[ রা জ নী তি ]

উন্নাসিকতা ও প্রগলভতার রাজনীতি

ইউরোপে জ্ঞানতাত্ত্বিক জাগরণ বা রেনেসাঁস কেবল ইউরোপের সাধারণ জনতাকে প্রভাবিত করেছিল এমনটি নয়, এর আলোয় আলোকিত হতে চেষ্টা করেছেন অনেক স্বৈরতান্ত্রিক শাসকও। ১৮ শতকের জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপ্ল¬বের ফসল বলা যেতে পারে এই জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচারকে। স্বৈরতন্ত্র ও জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচারের মধ্যে সহজেই পার্থক্য করা যায়। ‘স্বৈরাচার’ শব্দটি নেতিবাচক হলেও ‘জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচার’ শব্দে ইতিবাচক শব্দদ্যোতনা কাজ করে। রেনেসাঁস যে জ্ঞানদীপ্তি ছড়িয়েছিল তা ইউরোপের শাসকদের মনোভূমিতেও একটি আলোড়ন তোলে। যখন জাতিরাষ্ট্রগুলো ভঙ্গুর দশায় পৌঁছে তখন স্বাভাবিকভাবেই জনমনে বিভ্রান্তি প্রবেশ করতে থাকে। সামাজিক-অর্থনৈতিক জীবনে আসে নানা বন্ধ্যাত্ব। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার এবং জাতীয় চেতনায় রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য যে দৃঢ়তা প্রয়োজন ছিল তা প্রজাতান্ত্রিক বা প্রাচীন বিশ্বের এথেনীয় ধারার গণতান্ত্রিক চেতনা ফিরিয়ে এনে শেষরক্ষা সম্ভব ছিল না। তাই একটি শুভ ইচ্ছা নিয়েই ইউরোপে কয়েকজন শাসক স্বৈরাচারী মনোভঙ্গীতে সমাজ ও জাতি রক্ষায় এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা বুঝেছিলেন শক্ত হাতে এবং একক সিদ্ধান্তে কঠোরতার সাথে নীতি নির্ধারণ ও এর প্রয়োগ প্রয়োজন। রেনেসাঁসের জ্ঞানদীপ্তি তাঁদের আলোড়িত করেছিল। রাষ্ট্র, সমাজ ও জনকল্যাণের দৃষ্টিতে তাঁদের স্বৈরাচারী শাসন তাই ‘জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচার’ নামে নন্দিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে প্রত্যাশিত গণতন্ত্র কখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি সকল পর্বের রাজনৈতিক ব্যর্থতায়। বিশেষ করে রাজনীতিতে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ এবং কঠিন দলকেন্দ্রিকতার কারণে জনকল্যাণমুখী রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড়ানোর বদলে সংকীর্ণ দলতান্ত্রিক রাজনীতি শক্ত অবস্থান তৈরি করে নেয়। দলীয় রাজনীতির ভেতর থেকে গণতন্ত্রের বিকাশ অসম্ভব নয়। কিন্তু ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর যখন গণতন্ত্র চর্চার বদলে দলীয় প্রধান সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে পড়েন তখন স্বৈরতন্ত্র মাথাচাড়া দেয়। আর এর সাথে যদি নেতৃত্বের ভেতর রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা কাজ করে এবং এর মধ্য থেকে উন্নাসিকতা জন্ম নেয় তখন স্বৈরতন্ত্র কোনো ইতিবাচক রূপ পরিগ্রহ করতে পারে না। একারণে আমাদের ভাগ্যাকাশে গণতন্ত্র অধরা হয়ে পড়লেও কিঞ্চিত্ আশা করতে ইচ্ছে হচ্ছিল ইউরোপের মতো জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠিত হলেইবা মন্দ কি! ইউরোপের স্বৈরাচারী রাজারা তখন রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার অধিকারী হলেও সেই ক্ষমতা তারা জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করতেন। অবশ্য ক্ষমতার প্রয়োগ হতো রাজার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। এই ব্যবস্থায় বংশানুক্রমে রাজ্যশাসন পরিচালিত হতো। এখানে প্রজাদের শান্তি ও সমৃদ্ধিই ছিল রাজার রাজ্যশাসনের একমাত্র উদ্দেশ্য। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা আমাদের দুই ভাগ্যবিধাতা হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে ঠিকই পেয়েছি, পেয়েছি দুই দলেই একক ক্ষমতাধারী দলীয় প্রধান। সরকারে থেকে বা বিরোধী দলে থেকে তাঁদের স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত দল ও জনগণের ওপর চাপাতে দেখেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য জাতির, জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচার হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখতে পাইনি। ইউরোপের রাজারা বেশিরভাগই দার্শনিক চিন্তাধারার সাথে পরিচিত ছিলেন। তাদের অনেকে যুক্তিবাদ বিশ্বাস করতেন। রাজারা রাজ্য পরিচালনা থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজে চেষ্টা করতেন যুক্তি খোঁজার। আর আমাদের দলীয় প্রধানরা সরকারে থাকলে বা না থাকলেও নিজেদের গণবিচ্ছিন্ন অচলায়তন ভেঙ্গে নিচে নেমে আসার চিন্তা করেন না। সাধারণ মানুষকে অতি সাধারণ মনে করতে থাকেন। সমাজের নমস্য ব্যক্তিরাও এঁদের উন্নাসিক আচরণে যথাযোগ্য সম্মান পান না। নেতৃত্বের প্রগলভ বক্তব্য রাজনীতির নিম্নগামিতাকেই স্পষ্ট করে। গণতান্ত্রিক আচরণ হিসেবে পরিচিত যেকোনো পদ্ধতি যদি গণমানুষ দ্বারা গৃহীত না হয় তবে তা গণতন্ত্রের নামে প্রয়োগ করার অধিকার কোনো রাজনৈতিক দলের থাকতে পারে না। এ ধরনের গণবিচ্ছিন্ন কর্মসূচি জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে একমাত্র স্বৈরাচারী মানসিকতার দলগুলো। পাকিস্তান আমলের প্রেক্ষাপট আর বর্তমান এক নয়। সে যুগে শাসক গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেয়া বৈষম্যে এবং নিপীড়নে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত ছিল। মুক্তির আন্দোলন ছাড়া সেই বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে আসার আর কোনো পথ ছিল না। ফলে হাজার কষ্ট হলেও হরতাল ধরনের কর্মসূচিতে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছিল। সে সময় হরতাল পালন অবশ্যই গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে ব্যবহূত হতো। একথা মুক্তমনের সকলেই স্বীকার করবেন স্বাধীনতার পর একমাত্র এরশাদ যুগে গণআন্দোলনের সময়ে ডাকা হরতাল ছাড়া আর কোনো পর্বের হরতাল সার্বিকভাবে গণমানুষ—বিশেষ করে দলীয় রাজনীতিতে কঠিনভাবে যুক্ত দলান্ধ মানুষ ছাড়া কারো স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছিল না। তবুও দলীয় রাজনীতির স্বার্থ হাসিলের জন্য দলের নেতারা স্বৈরাচারের মেজাজে গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন হরতাল। এসব হরতালে জনসমর্থন থাকে না এ সত্যটি অঘটনঘটনপটিয়সী রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা ভালোমতই বোঝেন। ফলে হরতাল ব্যর্থ হওয়ার আশংকা করেন তারা। এ কারণেই মুখরক্ষা ও পিঠ বাঁচানের জন্য অসহায় সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফেলেন। হরতালের আগের সন্ধ্যা থেকে ভীতি ছড়াতে থাকেন। গাড়ি-ঘোড়ায় আগুন জ্বলে, জনজীবন বিপন্ন হয়। হরতালের দিনেও উন্মত্ততা চলতে থাকে। অতি প্রয়োজনে গাড়ী বের করলেও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হতে হয়। বোমা ককটেল বিস্ফোরণে জীবন বিপন্ন হয় এদেশের স্বাধীন মানুষের। মনভূমিতে স্বৈরাচারী আচরণ লালন করা এসব হরতাল আহবানকারী নেতা-নেত্রীরা জনগণের ওপর হার্মাদের মত চাপিয়ে দেয়া হরতাল শেষে সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের ডেকে অত্যন্ত নির্লজ্জের মত মিথ্যাচার করেন। হিন্দি ছবির ভিলেনের মত নির্যাতিত মানুষের বুকের ওপর পা রেখে মৃদু হাসিমুখে বলেন, ‘সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছে’। এমন করুণ রসিকতা তারা করে যাচ্ছেন কোনোরকম চক্ষুলজ্জা ছাড়াই। বাম দলগুলোর চিন্তা থেকেই গণতান্ত্রিক কর্মসূচি হিসেবে হরতালের জন্ম। পাকিস্তান আমলে বাম রাজনীতি জনপ্রিয় ছিল। হরতালের রূপকারই ছিলেন বাম রাজনীতিকরা। আর সে সময়ের প্রেক্ষাপটে তাদের ডাকা হরতালও মানুষ পালন করেছে চেতনাস্নাত হয়েই। কিন্তু এখন হঠাত্ করেই প্রায় ব্যর্থ ও অনেকটাই গণবিচ্ছিন্ন বামদলগুলো স্বৈরাচারী দলগুলোর মত উন্নাসিক হয়ে পড়েছে। জনমতের তোয়াক্কা না করে তারাও চাপিয়ে দিচ্ছে হরতাল। সকলে মিলে সাধারণ মানুষের হরতাল পালন করা না করার গণতান্ত্রিক অধিকারকে টুঁটি চেপে ধরছে। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির মত জনপ্রিয় দাবি জানানোকে সকলেই সমর্থন দেবে। তবে হরতাল দিয়ে সে দাবি জানানো কেন? এই হরতালে সরকার পিছু হটে কি মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করবে? সাধারণ মানুষ কি জনদাবি বলে হরতালকে সমর্থন করছে? এতই যদি নৈতিক বল থাকে তাহলে হরতাল ডাকিয়ে সকল পক্ষ ইস্যু ব্যাখ্যা করে বিচারের ভার মানুষের ওপর ছেড়ে দিয়ে দর্শক সারিতে বসে থাকুন। মানুষ যদি গাড়ি বের না করে, দোকানপাট বন্ধ রাখে, অফিস আদালতে না যায় তাহলে সন্ধ্যায় যত খুশি সাংবাদিক ডেকে হরতাল সফলের আনন্দ করুন। এমন বাস্তবতা থাকলে হরতালকে গণতান্ত্রিক কর্মসূচি বলা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মানুষের উপর হরতাল চাপিয়ে দিয়ে প্রগলভ রাজনীতিকরা সাধারণ মানুষের সাথেই উপহাস করে যাচ্ছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রী পরিষদের অনেকেই উন্নাসিকতা প্রদর্শন করে এবং প্রায় প্রতিনিয়ত প্রগলভ বক্তব্য উপস্থাপন করে মানুষকে স্থান ভেদে বিরক্ত ও বিভ্রান্ত করে তুলছেন। নিজেদের ওজনও অনেক সময় বুঝতে চেষ্টা করছেন না। বুঝতে চান না শাসন ক্ষমতায় তাদের বসিয়েছে সাধারণ মানুষ। সেকারণে তাঁরা প্রভু নন, সাধারণ মানুষের সেবক। তাঁরা রাজনীতি করে দারুণ প্রাজ্ঞ রাজনীতিক হয়েছেন মানলাম। তাই বলে রাজনীতির তকমা গায়ে না জড়ালেও অন্য কারো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতা থাকবে না এমন ভাবনা অন্যায়। দেশকে ভালোবেসে সুবিধাবাদী এবং ঝগড়াটে রাজনীতির বলয়বৃত্ত থেকে দেশকে উদ্ধার করার জন্য কেউ পরামর্শ দিতে পারবে না এমন বক্তব্য একমাত্র গণতান্ত্রিক চেতনাবিচ্ছিন্ন মানুষই দিতে পারে। এই সময় সৈয়দ আশরাফের মত রাজনীতিকরা নিজেদের হাজারটা দুর্বলতাকে আড়ালে রেখে দেশপ্রেমিক সুশীল সমাজের যেসব মানুষ নিজেদের দায় বোধ থেকে পরামর্শ দেন তখন অসহিষ্ণু হয়ে উঠে নানা নসিয়ত করতে কসুর করেন না। গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকায় তাঁদের গায়ের চামড়ার স্থিতিস্থাপকতা অনেক কম। সর্বজন শ্রদ্ধেয় ড. আকবর আলী খান যখন অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা নিয়ে কয়েকটি বিকল্প উত্থাপন করেন বা ড. কামাল হোসেন যখন অভিমত প্রকাশ করেন তখন গ্রহণ-বর্জনের উদারতা নিয়ে এবং পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে তা পর্যালোচনা করার কথা যে কোনো গণতান্ত্রিক বোধসম্পন্ন ক্ষমতাধর রাজনীতিকের। কিন্তু তা না করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে শব্দে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তা শোনার জন্য এদেশের সচেতন মানুষ প্রস্তুত থাকে না। এমন ধারার উন্নাসিকতার প্রতিফল কখনো ভালো হয় না। ইউরোপের ১৮ শতকের বুদ্ধিদীপ্ত স্বৈরাচারগণ এভাবে বাংলাদেশ স্টাইলে নিশ্চয় প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতেন না। মানতে হবে গণতন্ত্রের মেকি খোলসে স্বৈরাচারী মনোবৃত্তি আত্মঘাতি হয়ে থাকে। তাদের এহেন আচরণ সাধারণ মানুষের কাছে অনাবৃত থাকে না। গত ১২ জানুয়ারি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত যুদ্ধাপরাধী বিচার প্রসঙ্গে খালেদা জিয়ার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘বাঘে ধরলে বাঘে ছাড়ে, কিন্তু শেখ হাসিনা ধরলে ছাড়ে না’। এই বক্তব্য প্রচ্ছন্নভাবে স্পষ্ট করে দেয় যে, দলের ভেতরে এবং সরকারী নীতি নির্ধারণে শেখ হাসিনার একক আধিপত্যই সত্য-একথা সকলে মেনে নিয়েছেন। এভাবে আমাদের দেশে সরকারি ও বিরোধী দলে থাকা সকল রাজনীতিকই উন্নাসিক আচরণ করে যাচ্ছেন। তাঁদের ক্রমাগত প্রগলভ শব্দচয়ন এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান ক্রমশ নিম্নগামী করে তুলছে। একুশ শতকে এসে এ ধারার রাজনীতি মোটেও কাম্য নয়। সাধারণ মানুষকে এতটা নির্বোধ ভাবার কারণ নেই। একজন অশিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিত রিকশাওয়ালাও আমাদের নেতা-নেত্রীর অসতর্ক বক্তব্য নিয়ে যথার্থ বিশ্লে¬ষণ করতে পারেন। আমার মত রিকশাযাত্রী অনেকের নিশ্চয় এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ কারণেই আমরা সতর্ক করে বলতে চাই, চিন্তা-চেতনায় আমাদের রাজনীতিকরা যতই অগণতান্ত্রিক হোন শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের পথেই হাঁটতে হবে। তাই অহমিকার কুহক থেকে বেরিয়ে এসে যত তাড়াতাড়ি সাধারণ মানুষকে মূল্যায়ন করবেন, সম্মানিতকে যথাযথ সম্মান দেবেন এবং নিজেরা বিনীত হবেন ততই সাধারণ মানুষের মনোরঞ্জন করা সম্ভব হবে।  লেখকঃ অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। shahnawazju@yahoo.com