দর্শন

মানবীয় জ্ঞানের মাত্রা প্রসঙ্গে ইবনে খালদুন

প্রখ্যাত বৃটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল তার ‘দ্যা প্রবলেমস অব ফিলসফি’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থের শুরুতেই বলেছেন:‘এমন কোন সুনিশ্চিত জ্ঞান আছে কি যাকে কোন বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন মানুষ সন্দেহ করতে পারে না।’ বস্তুত মানবীয় জ্ঞান সীমাবদ্ধ। এই সীমাবদ্ধতার কথা অনেক দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক তথা জ্ঞানসাধকেরা স্বীকার করেছেন বিভিন্নভাবে। মুসলিম দার্শনিকগণ জ্ঞানের ক্ষেত্রে কম-বেশি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্বীকার করেন। জ্ঞানের স্বাভাবিক উত্সসমূহের বাইরেও তারা ওহী বা প্রত্যাদেশের কথা স্বীকার করেন। সাধারণ মানুষের জ্ঞানের সাথে তাই তারা নবী-রাসূলদের জ্ঞান, এমনকি সুফি-সাধকদের জ্ঞানের পার্থক্য করে থাকেন। বিশ্বখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইবনে খালদুন জ্ঞানের মাত্রাভেদ তত্ত্ব প্রবর্তন করেন। তিনি মানবীয় জ্ঞানের ক্ষেত্রে যেমন ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি এবং আত্মিক অনুভূতির জগতের ক্রমিক অগ্রগতির কথা বলেছেন, তেমনি সাধারণ মানুষ, ওলী, নবী-রাসূলদের জ্ঞানের ক্ষেত্রেও এমন ক্রমিক মাত্রার কথা বলেছেন। তিনি দেখান যে, সাধারণ মানুষ সর্বোচ্চ আত্মিক অনুভূতির মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগতের সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত অগ্রসর হতে পারে। মানুষ এ পর্যায়ে অতীন্দ্রিয় জগতের কিছু বিষয়াদি সম্পর্কে সামান্য কিছু অনুভব করে মাত্র। কিন্তু কোন সাধারণ মানুষের সে জগত্ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান হয় না। এই জগতের জ্ঞান আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহ ছাড়া লাভ করা যায় না। কিন্তু এর থেকে জ্ঞানীয়ভাবে আর একটু অগ্রসর হয়ে যখন কোন মানুষ আধ্যাত্মিক জগেক আরও বেশি করে অনুভব করতে পারে তখন তারা ওলীদের পর্যায়ে অবস্থান করে। তবে ওলীরাও ঐ জগতের পর্যাপ্ত জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হন না। কেবল নবী-রাসূলগণই (সা.) ঐ জগতের সম্যক উপলব্ধি করে থাকেন। ইবনে খালদুন দেখান যে, বুদ্ধির জগতের ঊর্ধ্বে যে আত্মিক জগত্ সেই জগত্ মানুষের স্বাভাবিক সীমানার বাইরে। মানুষের জ্ঞানের পরিধি স্বাভাবিকভাবে এ জগত্ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। এ জগত্ সম্পর্কে সহজভাবে যারা অবহিত তারা হলেন ফেরেশতা। কেননা জন্মগতভাবেই আল্লাহ তাদের ঐ জগতের বাসিন্দা করে সৃষ্টি করেছেন। তাই তাদের কাছে ঐ জগতের জ্ঞানই স্বাভাবিক জ্ঞান। খালদুন দেখান যে, মানুষের মধ্যেও ফেরেশতার স্বভাব লুক্কায়িত থাকে। মানুষের আত্মিক অনুভূতি প্রখর হয়ে উঠলে মানুষও ফেরেশতার জগতে প্রবেশ করতে পারে এবং এই পর্যায়ে মানুষ জগত্ জীবনের যে সকল যথার্থ জ্ঞান পায় তারই একটি বিশেষ স্তরকে প্রত্যাদেশ বলে। অর্থাত্ এই জগতে প্রবেশ করে মানুষ যখন আল্লাহর গায়েবী বাণী শ্রবণ করতে সক্ষম হন তখন তাকে প্রত্যাদেশ বলা হয়। নবীগণকে (সা.) আল্লাহ এই ক্ষমতা দান করেছেন। তাই তাদের নিকট এটি একটি সহজাত প্রবৃত্তির মতো। আল্লাহ নবী রাসূলদের (সা.) এই অনুগ্রহ দিয়েই সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের জীবনকে এই লক্ষ্যে আজন্ম পুত-পবিত্রভাবে সংরক্ষণ করেছেন। আল্লাহ নবী-রাসূলদের (সা.) যে প্রত্যাদেশ প্রদান করেন তা সর্বক্ষণ বিদ্যমান থাকে না। এই অবস্থা ফেরেশতাদের মধ্যে সর্বক্ষণ বিদ্যমান থাকে। আল্লাহ তার ইচ্ছামত নবী-রাসূলদর (সা.) মাঝে মধ্যে প্রত্যাদেশ প্রদান করে থাকেন। এই প্রক্রিয়ায় তারা যে জ্ঞান লাভ করেন সেই জ্ঞান অত্যন্ত সাবলীল এবং সুস্পষ্ট। এই জ্ঞান চরমভাবে বিশুদ্ধ, সুনিশ্চিত। জগতের কোন জ্ঞানের সাথে একে তুলনা করা যায় না। নবী-রাসূল (সা.) সবার ওপর প্রত্যাদেশ নাজিল হলেও এর মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে। নবীগণের (সা.) তুলনায় প্রত্যাদেশ প্রাপ্তির উত্কর্ষতা এবং মাত্রা রাসূলদের ক্ষেত্রে আরও অধিক হয়ে থাকে। তাছাড়া রাসূলদের নিকট সরাসরি ফেরেশতা আসতেন। ফেরেশতারা মানুষের আকার ধারণ করে রাসূলদের (সা.) নিকট আগমন করতেন এবং মানুষের মতো করে আল্লাহর বাণী রাসূলদের (সা.) নিকট বলতেন। অর্থাত্ নবীদের (সা.) ক্ষেত্রে কেবল আত্মিক অনুভূতির উচ্চতর পর্যায়ে প্রত্যাদেশ প্রাপ্তি ঘটতো এটা একটি গায়েবী বাণী শ্রবণের মাধ্যমে তারা বুঝতে পারতেন। কিন্তু রাসূলগণ (সা.) একই সাথে গায়েবী বাণী পেয়েছেন এবং ফেরেশতার সাক্ষাতের মাধ্যমেও ওহী পেয়েছেন। ইবনে খালদুন দেখান যে, শেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদও (সা.) এই উভয় প্রক্রিয়ায় আল্লাহর বাণী বা প্রত্যাদেশ লাভ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দেন। ‘হারেস ইবনে হিশাম একবার হযরত মুহাম্মদকে (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন:‘কীভাবে আপনার নিকট ওহী আসে?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘অনেক সময় এটা ঘণ্টাধ্বনির মতো আমার নিকট আসে—এটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। অতঃপর এটা শেষ হয় এমন অবস্থায় যে, আমি সমস্ত বক্তব্য স্মরণ করে ফেলেছি। অনেক সময় ফেরেশতা মানুষের আকার ধারণ করে আমার নিকট আসে ও কথা বলে। আমি সকল কথাই স্মরণ করতে পারি।’ নবী-রাসূলগণ (সা.) প্রত্যাদেশ বা ওহী প্রাপ্তির সময় মূলত ফেরেশতাদের জগতের অধিবাসী হয়ে যান। তাদের মানবীয় প্রকৃতির ঊর্ধ্বে তারা তখন অবস্থান করেন। কিন্তু এই অবস্থান ক্ষণকালীন। আবার তারা মানবীয় সত্তা ফিরে পান। ইবনে খালদুন বলেন:‘মানবীয় সত্তার মধ্যেও ফেরেশতীয় সত্তায় রূপান্তরিত হওয়ার একটা যোগ্যতা বিদ্যমান থাকে। এর ফলে মানবিক সত্তা কোন কোন সময় ও বিশেষ কোন মুহূর্তে ফেরেশতীয় সত্তায় পরিণত হতে সক্ষম। এরপর পুনরায় সে মানবীয় সত্তায় প্রত্যাবর্তন করে এবং ফেরেশতীয় জগত্ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাকে স্বজাতির নিকট প্রচারের দায়িত্ব প্রদান করা হয়; এটাই প্রত্যাদেশ এবং ফেরেশতাদের বক্তব্যের যথার্থ মর্মার্থ। নবীগণ (আ.) সকলেই এই সহজাত প্রবৃত্তির অধিকারী।’  লেখক : দর্শনের শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চেয়ারম্যান, অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রাকটিক্যাল এথিকস sowkot.hossain@yahoo.com