প্রযুক্তি পণ্যের ভবিষ্যত্, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি পণ্য

আজকের প্রযুক্তি পুরোনো হয়ে যাচ্ছে কালই। আজকে যে প্রযুক্তি পণ্যটি তুমুলহারে সাড়া জাগিয়ে বিশ্ব মাত করছে, কালই তা নাম লেখাচ্ছে বাতিলের খাতায়। গত কয়েক বছরে প্রযুক্তি আর প্রযুক্তি পণ্যের সমাহার তাই সাধারণ মানুষের কল্পনার গণ্ডি অনেকটাই ছুঁয়ে ফেলেছে। প্রযুক্তি পণ্যের এই পরিবর্তনের ধারাটি এতটাই দ্রুত যে বছরে বছরেই বদলে যাচ্ছে প্রযুক্তি পণ্যের ধারণা। গেল বছরের পর তাই সামনের বছরে প্রযুক্তি পণ্যেও বড় ধরনের পরিবর্তনের আশাই করছেন প্রযুক্তি গবেষকরা। আগামী দিনগুলোতে নিত্য ব্যবহার্য প্রযুক্তি পণ্যে কেমন ধারা আসতে পারে, তা এই লেখায় জানাচ্ছেন তরিকুর রহমান সজীব দ্রুত বদলে যাওয়া সময়ে বোধহয় সবচেয়ে দ্রুত বদলে যাচ্ছে প্রযুক্তি। আজ থেকে বিশ বছর আগেও যেসব প্রযুক্তি পণ্য রাজত্ব করে গেছে, তা আজ বাজার থেকে হারিয়ে যাওয়া পণ্যের খাতায় নাম লিখিয়েছে। দশ বছর আগের প্রযুক্তিও এখন পুরোনো। আর বছরে বছরেও প্রযুক্তি পণ্যে নানা ধরনের পরিবর্তনেই বুঝা যায় প্রযুক্তির দ্রুতগতি। কম্পিউটার থেকে ল্যাপটপের আবির্ভাবে যতটা সময় লেগেছে, তার চেয়ে অনেক কম সময়েই ট্যাবলেট পিসি, স্মার্টফোনের মতো ডিভাইস এসে বাজারের চিত্র বদলে দিয়েছে। নানা গ্যাজেটসের আবির্ভাব এই চিত্রে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। কম্পিউটারের প্রচলিত ধারণা তাই আগেই বদলে যেতে শুরু করেছে। বছরে বছরে তাই কম্পিউটারে আসছে নতুনত্বের ছোঁয়া। আগামী দিনগুলোতে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মোবাইল বা হোম সিস্টেমে কী ধরনের পরিবর্তনগুলো আসবে, তা নিয়ে প্রযুক্তি গবেষকদের চিন্তার কথা তুলে ধরা হলো এই লেখাতে। ল্যাপটপ-ট্যাবলেট সময়ের ধারাবাহিকতায় ল্যাপটপ আর ট্যাবলেট পিসির মধ্যেকার পার্থক্য ক্রমেই কমে আসছে। প্রযুক্তি গবেষকদের ধারণা, আজ থেকে পাঁচ বছর পরে হয়ত আর আলাদা করে ল্যাপটপ আর ট্যাবলেট পিসি বলে কিছু থাকবে না। তবে এখন পর্যন্ত ল্যাপটপ আর ট্যাবলেট পিসি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের পণ্য হিসেবেই নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। এর একদিকে রয়েছে ওয়েব ব্রাউজিং, ভিডিও দেখা বা চলতি পথে চট করে কোনোকিছু পড়ে নেওয়ার কাজের জন্য ট্যাবলেট পিসি। অন্যদিকে কম্পিউটারের যাবতীয় কাজে ডেস্কটপের বিকল্প হিসেবেই ব্যবহূত হচ্ছে ল্যাপটপ। ভবিষ্যতে যে ল্যাপটপ আর ট্যাবলেট পিসি একীভূত হয়ে যাবে, তার আঁঁচ কিছুটা পাওয়া যায় এখনই। বেশ কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানই ট্যাবলেট-ল্যাপটপ হাইব্রিড ডিভাইস বাজারে এনেছে। ভবিষ্যতে এই দুইয়ের মিশেলে ট্যাবলেট পিসির প্রাধান্যই থাকবে বেশি। গবেষকদের ধারণা, ট্যাবলেটগুলো আকৃতিতে সাধারণভাবে একটু বড় হয়ে ১৩ ইঞ্চি আকারে চলে আসবে। একইসাথে পুরুত্বের দিক থেকে পাতলা এবং ওজনের দিক থেকে হালকাও হয়ে উঠবে এসব ট্যাবলেট। তার সাথে এক্সটার্নাল ওয়্যারলেস কিবোর্ড তো থাকবেই, টাচস্ক্রিনও হয়ে উঠবে আরও বেশি সক্রিয়। আবার ট্যাবলেটের জন্য আলাদা মাউসও তৈরি হবে নিঁখুত কাজের জন্য। শুধু তাই নয়, এসব ডিভাইসে যুক্ত হবে আরও উন্নত মেমোরি, স্টোরেজ এবং শক্তিশালী সিপিইউ। এতে করে ট্যাবলেট পিসিও কাজের জন্য শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ট্যাবলেট পিসির জন্য এখনই নানা প্রতিষ্ঠান ডকিং স্টেশন তৈরি করা শুরু করেছে। ভবিষ্যতে আরও আধুনিক সব ধারণার ডকিং স্টেশন তৈরি হয়ে যাবে যাতে থাকবে পূর্ণাঙ্গ কিবোর্ডসহ সব ধরনের সুবিধা। তবে ট্যাবলেটের দৌরাত্ম্যে ল্যাপটপ একেবারেই হারিয়ে যাবে না। একটু বেশি কাজের জন্য অনেকেই তখনও প্রচলিত ল্যাপটপেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। এসব ল্যাপটপ আকারে একটু বড়ই হবে। এখনকার আল্ট্রাবুকগুলোই মূলত তখন ল্যাপটপের বাজারে রাজত্ব করবে। ডেস্কটপ এবং অল-ইন-ওয়ান কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত এবং জনপ্রিয় ডিভাইসের নাম ডেস্কটপ পিসি। ল্যাপটপ, নোটবুক, ট্যাবলেট বা অল-ইন-ওয়ান পিসি বাজারে থাকলেও ডেস্কটপ পিসি এখন পর্যন্ত বহাল তবিয়তেই নিজেদের বাজার দখলে রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পিসির বাজার খানিকটা কমলেও সেটা সাময়িক বলেই অভিমত বাজার বিশ্লেষকদের। তবে সামনের দিনে ডেস্কটপ পিসিতে বেশ পরিবর্তনের হাওয়া লাগবে। ইতোমধ্যেই ডেস্কটপ পিসির আকার ছোট হতে শুরু করেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলেই মন্তব্য করেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। আর সেই ধারাতেই শেষ পর্যন্ত অল-ইন-ওয়ান পিসিই দখল করে নেবে ডেস্কটপ পিসির মূল বাজার। এখনই অল-ইন-ওয়ান পিসিতে দেওয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ কনফিগারেশনের ডেস্কটপ পিসির পারফরম্যান্সের নিশ্চয়তা। সামনের দিনগুলোতে সত্যি সত্যিই সেটা সম্ভব হবে। তাছাড়া অল-ইন-ওয়ান পিসি এখনকার জন্য বেশ বিলাসবহুল পণ্য হিসেবেই স্বীকৃত এর দামের কারণে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অল-ইন-ওয়ান পিসি দামের দিক থেকে বেশিরভাগ মানুষের নাগালের মধ্যেই চলে আসবে বলে ধারণা প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের। আর সে কারণেই ডেস্কটপের স্থানটি অনেকটাই চলে আসবে তাদের দখলে। তবে তাই বলে ডেস্কটপ পিসি একেবারেই বাজার থেকে হারিয়ে যাবে না। বিশেষ করে গেমিং পাগল এবং প্রফেশনালরা প্রচলিত দুই ইউনিটের ডেস্কটপ পিসিতেই নির্ভর করবেন তখনও। ডেস্কটপ পিসির ক্ষেত্রে সামনের দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হচ্ছে এর ব্যবহারে। এখনকার দিনে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে প্রফেশনাল কাজে এবং গেমিংয়ের জন্যই ডেস্কটপ বেশি ব্যবহূত হয়ে থাকে। সামনের দিনগুলোতে ডেস্কটপের ব্যবহারে আসবে বৈচিত্র্য। লিভিং রুম থেকে শুরু করে রান্নাঘরেও পৌঁছে যাবে ডেস্কটপ পিসি। আবার টেলিভিশনের জায়গাটিও অনেকটাই এই ডেস্কটপ দখল করে নিতে পারে বলেও মনে করেন অনেক প্রযুক্তি গবেষক। স্মার্টফোন প্রযুক্তি পণ্যের মধ্যে স্মার্টফোনে দ্রুত পরিবর্তনের হাওয়া চোখে লাগার মতোই। সাধারণ মোবাইল ফোন অনেক দিন ধরেই মানুষের হাতে হাতে ঘুরছিল। হঠাত্ করেই তাতে যোগ হলো মাল্টিমিডিয়া উপকরণ আর মোবাইল হ্যান্ডসেটেও সব ধরনের কাজের সুযোগ দিতেই বাজারে আসতে থাকল স্মার্টফোন। ২০০৭ থেকে শুরু করে গত ৫ বছরে এক কথায় মোবাইল ফোন পরিণত হয়েছে অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি পণ্যে। আর সেই মোবাইল ফোনের মধ্যে আবার রাজত্ব করতে শুরু করেছে স্মার্টফোন। শুরুর দিকে স্মার্টফোনগুলোর দাম গড়পড়তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকলেও এখন আর সেই চিত্রটি নেই। অ্যানড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের কল্যাণে স্মার্টফোনের দাম চলে এসেছে সকলের নাগালের মধ্যেই। আর ডিজাইনেও এসেছে নানা বৈচিত্র্য। একদিকে যেমন মুঠোর মধ্যে পুরে রাখার মতো আকার, অন্যদিকে ৫ থেকে ৭ ইঞ্চি পর্যন্ত আকারের ডিসপ্লেও রয়েছে স্মার্টফোনে। তবে সামনের দিনগুলোতে স্মার্টফোনে যুক্ত হতে যাচ্ছে এমন কিছু ফিচার, যা আজ থেকে ৫ বছর আগে চিন্তাও করা যেত না। প্রথমেই বলা যায় তারহীন চার্জিং সুবিধার কথা। ইতোমধ্যেই এ নিয়ে গবেষণা হয়েছে বিস্তর। আর তার ফলশ্রুতিতে আগামী দিনে প্রায় সব ধরনের স্মার্টফোনেই তারহীন চার্জিং পরিণত হবে একেবারেই মামুলি ঘটনায়। স্মার্টফোনের প্রসেসিংয়েও আসবে নতুন গতি। এখনও পর্যন্ত হাই-এন্ড স্মার্টফোনগুলোতেই কোয়াড কোরের প্রসেসর ব্যবহূত হতে থাকলেও ভবিষ্যতে কোয়াড কোর প্রসেসরও পরিণত হবে সাধারণ ফিচারে। একই কথা প্রযোজ্য এনএফসি’র ক্ষেত্রেও। আর বড় পর্দার কথা তো বলাই বাহুল্য। এবারের সিইএস-এই আকছার দেখা মিলেছে বিশাল বিশাল সব আকারের ডিসপ্লে’র স্মার্টফোন। আগামী দিনে এর পরিমাণ বাড়বে বৈ কমবে না বলেই অভিমত বিশ্লেষকদের। টিভি এবং ডিসপ্লে সময়ের সাথে সাথে এমনিতেই টেলিভিশনের প্রচলিত ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে। এলসিডি, এলইডি টিভির যুগ পেরিয়ে এখন ওএলইডি টিভি নিয়ে কাজ করছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। আর বিভিন্ন চ্যানেলের অনুষ্ঠানমালা দেখার প্রথা এখন অনেকখানি বদলে গেছে স্মার্ট টিভি এবং ইন্টারনেট টিভির কল্যাণে। স্যামসাং, এলজি থেকে শুরু করে সবাই এখন স্মার্ট টিভি তৈরিতে ব্যস্ত। এর মধ্যে গত বছরের শেষের দিকে বাজারে আসে ৪কে টিভি। এখনকার সাধারণ এইচডি টিভি থেকেও ৮ থেকে ১৬ গুণ উচ্চ রেজ্যুলেশন নিয়ে এসব টিভি বাজার দখল করে রাখবে সামনের দিনগুলোতে। টিভির আকৃতির মতো ডিসপ্লেও এখন অনেক উন্নত অবস্থানে পৌঁছে গেছে। টিএফটি ডিসপ্লে’র পর এইচডি, আল্ট্রা এইচডি ডিসপ্লে পেরিয়ে এখন অ্যাপল’র রেটিনা ডিসপ্লের সময়। আর অবধারিতভাবেই বিভিন্ন ডিভাইসের ডিসপ্লে মানেই টাচস্ক্রিন রাজত্ব করছে এবং করবেও ভবিষ্যতে। ভবিষ্যতের দিনগুলোতে বিশাল বিশাল আকৃতির ডিসপ্লে আসতে যাচ্ছে। তাছাড়া নমনীয় ডিসপ্লে এবং কাগজের মতো পাতলা ডিসপ্লে নিয়েও আশাবাদী প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। ইতোমধ্যেই তার কিছু নমুনাও পাওয়া গেছে। প্রতিদিনের জীবনের সাথে মিশে যাওয়া এসব ডিভাইস তাই সামনের দিনগুলোতে যথেষ্ট চমক নিয়েই হাজির হতে যাচ্ছে প্রযুক্তি বিশ্বের সামনে—এটা বলাই যায়।