চাই স্বাভাবিক রাজনীতি

বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হতে এক বছরও আর বাকি নেই। এরই মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করার কথা। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার আদালতের রায়ের একাংশ অনুসরণে বাতিল করে দেয়ায় এখন অস্থিরতার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। আদালতের যে অন্য অংশে পর্যবেক্ষণ ছিল পরিস্থিতির প্রয়োজনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরবর্তী দুই মেয়াদও বহাল রাখা যেতে পারে। সেদিকে জাতীয় সংসদ বাতিল বিল পাসের সময় সরকারি দল মনোযোগ দেননি। ফলে এক চরম অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দল অনড় তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া বা অন্তর্বর্তী নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া নির্বাচন করবে না, অন্যদিকে সরকার অনড় সংবিধান অনুযায়ী যা আছে সেভাবে নির্বাচন করবে। সরকার ও বিরোধী দল দু’পক্ষেরই অবিলম্বে বসে একটা মীমাংসার পথ বের করতে হবে। কারণ দুই দলই এটা জানে, এক দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে অন্য দল ক্ষমতায় থাকতে পারে না। অতীতে এর দৃষ্টান্ত আছে। রাজনৈতিক এই অচলাবস্থা চলতে থাকলে আবার অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে দেশের মানুষকে, যা আমরা কেউ চাই না। আমরা চাই সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। চাই সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং দুর্নীতিমুক্ত একটি সমাজ। বার বার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েও সরকার জনগণের সেসব আকাঙ্ক্ষা এতোদিনেও পূরণ করতে পারেননি। তারা অনেক ভালো কাজ করেন শুধু সুশাসন কায়েম করেন না। অতীতেও এই দৃষ্টান্ত দেখা গেছে, বর্তমানও এর ব্যতিক্রম নয়। আইনটা সবার জন্য সমান কোন আমলে হয় না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দূষণমুক্ত হয় না, দুর্নীতি দূর হয় না। ব্যক্তিকে রক্ষা করতে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। আসলে দেশের সব সমস্যার সমাধান হতো যদি দেশে সত্, নীতিবান এবং সত্যিকার সমাজসেবার মানসিকতার লোকদের হাতে রাজনীতি থাকতো। এখন তো সবকিছু দেখে-শুনে মনে হয় রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। এর অধিকাংশই সামরিক-বেসামরিক আমলা। জনসাধারণের সঙ্গে যোগ যাদের খুবই সামান্য। অনেকের আবার নেই-ই। বড় দু’টি দলেই রাজনীতির চিত্র এই। আজকাল হাইব্রিড কমলায় যেমন কমলার রং নেই তেমনি রাজনীতিতেও এখন তৃণমূল জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব নেই। এক সময় রাজনীতি ছিল গ্রামের শিক্ষক, মফস্বলের আইনজীবী, জ্ঞানী, গুণী, পণ্ডিত ও প্রভাবশালী সমাজসেবকদের হাতে। আজ তারা ঠাঁই পান না কোন দলেই। যাদের জনগণ চান, তারা মনোনয়ন পান না। নির্বাচন হয়ে গেছে মার্কানির্ভর। এ কারণেই এখন নির্বাচনে কালো টাকা, অস্ত্র, সন্ত্রাসী ব্যবহার হয়। জনসাধারণের প্রতিনিধিরা অনেকে সন্ত্রাস লালন করেন। কিন্তু প্রকৃত রাজনীতি হবে তো তাদের দিয়েই, যারা জনসেবাটাই বড় মনে করেন, ক্ষমতা নয়। অথচ তাদের কাছে প্রধান বড় দুই দল যায় না। গত ১৩ জানুয়ারি আমাদের সময় পত্রিকায় “প্রাক নির্বাচনী হালচাল: ঢাকা-১, দোহার-নবাবগঞ্জের আ.লীগ- বি.এন.পি’র মূল সমস্যা আন্তঃকলহ” রিপোর্টটি পড়ে চমকে উঠি। সেখানে এলাকার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি, যিনি ব্যাপক সমাজসেবার সঙ্গেও জড়িত, তাকে সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি একটি বড় দলের প্রার্থী হবেন কি না। তিনি বললেন প্রার্থী হবেন না। তবে প্রার্থী না হয়ে সরাসরি রাজনীতি না করলেও সমাজসেবামূলক কাজে তার সম্পৃক্ততা অব্যাহত থাকবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বেগম রোকেয়া, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রণদাপ্রসাদ সাহা, প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম, স্যামসন এইচ চৌধুরীর সমাজসেবার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। খবরটি পড়ে আশাবাদী হয়েছি। আমাদের সমাজে তো এ ধরনের মনোভাব যাদের, তাদেরই রাজনীতিতে আসা উচিত, জনসেবা করা উচিত। তাতে রাজনীতির বর্তমান ধারা বদল হতে পারে। শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, চিকিত্সকসহ অগ্রসর শ্রেণির প্রগতিশীল মানুষেরাও রাজনীতিতে বেশি করে এলে বর্তমান সংকীর্ণতা অনেক কমে যাবে। কারণ নির্লোভ আর জ্ঞানী মানুষেরাই পরিশুদ্ধ মানুষ। পরিশুদ্ধরা রাজনীতিতে এলে রাজনীতিও দূষণমুক্ত হবে। সন্ত্রাস, দুর্নীতিসহ অনেক সমস্যাই এতে কমে যাবে বলে মনে করি। লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক makhon1966@yahoo.com