্রেরণ করিয়া অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হইয়াছে। আমরা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের এরূপ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। আশা করি, অন্য সংস্থাগুলিও এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবে। বলাবাহুল্য, বিলবোর্ড রাস্তার সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে। তবে অনেক সময় অপরিকল্পিতভাবে বিলবোর্ড স্থাপনের কারণে তাহা ঝড়-বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় পথচারীদের জন্য জীবন-মরণেরও প্রশ্ন হইয়া ওঠে। এ ব্যাপারে সকলের সচেতনতা একান্ত কাম্য।