প্র জ ন্ম আ ই ক ন
ঐতিহ্যের বাহক
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫৫
বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের ক্ষেত্রে যে কয়টা প্রতিষ্ঠানের নাম সবার আগে আসে, এরমধ্যে সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশনা ঐতিহ্য অন্যতম। ২০০০ সালে যাত্রা শুরু করে আজ এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৭৫০টিরও অধিক টাইটেলের অধিকারী। বাংলা প্রকাশনার ইতিহাসে কেবলমাত্র ঐতিহ্যই প্রকাশ করেছে বাংলা সাহিত্যাকাশের পাঁচ নক্ষত্র রবীন্দ্র, জীবনানন্দ, মানিক, বিভূতি ও শরত্ রচনাবলি। শুধু বই প্রকাশই ঐতিহ্যের মুখ্য কাজ নয়; পাশাপাশি সমাজ কল্যাণমূলক কাজেও এই প্রতিষ্ঠানের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দেশের স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোরদের সৃষ্টিশীলতার বিকাশে নিয়মিত আয়োজন করে আসছে ‘ঐতিহ্য-প্রথম আলো গোল্লাছুট গল্পলেখা প্রতিযোগিতা’। পাঠক বৃদ্ধিতে সারা দেশব্যাপী আয়োজন করে আসছে বই উত্সবের। শুধু তাই নয়; দেশের তরুণতম লেখকটির জন্যও ঐতিহ্যের দরজা অবারিত। কারণ, ঐতিহ্য মূলত লেখকের চেয়ে প্রাধান্য দেয় লেখার মানকে। আসছে বইমেলায় ঐতিহ্যের প্রস্তুতি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আমাদের এবারের প্রজন্মে হাজির হয়েছেন এর স্বপ্নদ্রষ্টা, প্রধান নির্বাহী আরিফুর রহমান নাইম। তার সাক্ষাত্কার নিয়েছেন রিয়াদ খন্দকার
এত এত পেশা থাকতে প্রকাশনার সাথে যুক্ত হলেন কোন প্রেরণা থেকে?
প্রথম থেকেই পেশা নিয়ে আমার ভাবনা ছিল যে, এমন একটা পেশাকে বেছে নেবো, যা সম্মানজনক এবং আমার জন্য আনন্দদায়ক, যেখানে নিজের মতো করে সৃষ্টিশীল কিছু কাজ করা যায়। এসব কারণেই অনেক পেশা থাকতেও প্রকাশনাকে বেছে নিয়েছি।
প্রকাশনা শিল্পের ক্ষেত্রে আপনি কাকে আদর্শ মনে করেন?
এ ক্ষেত্রে আমি তিনজন প্রকাশকের কথা বলব, যাদের আমি আদর্শ মনে করি। তারা হলেন মুক্তধারা প্রকাশনীর স্বর্গীয় চিত্তরঞ্জন সাহা, সেবা প্রকাশনীর কাজী আনোয়ার হোসেন ও ইউপিএল-এর মহিউদ্দিন আহমদ। আমার লক্ষ্য—ঐতিহ্য যেন এই তিনটি প্রকাশনার আদর্শকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যেতে পারে।
এবারের একুশে বইমেলা উপলক্ষে আপনার প্রস্তুতি কেমন?
খুব ভালো, অন্যান্য বছরের চেয়ে অনেক আগেভাগেই অনেক বই চূড়ান্ত করা আছে।
শুধু কি মেলা উপলক্ষেই বই প্রকাশ করেন, নাকি সারা বছরই বই প্রকাশ করেন?
ঐতিহ্য মেলাকেন্দ্রিক প্রকাশনায় বিশ্বাসী নয়। বই নিয়ে আমরা সারা বছরই কাজ করি। সারা বছর কাজ না করলে ৭০-৮০টি বই প্রকাশ করা সম্ভব হতো না।
পাণ্ডুলিপি নির্বাচনের পূর্বে কোন কোন বিষয়কে আপনি প্রাধান্য দেন?
একটি মানসম্পন্ন বই। লেখক কখনও মুখ্য হয়ে ওঠেন না আমাদের কাছে। আমরা সব সময়ই ভালো পাণ্ডুলিপির সন্ধানে থাকি।
আপনার প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত সর্বাধিক বিক্রিত বইটির নাম কী এবং এর লেখক কে?
রবীন্দ্র রচনাবলি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এ ছাড়াও জীবনানন্দ, মানিক, শরত্, বিভূতির রচনাবলিও মোটামুটি বিক্রি হয়েছে এবং হচ্ছে।
এবারের মেলায় কোন কোন পাণ্ডুলিপি নিয়ে আপনি বেশি আশাবাদী?
প্রকাশক হিসেবে সব বই নিয়েই আশাবাদী আমি। অনেক সময় আমি যে বইটি নিয়ে ভাবি যে এই বই ভালো বিক্রি হবে, কিন্তু দেখা যায়, তা হয় না। আবার যে বইটি নিয়ে খুব আশাবাদী নই, সেটিও অনেক সময় বেশি বিক্রি হয়ে থাকে। বই বিক্রি আসলে নির্ভর করে পাঠকের রুচির ভিন্নতার উপর।
সৃজনশীল বইয়ের পাঠক বেশি, নাকি মননশীল বইয়ের পাঠক বেশি?
আমার প্রকাশনার শুরুতে দেখেছি সৃজনশীল বইয়ের প্রতি পাঠকের আকর্ষণ ছিল বেশি। মননশীল বইয়ের চেয়ে সৃজনশীল বইয়ের বিক্রিটা ছিল ভালো। তবে এখন এই ব্যবধানটা অনেক কমে এসেছে। মননশীল বইয়ের পাঠক দিন দিন বাড়ছে।
ঐতিহ্য এ যাবত্ কতগুলো অনুবাদ বই প্রকাশ করেছে? অনুবাদ বইয়ের বিক্রি কেমন?
শতাধিক অনুবাদ বই বেরিয়েছে ঐতিহ্য থেকে। আসলে বই বিক্রি নির্ভর করে বইয়ের বিষয়ের উপর। অনেক অনুবাদ বই অন্যান্য বইয়ের তুলনায় ভালো চলেছে। আবার কিছু অনুবাদ গ্রন্থের বিক্রি আশানুরূপ হয়নি।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের বিভিন্ন বই বাংলাদেশের কিছু কিছু লাইব্রেরিতে পাওয়া যায়। সে তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের বই প্রবেশাধিকার পায়নি। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে বিচার করেন?
প্রথমেই যে কথাটি বলতে চাই, জ্ঞানকে কখনও আটকে রাখা উচিত নয়। একটা ভালো বই সবারই পড়া উচিত। তবে, এ ক্ষেত্রে একটা বই আনতে যে পরিমাণ কর দিতে হয়, কাগজ আনতে সে তুলনায় অনেক বেশি কর দিতে হয়। আমার মনে হয়, সরকার যদি কাগজ আমদানির ক্ষেত্রে করের পরিমাণ কমিয়ে দিত, তা হলে আমাদের বইয়ের মূল্যও অনেক কমে যেত। সহজেই মানুষ বই কিনতে পারত। আর যে বিষয়টি আপনি বললেন, পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি লেখকের বইয়ের প্রবেশাধিকার কম, সেটা সত্যি। কিছু ধর্মীয় বই ছাড়া ওপার বাংলায় বাংলাদেশের আর কোনো বই সচরাচর পাওয়া যায় না। ঠিক তেমনি বাংলাদেশেও কিন্তু গুটিকতক লাইব্রেরি ছাড়া ওপার বাংলার বই পাবেন না। তবে, পাইরেসি করা অনেক বই বাজারে পাওয়া যায়, সেটা অন্য বিষয়।
তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে অনেক পাঠকই ইন্টারনেট নির্ভর হয়ে পড়ছে। চাইলেই বিশ্বের যেকোনো লাইব্রেরিতে ঢুকে প্রয়োজনীয় বইটি পড়ে ফেলা যায়। এ বিষয়টিকে আপনি কীভাবে বিবেচনা করেন?
টেলিভিশন আবিষ্কারের পরও কিন্তু মানুষ সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখে। সেক্ষেত্রে ইন্টারনেটে বই পেলেও পাঠকেরা বই হাতে নিয়েই পড়তেই আনন্দ পায় বেশি। আর তা ছাড়া মানুষ সব সময়ই সংগ্রহপ্রিয়। মুদ্রিত বই সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করে।
বইয়ের পাঠক বৃদ্ধিতে আপনার কি কোনো পরিকল্পনা আছে? যদি থেকে থাকে, তবে একজন প্রকাশক হিসেবে আপনি কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছেন?
প্রকাশনার শুরু থেকেই ঐতিহ্য বিভিন্ন উদ্যোগ এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ঐতিহ্য আয়োজন করেছে গল্পলেখা প্রতিযোগিতার, যেখানে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় এক লাখ টাকার বই। আর তিন বিভাগে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় আরও অনেক টাকার বই। শুধু তাই নয়, সারা বছর ঐতিহ্য বিভিন্ন উত্সব-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আয়োজন করে সারা দেশব্যাপী বই উত্সবের। সেখানে অবিশ্বাস্য ছাড়ে বিক্রি করা হয় বই। যার মাধ্যমে একজন পাঠক চাইলে খুবই স্বল্প মূল্যে গড়ে তুলতে পারে একটা ব্যক্তিগত পাঠাগার।
একজন পুস্তক প্রকাশক হিসেবে আপনি দেশ ও সমাজের প্রতি কী দায়বদ্ধতা অনুভব করেন?
আসলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দায়বোধ থেকেই এ ব্যবসায় আসা। বই মানুষকে সমৃদ্ধ করে। সমৃদ্ধ মানুষই পারে দেশকে সমৃদ্ধ করতে।
বই নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?
আমি এমন একটা মূল্যে পাঠকের হাতে বই তুলে দিতে চাই, যেন একজন পাঠক বইটা পড়া শেষ হলে অন্যকে বইটা গিফট করে দিতে দ্বিধা না করে।
প্রকাশনা ব্যবসায় আসার ক্ষেত্রে তরুণদের আপনি যে কথাটি বলতে চান।
শুধুমাত্র ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করে যদি কোনো তরুণ এই প্রকাশনা শিল্পের সাথে যুক্ত হয়, তবে সে ভুল করবে। কারণ, প্রকাশনা ব্যবসা একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মপ্রয়াস, যেখানে থাকতে হয় ধৈর্য, মেধা আর সৃষ্টিশীলতা। যদি কেউ স্বাধীন, সৃষ্টিশীল পেশা হিসেবে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এ পেশায় যুক্ত হতে চায়, তবে তাকে সু-স্বাগতম।
আরিফুর রহমান নাইম
ডাকনাম :নাইম
জন্ম তারিখ ও স্থান :১৪ জুন, ঢাকা
মায়ের নাম :রওশন আক্তার
বাবার নাম :মরহুম মো. মতিউর রহমান
প্রথম স্কুল :ওয়েস্ট অ্যান্ড হাইস্কুল
প্রিয় মানুষ :হযরত মুহাম্মদ (সা.)
প্রিয় উক্তি :মন যা বলে
প্রিয় পোশাক :পাঞ্জাবি
অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে, পরিবারকে সময় দিয়ে।
সাফল্যের সংজ্ঞা :নিজেকে অতিক্রম করার চেষ্টাই সাফল্য।